অনলাইন প্রতারণায় বিদেশি চক্রের নির্জন আস্তানা চট্টগ্রাম-কক্সবাজার
চট্টগ্রাম ব্যুরো, এবিসিনিউজবিডি, (১৩ সেপ্টেম্বর): আন্তর্জাতিক অনলাইন প্রতারক চক্রের নিরাপদ গন্তব্য হয়ে উঠেছে পর্যটন শহর কক্সবাজারের নির্জন রিসোর্ট এবং চট্টগ্রাম নগরের অভিজাত এলাকা। সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জোরালো অভিযানে এই দুই অঞ্চল থেকে ৬৯ জন বিদেশি নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, বিদেশি এই অপরাধীদের আস্তানা গড়তে সহায়তা করেছেন দেশীয় সহযোগীরা। চক্রের আসল নেটওয়ার্ক উন্মোচন করতে এখন দুই মূলহোতাকে খুঁজছে পুলিশ।
সাম্প্রতিক অভিযানে চট্টগ্রামে ৬৩ জন এবং কক্সবাজারে ৬ জন বিদেশি নাগরিককে আটক করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তাঁদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ উচ্চপ্রযুক্তির ডিভাইস ও সরঞ্জাম জব্দ করা হয়েছে। এমনকি অপরাধমূলক কার্যক্রমের জন্য সাউন্ডপ্রুফ কক্ষেরও ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল।
চট্টগ্রাম নগরীর খুলশী এলাকার কৃষ্ণচূড়া আবাসিক এলাকার ৪ নম্বর রোডের একটি আটতলা ভবনের ১৪টি ফ্ল্যাট থেকে ২০ জন নারীসহ ৬৩ বিদেশিকে আটক করে কাউন্টার টেররিজম ইউনিট (সিটিইউ) ও খুলশী থানা পুলিশ। গত বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার সকাল পর্যন্ত চলা এই অভিযানে লাওসের ৩৫ জন, পাকিস্তানের ২১ জন, চীনের ৫ জন এবং একজন করে ভিয়েতনাম ও নেপালের নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় ১৩৪টি মোবাইল ফোন, ৫৭টি ল্যাপটপ ও ৪টি পাকিস্তানি জাতীয় পরিচয়পত্রসহ নানা ডিভাইস উদ্ধার করা হয়। এই ঘটনায় সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা করে তাঁদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
অন্যদিকে, গত ২৫ আগস্ট কক্সবাজার শহরের রামুর হিমছড়ির মেরিনা বিচ ভিলা রিসোর্টে অভিযান চালিয়ে ৫ জন চীনা ও ১ জন তাইওয়ানি নাগরিককে আটক করে পুলিশ। ওই রিসোর্ট থেকে দুই দফায় প্রায় ২৬৩৮টি পুরোনো আইফোন, মনিটর, সিপিইউসহ নানা যন্ত্রাংশ উদ্ধার করা হয়। পাশাপাশি চীনা পুলিশের দুটি র্যাংক ব্যাজ, লোগোযুক্ত টাই এবং দুটি পতাকাও জব্দ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। অভিযানের সময় পেছনের সৈকত দিয়ে আরও অনেক চীনা ও তাইওয়ানি নাগরিক পালিয়ে যান। এ ঘটনায় রামু থানায় সাইবার আইনে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্তে জানা গেছে, চীন, লাওস ও কম্বোডিয়াসহ বিভিন্ন দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অভিযানের মুখে টিকতে না পেরে এই চক্রটি নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বেছে নেয় বাংলাদেশকে।
চট্টগ্রামে গ্রেপ্তার বিদেশিরা ‘মহসীন’ নামের এক বাংলাদেশির সহায়তায় জুনে দেশে প্রবেশ করেন। প্রথমে ঢাকায় দুদিন কাটিয়ে পরে খুলশীতে ঘাঁটি গাড়েন তাঁরা। এই বিদেশিদের পাসপোর্ট মহসীনের কাছেই জমা রয়েছে। অন্যদিকে, কক্সবাজারে রিসোর্টটি ভাড়া নেন ‘বাবর আলী’ নামের এক ব্যক্তি। নিজেকে কনস্ট্রাকশন কোম্পানির প্রতিনিধি পরিচয় দিলেও পুলিশি অনুসন্ধানে সেই কোম্পানির কোনো অস্তিত্ব মেলেনি।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে, উদ্ধার হওয়া ডিভাইসগুলোর ফরেনসিক প্রতিবেদন পেলে তাঁদের সুনির্দিষ্ট অপরাধের ধরন স্পষ্ট হবে। তবে সাধারণত এই ধরনের আন্তর্জাতিক চক্রগুলো যেসব পন্থায় প্রতারণা করে থাকে—
- অনলাইন শপিং ও ই-কমার্সের নকল ওয়েবসাইট বা পেজ তৈরি।
- ফিশিং, জালিয়াতিপূর্ণ যোগাযোগ এবং ব্যাংক বা এমএফএস (বিকাশ, নগদ) প্রতিষ্ঠানের ভুয়া লোগো ব্যবহার করে প্রলোভনমূলক বার্তা পাঠানো।
- সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট হ্যাকিং ও অর্থ দাবি।
- ফেক ইনভেস্টমেন্ট বা ভুয়া বিনিয়োগ এবং লটারির লোভ দেখানো।
- প্রবাস বা চাকরির ভুয়া অফার এবং রোমান্স স্ক্যাম বা হানিট্র্যাপের মাধ্যমে প্রতারণা।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বিদেশি এই চক্রের পেছনে দেশীয় একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট কাজ করছে। মহসীন ও বাবর আলীর মতো মূল সহযোগীদের আইনের আওতায় আনতে পারলে আন্তর্জাতিক এই অনলাইন প্রতারক চক্রের পুরো নেটওয়ার্ক এবং দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা সহযোগীদের হদিশ মিলবে।
মনোয়ারুল হক/
