শিশু যৌন নির্যাতনকারীরা পেডোফিলিয়া নামে মানসিক রোগে আক্রান্ত

স্বাস্থ্য ডেস্ক, এবিসিনিউজবিডি, ঢাকা (২৭ জুন) : দেশের আনাচে-কানাচে প্রতিনিয়ত খবরের শিরোনাম হচ্ছে নিষ্পাপ শিশুদের ওপর পাশবিক নির্যাতনের ঘটনা। সম্প্রতি নেত্রকোনার মদন উপজেলায় এক মাদ্রাসাশিক্ষকের হাতে ১১ বছরের এক শিশু এবং দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে ১২ বছরের আরেক শিশুর অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার ঘটনা সমাজকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।

আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হলেও কিছুতেই থামানো যাচ্ছে না এই সামাজিক ব্যাধি। বর্তমানে স্মার্টফোনের পর্দায় চোখ রাখলেই ভেসে উঠছে এমন সব শিউরে ওঠা খবর। কেবল বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বজুড়ে এই সংকট এখন মহামারি আকার ধারণ করেছে।

সাম্প্রতিক এক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ায় প্রতি আটজন শিশুর মধ্যে একজন কোনো না কোনোভাবে যৌন নিপীড়নের শিকার হচ্ছে। প্রশ্ন জাগে, কেন বারবার টার্গেট হচ্ছে অবুঝ শিশুরা?

বিকৃত মানসিকতা ও পেডোফিলিয়ার অন্ধকার দিক

পরিসংখ্যান বলছে, বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৪.৫% কন্যাশিশু এবং ১১.৫% ছেলেশিশু শৈশবে যৌন নির্যাতনের মুখোমুখি হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতে, কোনো শিশুকে তার অসমতিতে বা অবুঝ বয়সের সুযোগ নিয়ে কোনো যৌন কর্মকাণ্ডে জড়ানোই হলো শিশু যৌন নির্যাতন। এটি মূলত ক্ষমতা প্রদর্শন ও নিয়ন্ত্রণের এক বিকৃত বহিঃপ্রকাশ। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায়, বয়ঃসন্ধির আগের শিশুদের প্রতি যারা তীব্র যৌন আকর্ষণ বোধ করে, তারা ‘পেডোফিলিয়া’ নামক মানসিক রোগে আক্রান্ত। গবেষণায় দেখা গেছে, এসব অপরাধী নিজেরাও শৈশবে নির্যাতনের শিকার হয়ে থাকতে পারে। এদের ভেতর সহানুভূতি বা অনুশোচনা বলতে কিছু থাকে না; কামনাবাসনা চরিতার্থ করতে এরা শিশুকে কেবল একটি ‘বস্তু’ মনে করে। এরা প্রথমে সুকৌশলে শিশুর বিশ্বাস অর্জন করে এবং পরে ঘটনা জানাজানি হলে উল্টো শিশুর ওপরই দোষ চাপানোর চেষ্টা করে।

অপরাধীদের মস্তিষ্কের গঠন ও স্নায়বিক ভিন্নতা

বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, শিশু নির্যাতনকারীদের মস্তিষ্কের কর্মপদ্ধতি সাধারণ মানুষের চেয়ে আলাদা। ‘জার্নাল অব দ্য ইন্টারন্যাশনাল নিউরোসাইকোলজিক্যাল সোসাইটি’-র একটি নিবন্ধ অনুযায়ী, পেডোফিলদের মস্তিষ্ক তথ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে ধীরগতির এবং তাদের চিন্তাভাবনার ক্ষমতা দুর্বল হয়। অন্যদিকে, যারা শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক উভয়কেই টার্গেট করে, তাদের ভাষাগত বোধশক্তি কম থাকে।

এছাড়া, ইরানিয়ান জার্নাল অব মেডিকেল সায়েন্স’-এ প্রকাশিত ২০২৫ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, এসব অপরাধীর মস্তিষ্কের ‘ফ্রন্টাল পোল’ (যা মানুষের আবেগ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিয়ন্ত্রণ করে) অংশে রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিক থাকে না। পলিগ্রাফ পরীক্ষায় দেখা গেছে, শিশুদের আপত্তিকর ছবি দেখলে এদের হৃদস্পন্দন ও ঘাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। অপরাধ বিজ্ঞানের গবেষকেরা বলছেন, এরা অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় এবং সুপরিকল্পিতভাবে অপরাধ ঘটায় যাতে সহজে ধরা না পড়ে।

অভিভাবকদের জন্য রেড অ্যালার্ট: কীভাবে সতর্ক হবেন?

