বাশার আল-আসাদকে মৃত্যুদণ্ড দিল সিরিয়ার আদালত
আন্তর্জাতিক ডেস্ক, এবিসিনিউজবিডি, (১১ আগস্ট): সিরিয়ার ক্ষমতাচ্যুত একনায়ক বাশার আল-আসাদ, তাঁর ভাই মাহের আল-আসাদ এবং সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা আতেফ নজিবকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন দেশটির একটি আদালত। দীর্ঘ ১৪ বছরের গৃহযুদ্ধ, হত্যা, নির্যাতন ও উসকানির অভিযোগে গঠিত বিশেষ ট্রাইব্যুনালে এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করা হয়।
মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) বাশার ও তাঁর ভাই মাহেরের অনুপস্থিতিতেই (ইন অ্যাবসেন্সিয়া) এই সর্বোচ্চ শাস্তি ঘোষণা করা হয়। তবে দেরার তৎকালীন রাজনৈতিক নিরাপত্তা প্রধান আতেফ নজিবকে আদালতে সরাসরি হাজির করা হয়েছিল। ২০১১ সালে দেরায় ১৫ জন শিশুকে গ্রেপ্তার ও নির্মম নির্যাতনের মাধ্যমে সিরিয়ার গণঅভ্যুত্থান এবং রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ উসকে দেওয়ার নেপথ্যে নজিবের মূল হাত ছিল।
সিরিয়ার অন্তর্বর্তীকালীন বিচার প্রক্রিয়ার অধীনে গঠিত ‘ফোর্থ ক্রিমিনাল কোর্ট’-এ এই বিচার কাজ পরিচালিত হয়। আসাদের পতন ও নজিবের আটকের পর দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে ঘোষিত এই রায়কে নির্যাতিত কোটি কোটি সিরীয়বাসীর ন্যায়বিচার পাওয়ার পথে এক যুগান্তকারী মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এক নজরে বাশার আল-আসাদের রাজনৈতিক উত্থান ও পতন
সিরিয়ার রাজনীতিতে এক চরম নাটকীয় অধ্যায়ের যবনিকা ঘটেছে। কখনো রাজনীতিতে আসার বিন্দু পরিমাণ আগ্রহ না থাকা এক শান্ত স্বভাবের চক্ষু চিকিৎসক বাশার আল-আসাদ ২৪ বছর ধরে পুরো সিরিয়াকে লৌহকপাটে শাসন করেছিলেন। আজ তাঁর বিরুদ্ধেই নিজ দেশের আদালত গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের রায় দিল।
পারিবারিক পটভূমি ও প্রারম্ভিক জীবন
বাশার হাফেজ আল-আসাদ ১৯৬৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর দামেস্কে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা হাফেজ আল-আসাদ ১৯৭০ সালে এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে সিরিয়ায় আসাদ রাজবংশের স্বৈরশাসনের গোড়াপত্তন করেছিলেন।
- শিক্ষাজীবন ও চিকিৎসাবিজ্ঞান: দামেস্কে পড়াশোনা শেষ করে ১৯৮৮ সালে দামেস্ক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে এমডি (MD) ডিগ্রি লাভ করেন বাশার।
- লন্ডনে প্রশিক্ষণ: সামরিক হাসপাতালে কিছুকাল কাজ করার পর ১৯৯২ সালে লন্ডনের বিখ্যাত ‘ওয়েস্টার্ন আই হসপিটাল’-এ চক্ষু বিশেষজ্ঞ হিসেবে উচ্চতর প্রশিক্ষণ ও গবেষণা শুরু করেন।
আকস্মিক রাজনৈতিক উত্থান (১৯৯৪)
আসাদ পরিবার কখনো বাশারকে রাজনীতিতে আনতে চায়নি। হাফেজ আল-আসাদ তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র বাসেল আল-আসাদকে ভবিষ্যৎ প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রস্তুত করছিলেন।
- ভাইয়ের মৃত্যু ও ফেরা: ১৯৯৪ সালে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় বাসেল আল-আসাদের অকালমৃত্যু ঘটলে আসাদ পরিবারের সব পরিকল্পনা পাল্টে যায়। লন্ডনে চিকিৎসায় ব্যস্ত বাশারকে জরুরিভিত্তিতে দামেস্কে ডেকে পাঠানো হয়।
- ক্ষমতার প্রস্তুতি: পরবর্তী ছয় বছরে বাশারকে দ্রুত হোমস সামরিক একাডেমিতে প্রশিক্ষণ দিয়ে কর্নেল পদে উন্নীত করা হয়। পাশাপাশি সিরীয় কম্পিউটার সোসাইটির প্রধান করে তরুণদের মাঝে তাঁর একটি ‘সংস্কারক ও আধুনিক’ ভাবমূর্তি তৈরি করা হয়।
