মায়ানমারে নিরাপদ-মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের দাবি রোহিঙ্গাদের
চট্টগ্রাম ব্যুরো, এবিসিনিউজবিডি, (২৬ আগস্ট): মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণভাবে ফিরে যাওয়ার নিশ্চয়তার দাবিতে কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে গণহত্যা দিবস পালন করেছেন রোহিঙ্গারা।
মঙ্গলবার উখিয়ার কুতুপালং ৪ নম্বর বর্ধিত ক্যাম্পের ফুটবল মাঠে আয়োজিত সমাবেশে ৩৩টি ক্যাম্পের বিপুলসংখ্যক নারী-পুরুষ অংশ নেন। সমাবেশ থেকে নিজেদের জন্মভূমিতে নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসনের দাবি তুলে ধরেন তারা।
সমাবেশে রোহিঙ্গা নেতারা বলেন, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট রাখাইন রাজ্যে মায়ানমার সেনাবাহিনীর দমন-পীড়ন ও সহিংসতার পর প্রাণ বাঁচাতে লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন। এরই মধ্যে কেটে গেছে ৯ বছর। দীর্ঘ সময়ে শরণার্থী শিবিরে একটি নতুন প্রজন্ম বেড়ে উঠলেও তাদের ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত। নিরাপত্তা, নাগরিক অধিকার ও মর্যাদার নিশ্চয়তা মিললে তারা দ্রুত নিজ দেশে ফিরে যেতে চান।
কুতুপালং ৪ নম্বর ক্যাম্পের সলিম উল্লাহ বলেন, তারা স্বেচ্ছায় দেশ ছাড়েননি; জীবন রক্ষার জন্য বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন। নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত হলে নিজেদের জন্মভূমিতে ফিরে যেতে চান তারা।
হাজেরা খাতুন বলেন, শুধু রোহিঙ্গাদের মায়ানমারে পাঠিয়ে দিলেই হবে না। সেখানে ফিরে যাওয়ার পর যাতে আবার নির্যাতনের শিকার হতে না হয়, সেই নিশ্চয়তা প্রয়োজন। তারা আর উদ্বাস্তু জীবনে ফিরতে চান না।
মধুরছড়া ৪ নম্বর বর্ধিত ক্যাম্পের নেতা আলী আজগর বলেন, নিরাপদে নিজেদের জন্মভূমিতে ফিরতে চান তারা। বিশ্ববাসী ও কূটনীতিকদের কাছে নিজেদের এই আকাঙ্ক্ষার কথা জানাতেই সমাবেশে অংশ নিয়েছেন। সব দাবি পূরণ করে মর্যাদার সঙ্গে মায়ানমারে ফিরতে চান তারা।
৩ নম্বর ক্যাম্পের বাসিন্দা মাজেদ আব্দুল্লাহ নিজের ওপর হামলার প্রসঙ্গ তুলে বলেন, মায়ানমারে নির্যাতনের শিকার হওয়ার পর বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েও তারা নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন। তিনি দ্রুত নিরাপদ প্রত্যাবাসনের দাবি জানান।
১ নম্বর ক্যাম্পের সাহারা বিবি বলেন, ৯ বছর পেরিয়ে গেলেও প্রত্যাবাসনের কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি। নিরাপদে নিজ দেশে ফেরার ব্যবস্থা করতে জাতিসংঘের কার্যকর ভূমিকা চান তিনি।
৩ নম্বর ক্যাম্পের এনায়েত উল্লাহ বলেন, মায়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতনের পর বর্তমানে আরাকান আর্মির নির্যাতনেরও শিকার হচ্ছেন তারা। এই দুর্বিষহ জীবন থেকে মুক্তি পেতে নিরাপদে মায়ানমারে ফিরে যেতে চান রোহিঙ্গারা।
রোহিঙ্গা নেতারা বলেন, সংকটের সমাধান শুধু বাংলাদেশ ও মায়ানমারের দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। পাশাপাশি মায়ানমারের ওপর কার্যকর কূটনৈতিক চাপ বাড়ানোরও আহ্বান জানান তারা।
ইউনাইটেড কাউন্সিল অব রোহিঙ্গার (ইউসিআর) প্রধান সৈয়দ উল্লাহ বলেন, ৯ বছরে শিবিরগুলোতে নতুন একটি প্রজন্ম বেড়ে উঠেছে। তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। তাই রাখাইনে ফেরার আগে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা, নাগরিক অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করা জরুরি।
বালুখালী ৯ নম্বর ক্যাম্পের নেতা নুরুল আমিন অভিযোগ করেন, মায়ানমার রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। রোহিঙ্গারা অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে নিজেদের দেশে ফিরে যেতে চান বলে জানান তিনি।
সমাবেশে অংশ নেওয়া রোহিঙ্গাদের একটি অংশ আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (আরসা) নেতা আতাউল্লাহ আবু আম্মার জুনুনির মুক্তির দাবিতেও স্লোগান দেন।
সমাবেশ শেষে জন্মভূমিতে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা জানিয়ে মোনাজাত করা হয়। দীর্ঘদিন বাংলাদেশে আশ্রয় দেওয়ায় সরকার ও দেশের জনগণের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন রোহিঙ্গারা।
এদিকে সমাবেশকে ঘিরে উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও আশপাশের এলাকায় অতিরিক্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।
