মৎস্য, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি বাড়াতে জলাশয়ের সর্বোচ্চ ব্যবহারের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর
প্রতিনিধি (কিশোরগঞ্জ), এবিসিনিউজবিডি, (১৭ আগস্ট) : মৎস্য খাতকে সমৃদ্ধ করার মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের জন্য নতুন বাজার খুঁজে বের করতে দেশের উদ্যোক্তাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
রোববার (১৬ আগস্ট) দুপুরে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীর আচমিতা জর্জ ইনস্টিটিউটের মিনি স্টেডিয়ামে ‘জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন, সমগ্র বাংলাদেশে বহু নদী-নালা, খাল-বিল, পুকুর ও হাওর অলস পড়ে রয়েছে। সরকার এসব জলাশয় সংস্কার করে মৎস্য পোনা ছাড়ার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। সংশ্লিষ্ট এলাকার বেকার তরুণদের মধ্যে এসব জলাশয় ব্যবহারের সুযোগ বণ্টন করা হবে, যাতে তাদের কর্মসংস্থান ও স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
এবারের জাতীয় মৎস্য সপ্তাহের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে— ‘রুপালী মৎস্য স্বনির্ভর দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’। এই অনুষ্ঠানে ১৩টি ক্যাটাগরিতে ১৪ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে জাতীয় মৎস্য পদক (স্বর্ণ পদক) প্রদান করেন প্রধানমন্ত্রী।
দেশের মৎস্য সম্পদ রক্ষায় হাওর ও জলাশয়ের পরিবেশ সুরক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষ মৎস্য পেশার সঙ্গে জড়িত। মাছকে বাঁচাতে হলে পরিবেশের সুরক্ষার প্রতিও খেয়াল রাখতে হবে। পরিবেশ রক্ষা করতে পারলে একটি সুস্থ পরিবেশে বসবাস করা সম্ভব হবে এবং আগামী প্রজন্মও সুস্থ পরিবেশে বেড়ে উঠবে। একইভাবে মৎস্য ও পশু-সম্পদসহ সবকিছু সুস্থ পরিবেশে গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
তিনি আরও বলেন, যত্রতত্র আবর্জনা, টিস্যু পেপার ও প্লাস্টিকের পানির বোতল ফেলার কারণে খাল-বিল, নদী-নালা এবং হাওর-জলাশয়ের পরিবেশ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। পরিবার, পরিবেশ, মাছ ও পানি রক্ষা করতে এবং পরিবেশদূষণ রোধ করতে হলে সবাইকে সচেতন হতে হবে।
মৎস্য খাতের অবদানের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী জানান, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিশ্বের প্রায় ৫২টি দেশে মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ ৬ হাজার কোটি টাকারও বেশি সমমূল্যের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করেছে। এছাড়া জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোট জলজ প্রাণী উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে পঞ্চম এবং অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয় থেকে মাছ আহরণে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছে।
মৎস্য খাতে আধুনিক পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, খুলনা অঞ্চলে ৩০০টি ক্লাস্টার গঠনের মাধ্যমে ইতোমধ্যে ৭ হাজার ৫০০টি ঘেরে উৎপাদন বৃদ্ধি করা হয়েছে। পাশাপাশি কক্সবাজারের চকরিয়ায় ৭ হাজার একর জমিতে ‘শ্রিম্প সিটি’ বাস্তবায়নে মাস্টারপ্ল্যান ও অবকাঠামো উন্নয়ন চলছে।
দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনে ইলিশের অবদান প্রায় ১০ শতাংশ, যা জাতীয় জিডিপির ১ শতাংশেরও বেশি। বিগত বিএনপি সরকারের সময় প্রবর্তিত ‘ইলিশ ফিশারিজ ম্যানেজমেন্ট অ্যাকশন প্ল্যান’-এর ধারাবাহিকতায় দেশে ইলিশ উৎপাদন অভাবনীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
মৎস্যজীবী ও জেলেদের সুরক্ষার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে প্রায় ২ কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই খাতের ওপর নির্ভরশীল। মৎস্য চাষীদের কৃষক কার্ড এবং জেলেদের নিবন্ধন ও পরিচয়পত্র প্রদান কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এছাড়া ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো সুন্দরবন ও হাওর অঞ্চলে মাছ ধরা নিষিদ্ধকালীন সময়ে জেলেদের ভিজিএফ সহায়তার আওতায় আনা হয়েছে।
প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং গবেষণা ও উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তুলতে সরকার ৫০০ কোটি টাকার ‘স্টার্টআপ ফান্ড’ গঠন করেছে। এই ফান্ড থেকে সম্ভাবনাময় স্টার্টআপ বা শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য ৫ লাখ থেকে ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত অনুদান (গ্রান্ট) প্রদান করা হবে। নতুন উদ্যোক্তাদের এই সুযোগ গ্রহণের আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো গত জুন মাসে নাইজেরিয়াতে হ্যাচিং ডিম রপ্তানি করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিদেশে নিত্যনতুন পণ্যের বাজার খুঁজে বের করার জন্য উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের প্রতি আন্তরিক আহ্বান জানাচ্ছি। এক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা প্রদান করা হবে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী আমিন উর রশীদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী শাহে আলম, বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী শরীফুল আলম, কিশোরগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য জালাল উদ্দীন, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ সচিব দেলোয়ার হোসেন এবং মৎস্য অধিদফতরের মহাপরিচালক মো. খালেদ কনক।
উল্লেখ্য, জাতীয় মৎস্য সপ্তাহের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে প্রধানমন্ত্রী শোলাকিয়া মাঠে বৃক্ষরোপণ এবং কিশোরগঞ্জ স্টেডিয়ামে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন।
মনোয়ারুল হক/