প্রেসিডেন্ট পদে আসীন ও ‘দামেস্ক স্প্রিং’ (২০০০-২০০৫)
২০০০ সালের ১০ জুন হাফেজ আল-আসাদের মৃত্যুর পর সংবিধান সংশোধন করে প্রেসিডেন্টের ন্যূনতম বয়স ৪০ থেকে কমিয়ে ৩৪ বছর করা হয়। এরপর ১৭ জুলাই ২০০০ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট হন বাশার।
- দামেস্ক স্প্রিং: শুরুর দিকে পশ্চিমাশিক্ষায় শিক্ষিত বাশার মুক্তচিন্তা ও কিছু রাজনৈতিক সংস্কারের সুযোগ দিলে তা ‘দামেস্ক স্প্রিং’ নামে পরিচিত হয়। কিন্তু নিজের ক্ষমতা নড়বড়ে হওয়ার উপক্রম দেখলেই ২০০১ সালের মধ্যে তিনি সব বিরোধী কণ্ঠ চিরতরে স্তব্ধ করে দেন।
- লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহার: ২০০৫ সালে লেবাননের সাবেক প্রধানমন্ত্রী রফিক হারিরি হত্যাকাণ্ডে আসাদ সরকারের গোয়েন্দা বাহিনীর নাম আসায় আন্তর্জাতিক চাপে সিরিয়া লেবানন ছাড়তে বাধ্য হয়।
২০১১-এর গণঅভ্যুত্থান ও গৃহযুদ্ধের সূচনা
২০১১ সালের মার্চে ‘আরব বসন্ত’-এর হাওয়া সিরিয়ায় লাগলে দরিয়া শহরে দেওয়ালে সরকারবিরোধী স্লোগান লেখার অপরাধে ১৫ জন শিশুকে বন্দি ও অমানুষিক নির্যাতন করা হয়। এর প্রতিবাদে সারা দেশে দাবানলের মতো বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
- নির্মম দমনপীড়ন: রাজপথের শান্ত আন্দোলনকারীদের ওপর সামরিক বাহিনী দিয়ে নির্বিচারে গুলি চালায় আসাদ সরকার। এর ফলে সামরিক বাহিনীতে বড় ধরনের বিদ্রোহ দেখা দেয় এবং দেশটি ভয়াবহ গৃহযুদ্ধে জড়ায়।
- রাসায়নিক হামলা ও ধ্বংসযজ্ঞ: ১৪ বছরের এই যুদ্ধে নিজ জনগণের ওপর সারিন গ্যাসের মতো নিষিদ্ধ রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগ করে আসাদ বাহিনী। জাতিসংঘের তথ্যমতে, এই সংঘাতে ৬ লক্ষাধিক মানুষ নিহত হন, যার ৯০ শতাংশের বেশি ছিলেন সাধারণ বেসামরিক নাগরিক। পাশাপাশি প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ মানুষ দেশ ছেড়ে আন্তর্জাতিক শরণার্থী হতে বাধ্য হন।
- বিদেশি মদদ: ২০১৫ সালে রাশিয়া ও ইরানের সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপে আসাদ নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখলেও পুরো দেশকে এক ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেন।
২০২৪-এর পতন ও মস্কোয় পলায়ন
আন্তর্জাতিকভাবে একঘরে ও বিধ্বস্ত অর্থনীতির সিরিয়ায় ২০২৪ সালের শেষভাগে আকস্মিক আক্রমণ চালায় বিরোধী জোট।
- পতনের চূড়ান্ত মুহূর্ত: ২০২৪ সালের নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে ‘হাইয়াত তাহরির আল-শাম’-এর নেতৃত্বে বিদ্রোহী বাহিনী অবিশ্বাস্য গতিতে আলেপ্পো, হামা ও হোমস দখল করে নেয়। আসাদের প্রতিরোধব্যবস্থা গুঁড়িয়ে দিয়ে বিরোধীরা ৮ ডিসেম্বর দামেস্কে প্রবেশ করে।
- মস্কোয় আশ্রয়: ক্ষমতাচ্যুত নিশ্চিত জেনে বাশার আল-আসাদ পরিবারসহ রাশিয়ার সামরিক বিমানে চড়ে মস্কোয় পালিয়ে যান। এর মাধ্যমে অবসান ঘটে আসাদ পরিবারের দীর্ঘ ৫৪ বছরের নৃশংস স্বৈরশাসনের।
আন্তর্জাতিক গ্রেফতারি পরোয়ানা ও ২০২৬-এর মৃত্যুদণ্ড
ক্ষমতা হারানোর পর আসাদের যুদ্ধাপরাধের আইনি প্রক্রিয়া বিশ্বজুড়ে গতি পায়। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ও ফ্রান্সের আদালত বেসামরিক নাগরিক হত্যা ও রাসায়নিক হামলার দায়ে তাঁর বিরুদ্ধে রেড নোটিশ ও গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে। পরিশেষে, ২০২৬ সালের ১১ আগস্ট সিরিয়ার অন্তর্বর্তীকালীন আদালতের এই ঐতিহাসিক রায় বিশ্বজুড়ে স্বৈরশাসকদের জন্য এক স্পষ্ট ও কড়া বার্তা হয়ে রইল।
মনোয়ারুল হক/
