জামায়াতের ইশতেহারেই ছিল না, সংসদে এখন তারা শরিয়া আইন চায়: চিফ হুইপ
নিজস্ব প্রতিবেদক, এবিসিনিউজবিডি, ঢাকা (১১ সেপ্টেম্বর): ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে সম্পত্তি হস্তান্তর বিল নিয়ে বিরোধী দলের ভূমিকার কড়া সমালোচনা করেছেন চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি।
চিফ হুইপ বলেছেন, বিরোধী দলের সদস্যরা শরিয়া আইনের দোহাই দিয়ে বিলটির বিরোধিতা করেছেন। অথচ তাদের (জামায়াতের) নির্বাচনি ইশতেহারে শরিয়া আইন চালুর কোনো ঘোষণা ছিল না।
শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদের মিডিয়া সেন্টারে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে চিফ হুইপ বলেন, বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা শরিয়া আইনের অজুহাত তুলে সম্পত্তি হস্তান্তর বিলের তীব্র বিরোধিতা করেছেন। অথচ তাদের দলীয় নির্বাচনি ইশতেহারে শরিয়া আইন চালুর সুনির্দিষ্ট কোনো ঘোষণা ছিল না।
এ সময় অধিবেশলে পাস হওয়া গুরুত্বপূর্ণ বিলগুলোর মধ্যে ‘সম্পত্তি হস্তান্তর বিল’-এর প্রেক্ষাপট বিস্তারিত তুলে ধরেন তিনি। চিফ হুইপ জানান, এই আইনের মাধ্যমে বৃদ্ধ মা-বাবা সন্তানদের নামে সম্পত্তি দান বা হস্তান্তর করলেও তাদের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ওই সম্পত্তি ভোগদখলের আইনি অধিকার বহাল থাকবে। সন্তানরা সম্পত্তি লিখে নেওয়ার পর যাতে কোনোভাবেই মা-বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠাতে না পারে বা অসহায় অবস্থায় ফেলে দিতে না পারে, তা নিশ্চিত করতেই এই যুগোপযোগী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মা-বাবার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের বিষয়ে বিভিন্ন হাদিসের নির্দেশনার কথাও এ সময় স্মরণ করিয়ে দেন তিনি।
গুম প্রতিরোধ ও মানবাধিকার সুরক্ষা আইন প্রসঙ্গে চিফ হুইপ বলেন, বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন নিজেও অতীতে গুমের শিকার হয়েছিলেন। প্রথম অধিবেশনের অধ্যাদেশের মাধ্যমে আসা ১৩৩টি আইনের মধ্যে ১৬টি আইন সংসদীয় পর্যালোচনার জন্য সংরক্ষিত ছিল। পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট অংশীজন এবং ১৬টি দেশের রাষ্ট্রদূতের মতামত নিয়ে আইনগুলোকে আরও সময়োপযোগী ও শক্তিশালী করা হয়েছে। নতুন মানবাধিকার বিলে পূর্বের ‘অনূর্ধ্ব ১০ বছর’ শাস্তির বিধান সংশোধন করে নির্দিষ্ট সর্বনিম্ন শাস্তির সীমা নির্ধারণের পাশাপাশি মৃত্যুদণ্ডের বিধানও যুক্ত করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও কৃচ্ছ্রসাধনের বিষয়ে চিফ হুইপ উল্লেখ করেন, বিগত সরকারের রেখে যাওয়া বৈদেশিক ঋণের বিপরীতে গত পাঁচ মাসে ২০৫ কোটি ডলার ঋণ ও সুদ পরিশোধ করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় রোধে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কৃচ্ছ্রসাধনের কঠোর নীতি গ্রহণ করেছেন। এর অংশ হিসেবে এমপি-মন্ত্রীদের রসিদ ছাড়া বিল পরিশোধ বন্ধ, জীবনযাত্রায় সরলতা বজায় রাখা এবং সরকারি প্রটোকল কমানোর মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া সরকারি খাতের খাবারের বার্ষিক ব্যয় ৩৫ কোটি টাকা থেকে কমিয়ে আনার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
জ্বালানি খাতের সমালোচনা করে তিনি জানান, একটি ৫০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করতে যেখানে দুই থেকে আড়াই বছর সময় লাগে, সেখানে বিগত সরকার আদানি গ্রুপের সঙ্গে অসম চুক্তির মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ১৭ শতাংশ বৈদেশিক নির্ভরতা তৈরি করেছিল। বিদ্যুৎ না পেয়েও বিপুল অঙ্কের ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে হয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ খাতের দায়মুক্তি সংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিল এবং দাম নির্ধারণের পূর্বের ব্যবস্থারও কঠোর সমালোচনা করেন তিনি।
কৃষি খাতের উন্নয়নে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে চিফ হুইপ বলেন, সরকারের প্রথম ক্যাবিনেট বৈঠকেই কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত সুদসহ কৃষি ঋণ মওকুফের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এছাড়া দুই কোটি পরিবারের মাঝে ‘কৃষক কার্ড’ বিতরণের উদ্যোগের পাশাপাশি সারের বর্তমান মজুত পরিস্থিতির কথা তুলে ধরেন তিনি। দেশে পর্যাপ্ত সার মজুত থাকলেও বিগত সরকারের আমলের প্রায় ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার সার ডিলার পলাতক থাকায় এবং তাদের কেউ কেউ কালোবাজারির সঙ্গে জড়িত থাকায় বিতরণে কিছুটা সাময়িক সমস্যা তৈরি হয়েছে বলে জানান তিনি।
১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, তৎকালীন সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবে তিনি ফার্মগেট থেকে জাহাঙ্গীর গেট পর্যন্ত শত শত লাশ পড়ে থাকতে দেখেছেন। পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমানের বলিষ্ঠ নেতৃত্বে মাত্র সাড়ে তিন বছরের মধ্যে দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছিল এবং রপ্তানিও শুরু করেছিল। বর্তমান সরকার কৃষক কার্ডের পাশাপাশি ফ্যামিলি কার্ড, হেলথ কার্ড এবং ইমামদের জন্য বিশেষ ভাতা চালুর প্রক্রিয়া শুরু করেছে।
পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতি অনুসরণের কথা জানিয়ে চিফ হুইপ বলেন, বিগত সরকারের করা ১০১টি সমঝোতা স্মারক এবং চট্টগ্রাম বন্দরে বিদেশি জাহাজকে অগ্রাধিকার দেওয়ার মতো বিষয়গুলো পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনা করা হয়েছে। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করে সবার সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা হবে। অর্থ পাচার রোধ ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অর্থমন্ত্রী ১৮(ক) ধারা বাতিল করেছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিভিন্ন জনসভার বক্তব্য উদ্ধৃত করে চিফ হুইপ জানান, প্রধানমন্ত্রী নিজেকে নির্দিষ্ট কোনো দলের নয়, বরং পুরো দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ঘোষণা করেছেন। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সাময়িক সমস্যার কারণে জনগণের ভোগান্তিতে তিনি আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। দেশের কল্যাণে সরকারের আন্তরিকতায় কোনো ঘাটতি থাকলে তা ধরিয়ে দেওয়ার জন্য তিনি সকলের প্রতি আহ্বান জানান। পাশাপাশি সংসদীয় কার্যক্রমে বাক্স্বাধীনতার পাশাপাশি শালীনতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করে গণতন্ত্র পুনর্নির্মাণের স্বার্থে সরকার ও বিরোধী দলকে একত্রে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
উক্ত সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন হুইপ অ্যাডভোকেট রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, মো. আখতারুজ্জামান মিয়া এবং এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজান।
মনোয়ারুল হক/
