জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে: প্রধানমন্ত্রী
বিশেষ প্রতিনিধি, এবিসিনিউজবিডি, ঢাকা (৮ আগস্ট) : জ্বালানি খাতের বিদ্যমান সংকট নিরসনে বর্তমান সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, অতীতে অপরিকল্পিত কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণেই মূলত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বর্তমান এই সংকট তৈরি হয়েছে। তবে দেশ ও দেশের মানুষকে এই পরিস্থিতি থেকে রক্ষায় সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
শনিবার (৮ আগস্ট) জাতীয় সংসদের এলডি হলে ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব)-এর ৩৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এক চিকিৎসক সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্র, রাজনীতি ও প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে ফ্যাসিবাদের সুবিধাভোগী চক্র এখনও নিষ্ক্রিয় নয়। এই চক্রটি অত্যন্ত কৌশলে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে অস্থিতিশীল করার পাঁয়তারা চালাচ্ছে এবং এ বিষয়ে নানা ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছে। তবে সরকার এসব অপতৎপরতা সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন রয়েছে।
এর আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তাঁর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান জাতীয় সংসদ ভবনের এলডি হল প্রাঙ্গণে নিম ও অর্জুন গাছের চারা রোপণ করেন। পরবর্তীতে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন এবং বেলুন ও পায়রা উড়িয়ে তারা এই চিকিৎসক সমাবেশের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।
সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের মানুষ যে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি সংকটের মুখোমুখি হয়েছে, সরকার তা অস্বীকার করছে না। অতীতে নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ সুবিধা পাইয়ে দিতে যেসব অপরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, আজ তার খেসারত দিতে হচ্ছে দেশ, সাধারণ মানুষ এবং বর্তমান সরকারকে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় একটি ভঙ্গুর দেশ পেয়েছিল। বহুমুখী সেই সংকট কাটিয়ে উঠতে ইতিমধ্যে বিভিন্ন কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং জনগণের জীবনযাত্রাকে সহজ করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
এর আগে পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত ও বিশেষ মোনাজাতের মাধ্যমে অনুষ্ঠানটির কার্যক্রম শুরু হয়। এতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ড্যাবের নেতাকর্মী ও চিকিৎসকরা অংশ নেন। ড্যাব সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন আল রশীদের সভাপতিত্বে সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান, সমাজকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন এবং স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন প্রমুখ।
মার্কিন উদ্ভাবক টমাস আলভা এডিসনের একটি বাণীর প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভবিষ্যতের চিকিৎসকরা কেবল ওষুধ দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবেন না; বরং তারা মানুষকে শরীরচর্চা, সুষম খাদ্য গ্রহণ এবং রোগ প্রতিরোধের উপায় সম্পর্কে সচেতন করবেন। এডিসনের এই দর্শনের সঙ্গে বর্তমান সরকারের স্বাস্থ্যনীতির আদর্শগত মিল রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী জানান, বর্তমান সরকার ‘প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম’ তথা ‘প্রিভেনশন ইজ বেটার দেন কিউর’ নীতিতে বিশ্বাসী। রোগ হওয়ার পর তার চিকিৎসা খোঁজার চেয়ে রোগ যাতে না হয়, সে বিষয়ে সচেতন হওয়াটা বেশি জরুরি।
স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে দেশজুড়ে এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে এই স্বাস্থ্যকর্মীদের দক্ষ ও প্রশিক্ষিত করে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের নেতৃত্ব দিতে হবে।
রাজনীতিতে পেশাজীবীদের অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত যেহেতু মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও কাজকে প্রত্যক্ষভাবে প্রভাবিত করে, তাই শিক্ষার্থী, শিক্ষক কিংবা চিকিৎসকদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন থাকা অযৌক্তিক নয়। তবে অতিমাত্রায় রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা যেন পেশাগত দায়িত্ব পালনে কোনো ধরনের ব্যাঘাত না ঘটায়, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি। একইসঙ্গে প্রথাগত রাজনীতির বৃত্ত ভেঙে এর গুণগত পরিবর্তন এখন সময়ের দাবি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে উত্থাপিত বিভিন্ন প্রস্তাবের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বল্প সময়ে বিশেষ বিসিএসের মাধ্যমে ৫ হাজার চিকিৎসক নিয়োগ, সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩২ থেকে ৩৪ বছর এবং অবসরের বয়সসীমা ৬১ থেকে ৬৫ বছরে উন্নীত করার দাবিগুলো অযৌক্তিক নয়। এছাড়া চিকিৎসকদের সুরক্ষা আইন প্রণয়ন, প্রত্যন্ত অঞ্চলে কর্মরতদের জন্য বিশেষ ভাতা, বেসরকারি চিকিৎসকদের জন্য সুনির্দিষ্ট বেতন কাঠামো এবং বিভাগ ও উপজেলা পর্যায়ে বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবগুলো ইতিবাচকভাবে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
তারেক রহমান বলেন, দুর্বল অর্থনীতি, ভঙ্গুর শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং বিভাজিত প্রশাসন নিয়ে বর্তমান সরকার কাজ শুরু করলেও এখন সফলভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা চলছে। এমতাবস্থায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জ্বালানি খাতকে স্বনির্ভর করতে বাস্তবমুখী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। প্রথমবারের মতো স্বাস্থ্য খাতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ রাখা হয়েছে এবং আগামী পাঁচ বছরে তা জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি আরও জানান, দ্রুততম সময়ের মধ্যে ই-হেলথ কার্ড চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং প্রতিটি উপজেলা হাসপাতালকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে কেবল অবকাঠামোগত উন্নয়ন দিয়ে চিকিৎসাব্যবস্থার কাঙ্ক্ষিত উন্নতি সম্ভব নয়, যদি চিকিৎসকরা নিবেদিতপ্রাণ হয়ে সেবামূলক মানসিকতা বজায় না রাখেন।
চিকিৎসকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নানা ধরনের সীমাবদ্ধতা থাকা স্বাভাবিক, তবুও অনেক সময় অনিচ্ছাকৃত অবহেলা বা শৈথিল্য পুরো সরকারের কার্যক্রমকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং সাধারণ মানুষের মনে আস্থার সংকট তৈরি করে। তাই জনগণের প্রত্যাশা পূরণে চিকিৎসকদের আরও বেশি দায়িত্বশীল ও মানবিক হতে হবে।
তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এমন একটি চিকিৎসাবান্ধব বাংলাদেশ গড়ে উঠবে, যেখানে দেশের প্রতিটি মানুষ মানসম্মত চিকিৎসা পাওয়ার পাশাপাশি উন্নত চিকিৎসার জন্য আর বিদেশমুখী হতে বাধ্য হবে না।
উক্ত সমাবেশে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ, স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত, ড্যাব মহাসচিব ডা. মো. জহিরুল ইসলাম শাকিলসহ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
মনোয়ারুল হক/