টেকনাফে স্মরণ কর্মসূচি
রোহিঙ্গা গণহত্যা দিবস উপলক্ষে টেকনাফের হ্নীলা নয়াপাড়া ২৬ নম্বর শালবাগান ক্যাম্পেও স্মরণ কর্মসূচি পালিত হয়েছে। মঙ্গলবার সকাল ১০টায় মো. তারেকের কোরআন তিলাওয়াতের মধ্য দিয়ে কর্মসূচি শুরু হয়। মায়ানমারে নিহত রোহিঙ্গাদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালনের পর দুপুর ১২টায় মৌলভী মোহাম্মদ রশিদের দোয়ার মাধ্যমে কর্মসূচির সমাপ্তি হয়।
কর্মসূচিতে বক্তব্য দেন শালবাগান ২৬ নম্বর ক্যাম্পের লিডার বদরুল ইসলাম, ২৭ নম্বর ক্যাম্পের ইউসিআর সাব-কমিটির মৌলানা নুরুল ইসলাম, কলিম উল্লাহ, মো. শরিফ, ফেরদৌস, আবু তৈয়ুব, মো. সলিম ও হেড মাঝি মো. নুর।
রোহিঙ্গা নেতারা জানান, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের সহিংসতার পর প্রাণ বাঁচাতে সাড়ে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। এর আগে থেকে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের যুক্ত করলে বর্তমানে দেশে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১২ লাখের বেশি। সরকারি ও ইউএনএইচসিআরের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বাংলাদেশে নিবন্ধিত রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা ১২ লাখ ১৭১ জন।
তারা বলেন, প্রায় ৯ বছর ধরে শরণার্থী শিবিরে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন রোহিঙ্গারা। নিরাপত্তা, নাগরিক অধিকার ও মর্যাদার নিশ্চয়তা ছাড়া তারা মায়ানমারে ফিরতে চান না। প্রত্যাবাসনের আগে রাখাইন রাজ্যের চলমান সংঘাত বন্ধ এবং রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানান তারা।
রোহিঙ্গা নেতাদের কয়েকজন বলেন, প্রত্যাবাসন বাস্তবায়নে আরাকান আর্মির ওপর আস্থা রাখাটা ভুল ছিল। রাখাইনে সংগঠনটির নিয়ন্ত্রণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা নিয়েও নতুন উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে কার্যকর ভূমিকা নেওয়ার আহ্বান জানান তারা।
তারা আরও বলেন, বাংলাদেশে অনির্দিষ্টকাল আশ্রিত হয়ে থাকতে চান না রোহিঙ্গারা। নিজেদের জন্মভূমিতে অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিয়ে ফিরে যেতে চান। এ জন্য মায়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানোর পাশাপাশি প্রত্যাবাসনের বাস্তবসম্মত পরিবেশ তৈরিতে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
কক্সবাজার শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কার্যালয়ের কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, গণহত্যা দিবস পালনের মধ্য দিয়ে রোহিঙ্গারা বিশ্ব সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চান। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আদালতে বিচারাধীন মামলার দ্রুত নিষ্পত্তিও তাদের অন্যতম দাবি।
তিনি বলেন, ৯ বছর পর রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, এনজিও, আইএনজিও ও দাতা সংস্থাগুলোর মধ্যেও একধরনের ক্লান্তি তৈরি হয়েছে। বিশ্বের অন্যান্য সংকটের কারণে রোহিঙ্গা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক মনোযোগ ও সহায়তা কমে আসছে। এতে শরণার্থীদের সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে।
মিজানুর রহমান আরও বলেন, সম্প্রতি বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের সংখ্যা নিয়ে মায়ানমার অসত্য তথ্য দিয়েছে। এ বিষয়ে ঢাকায় নিযুক্ত মায়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে তলব করে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রতিবাদ জানানো হয়েছে।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কার্যকর করতে মায়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। তার মতে, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরিতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও জোরালো ও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
৯ বছর ধরে রোহিঙ্গাদের প্রধান দাবি অপরিবর্তিত—নিজেদের জন্মভূমিতে নিরাপদ, স্বেচ্ছায় ও মর্যাদার সঙ্গে ফিরে যাওয়া। কিন্তু রাখাইন রাজ্যের চলমান সংঘাত, নিরাপত্তাহীনতা, নাগরিকত্ব ও অধিকার নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে সেই প্রত্যাবাসন এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।
মনোয়ারুল হক/
