কলকাতার হোটেলে আগুনে ৯ জনের মৃত্যু, প্রাণে বাঁচা বাংলাদেশিদের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, এবিসিনিউজবিডি, (১৯ আগস্ট): কলকাতার নিউ মার্কেট এলাকার মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি হোটেলে গভীর রাতে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে আটজনই বাংলাদেশি নাগরিক (ছয়জন পুরুষ, দুজন নারী ও একটি শিশু)। চিকিৎসাসেবা এবং ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে কলকাতায় গিয়ে এমন মর্মান্তিক পরিণতির শিকার হন তারা।

ঘটনাটি ঘটে মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) রাতে। তখনও রাত ২টা বাজেনি। ঢাকার বাসিন্দা মহম্মদ আশরাফুল জামাল তার ভাইকে নিয়ে হোটেলের চতুর্থ তলায় ঘুমাচ্ছিলেন। হঠাৎ চিৎকার-চেঁচামেচিতে তাদের ঘুম ভেঙে যায়।

জানালা খুলে নিচে তাকিয়ে দেখেন, লোকজন চিৎকার করে বলছেন, ‘আগুন লেগেছে’। সঙ্গে সঙ্গে ভাইকে নিয়ে বের হওয়ার চেষ্টা করেন আশরাফুল। কিন্তু দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে ঘরে ঢুকে পড়ে ঘন ধোঁয়া। নিচে নামার পথও তখন ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন। শেষ পর্যন্ত অন্যদের সঙ্গে কোনো রকমে ছাদে আশ্রয় নেন তারা।

আশরাফুল জানান, শনিবার থেকে তিনি মির্জা গালিব স্ট্রিটের ওই ভবনের চতুর্থ তলার হোটেলে ছিলেন। ব্যবসায়িক কাজে কলকাতায় গিয়েছিলেন তিনি। তার ভাইয়ের মুকুন্দপুরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসা চলছিল।

রাতের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে আশরাফুল জানান, নিচে নামার কোনো সুযোগ ছিল না। ধোঁয়ার মধ্যে দিয়ে ওই তলার প্রায় ২০ থেকে ২৫ জন কোনো রকমে ছাদে উঠে যান। সবাই পানির ট্যাংকের কাছে অবস্থান নেন। আগুন কোন দিক থেকে ছড়িয়ে পড়বে, তা বুঝতে পারছিলেন না তারা। আগুনের শিখা দেখা গেলে ট্যাংকের পানি দিয়ে তা নেভানোর চেষ্টা করবেন- এমন প্রস্তুতিও নিয়েছিলেন তারা।

একই হোটেলে ছিলেন ঢাকার আরেক বাসিন্দা মো. নাজমুল সরকার। হৃদরোগের চিকিৎসার জন্য কলকাতায় গিয়েছিলেন তিনি। আগুনের রাতের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে নাজমুল জানান, একসময় তার মনে হয়েছিল, তিনি হয়তো আর বাঁচবেন না।

নাজমুলের ভাষ্য, ধোঁয়ার কারণে শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল এবং চারপাশ অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল। হোটেলের কর্মীরা তাদের বারবার উপরে উঠতে বলছিলেন। কিন্তু ওপরে যাওয়ার সিঁড়িটি ছিল খুবই সরু। লোহার সিঁড়ি দিয়ে একজন করে উঠতে হচ্ছিল। নিচে নামার কোনো পরিস্থিতি ছিল না। এক হাত দূরের জিনিসও দেখা যাচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত মোবাইল ফোনের টর্চ জ্বালিয়ে কোনো রকমে ওপরে ওঠেন তিনি।

অগ্নিকাণ্ডের পর হোটেলের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কয়েকজন আবাসিক। তাদের অভিযোগ, আগুন লাগার পর হোটেলের কর্মীদের তৎপরতা যথেষ্ট ছিল না। এমনকি অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

বাংলাদেশ থেকে সন্তানকে নিয়ে সপরিবারে কলকাতায় যাওয়া কাউসার হোসেন ছিলেন ভবনের নিচতলার অন্য একটি হোটেলে। তার দাবি, আগুন লাগার বিষয়টি তারা প্রথমে বুঝতেই পারেননি। ঘুমের মধ্যে হোটেলের কর্মীরা দরজায় ধাক্কা দিয়ে তাদের জাগিয়ে তোলেন। এরপর হুড়োহুড়ি করে তারা বাইরে বেরিয়ে আসেন।

তবে বাইরে বের হওয়ার পর কাউসারের মনে পড়ে, তাদের পাসপোর্ট হোটেলের ঘরেই রয়ে গেছে। পরে ঝুঁকি নিয়ে আবার হোটেলে ঢুকে পাসপোর্ট নিয়ে বের হন তিনি।

কলকাতার নিউ মার্কেট এলাকার ওই হোটেলে অগ্নিকাণ্ডে এখন পর্যন্ত ৯ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। নিহতদের মধ্যে ছয়জন পুরুষ, দুজন নারী ও একটি শিশু রয়েছে। তাদের আটজন বাংলাদেশি বলে জানা গেছে।

অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় হতাহতদের পরিচয় ও ঘটনার কারণ নিয়ে তদন্ত চলছে। সূত্র: আনন্দবাজার

মনোয়ারুল হক/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
ব্রেকিং নিউজ