আপনার পরিচিত বা চারপাশের কোনো প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মধ্যে নিচের লক্ষণগুলো দেখলে অবিলম্বে সতর্ক হোন:

  • বাড়ির বড়দের এড়িয়ে শিশুর সাথে আড়ালে সময় কাটানো এবং কেউ চলে এলে ভড়কে যাওয়া।
  • শিশুকে একা বাইরে নিয়ে যাওয়ার বাহানা করা, অতিরিক্ত উপহার দেওয়া বা পরিবারের গোপন তথ্য জানার চেষ্টা করা।
  • শিশুকে অকারণে জড়িয়ে ধরা, কোলে বসানো বা অতিমাত্রায় স্পর্শকাতর আচরণ করা।

শিশুটি কি নির্যাতনের শিকার? চেনার উপায়

আপনার সন্তানের আচরণ ও শারীরিক পরিবর্তনের দিকে কড়া নজর রাখুন:

  • শারীরিক লক্ষণ: হাঁটতে বা বসতে তীব্র কষ্ট হওয়া, শরীরের সংবেদনশীল অংশে ক্ষত, রক্তপাত, ফোলা ভাব বা হুট করে তীব্র জ্বর ও সংক্রমণ দেখা দেওয়া।
  • আচরণগত পরিবর্তন: আচমকা ছোট বাচ্চাদের মতো আচরণ করা (যেমন আঙুল চোষা), কারণে-অকারণে চমকে ওঠা বা কারও স্পর্শে আতঙ্কে চিৎকার করা।
  • কথাবার্তায় পরিবর্তন: বয়সের তুলনায় অতিরিক্ত যৌন সচেতনতা, ছবি আঁকার সময় যৌনাঙ্গের অবয়ব ফুটিয়ে তোলা, আচমকা গোপন উৎস থেকে টাকা বা উপহার পাওয়া এবং সবকিছু লুকিয়ে রাখার চেষ্টা।

দীর্ঘমেয়াদি ট্রমা: জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এর বিষাক্ত প্রভাব

শৈশবের এই ক্ষত একজন মানুষকে প্রাপ্তবয়স্ক জীবনেও তাড়া করে বেড়ায়। এর ফলে ভুক্তভোগী যে ধরনের সংকটে পড়তে পারেন:

  • সম্পর্ক তৈরিতে বাধা: কাউকে সহজে বিশ্বাস করতে না পারা, যৌনতার প্রতি তীব্র অনীহা বা ভীতি তৈরি হওয়া।
  • প্যারেন্টিং বা সন্তান লালন-পালন: নিজের সন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে অতিমাত্রায় প্যানিকড থাকা অথবা নিজের সন্তান থেকেই এক প্রকার দূরত্ব বজায় রাখা।
  • কর্মক্ষেত্র: তীব্র একাকীত্ব, কর্তৃপক্ষের ওপর আস্থাহীনতা এবং মানসিক চাপ নেওয়ার ক্ষমতা কমে যাওয়া। অনেকে কর্মজীবনে সফল হলেও ভেতরে ভেতরে মাদক বা বিষণ্ণতায় ডুবে যান।

জরুরি ও দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা পদ্ধতি

কোনো শিশু এই নির্মমতার শিকার হলে প্রথম ৭২ ঘণ্টার পদক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি:

  • প্রথম কাজ: শিশুকে আশ্বস্ত করুন যে সে নিরাপদ এবং এতে তার কোনো দোষ নেই।
  • ডাক্তারি পরীক্ষার আগে করণীয়: শিশুকে কোনোভাবেই গোসল করাবেন না বা কাপর পরিবর্তন করাবেন না। সরাসরি থানা ও হাসপাতালে নিয়ে যান।
  • মেডিকেল সাপোর্ট: চিকিৎসকের পরামর্শে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে এইচআইভি প্রতিরোধক ‘পোস্ট-এক্সপোজার প্রফিল্যাক্সিস’ (PEP) ওষুধ শুরু করতে হবে, যা ২৮ দিন খেতে হয়। এছাড়া অন্যান্য যৌনবাহিত রোগের (STD) পরীক্ষাও করাতে হবে।
  • মানসিক নিরাময়: দীর্ঘমেয়াদি ‘পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার’ (PTSD) থেকে শিশুকে মুক্ত রাখতে নিয়মিত সাইকোথেরাপি ও চাইল্ড কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করা বাধ্যতামূলক।

আইনি সহায়তার দ্বার

বাংলাদেশে এই ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে:

  • জাতীয় জরুরি সেবা: যেকোনো জরুরি পুলিশি সহায়তার জন্য কল করুন ৯৯৯ নম্বরে। এছাড়া নারী ও শিশু নির্যাতনের অভিযোগ জানাতে সরাসরি ডায়াল করুন ১০৯ নম্বরে।
  • নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল: ভুক্তভোগীর পরিবার সরাসরি আদালতে গিয়ে মামলা দায়ের করতে পারেন।
  • জেলা আইনি সহায়তা কমিটি: সরকারিভাবে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে আইনি লড়াইয়ের সুযোগ মিলবে এখান থেকে।

বিশেষ বার্তা: কেবল অপরিচিত মানুষই নয়, অনেক সময় নিজের সবচেয়ে কাছের বা বিশ্বস্ত মানুষটিও শিশুর জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। তাই সন্তানের প্রতিটি কথা মনোযোগ দিয়ে শুনুন, তাকে বোঝার চেষ্টা করুন এবং তার সুরক্ষায় সর্বদা সজাগ থাকুন।

সৌজন্যে: অধ্যাপক ডা. সানজিদা শাহরিয়া, চিকিৎসক, কাউন্সেলর ও সাইকোথেরাপি প্র‍্যাকটিশনার, ফিনিক্স ওয়েলনেস সেন্টার বিডি

মনোয়ারুল হক/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
ব্রেকিং নিউজ