ঐতিহাসিক ইরান-যুক্তরাষ্ট্র শান্তি চুক্তির খসড়ায় ১৪ দফা প্রস্তাব
আন্তর্জাতিক ডেস্ক, এবিসিনিউজবিডি, (১৫ জুন) : দীর্ঘদিনের বরফ গলিয়ে অবশেষে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্কে এক নতুন কূটনৈতিক দিগন্তের সূচনা হতে যাচ্ছে। ওয়াশিংটন ও তেহরানের চলমান দ্বিপাক্ষিক আলোচনা ও প্রস্তাবিত সমঝোতা স্মারক (MoU) নিয়ে এবার অত্যন্ত সংবেদনশীল কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে।
ইরানি প্রতিনিধি দলের ঘনিষ্ঠ একটি বিশ্বস্ত সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, খসড়া চুক্তিতে মোট ১৪টি মূল দফা বা প্রস্তাবনা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো— বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্যাংকে আটকে থাকা ইরানের প্রায় ২৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিপুল পরিমাণ জব্দকৃত অর্থ ছাড়করণের প্রস্তাব।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী ৬০ দিনের একটি চূড়ান্ত আলোচনাকালীন সময়সীমার (Discussion Period) মধ্যেই এই বিশাল তহবিল তেহরানের জন্য অবমুক্ত করা হতে পারে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, দুই দেশের দীর্ঘদিনের বৈরী সম্পর্কের ইতিহাসে চলমান সংকট নিরসনে এখন পর্যন্ত এটিই সবচেয়ে বিস্তারিত এবং সুনির্দিষ্ট খসড়া রূপরেখা।
উভয় পক্ষের এই নমনীয় অবস্থান যদি চূড়ান্ত রূপ পায়, তবে তা মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিসহ বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।
এছাড়া জানা গেছে, প্রস্তাবিত চুক্তিটি আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হতে পারে, যদিও এখনো তা চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
প্রস্তাবিত খসড়ায় যেসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে তা হলো-
১. লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধের স্থায়ী ও অবিলম্বে অবসান।
২. ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং সার্বভৌমত্বের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সম্মান প্রদর্শনের প্রতিশ্রুতি।
৩. ৩০ দিনের মধ্যে ইরানের ওপর আরোপিত নৌ-অবরোধ সম্পূর্ণ প্রত্যাহার।
৪. ইরান সংলগ্ন অঞ্চল থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি এবং অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন না করার অঙ্গীকার।
৫. ৩০ দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করা।
৬. তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা স্থগিত এবং ইরানের আর্থিক সম্পদে পূর্ণ প্রবেশাধিকার প্রদান।
৭. যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের পক্ষ থেকে অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পুনর্গঠন পরিকল্পনা উপস্থাপন।
৮. পারমাণবিক ইস্যুতে চূড়ান্ত সমঝোতা ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের লক্ষ্যে ৬০ দিনের আলোচনা প্রক্রিয়া।
৯. পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার বিষয়ে এনপিটি-তে ইরানের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত।
১০. আলোচনার সময় নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ না করা এবং মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত সামরিক উপস্থিতি না বাড়ানোর মার্কিন প্রতিশ্রুতি।
১১. আলোচনার ৬০ দিনের মধ্যে ইরানের ২৪ বিলিয়ন ডলারের জব্দকৃত অর্থ মুক্ত করা; এর অর্ধেক আলোচনা শুরুর আগেই প্রদান।
১২. চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য একটি পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গঠন।
১৩. চূড়ান্ত চুক্তিকে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাব হিসেবে অনুমোদন।
১৪. আলোচনার শুরু শর্তসাপেক্ষ-অর্থ মুক্তি, তেল নিষেধাজ্ঞা স্থগিত এবং নৌ-অবরোধ প্রত্যাহারের পরই চূড়ান্ত আলোচনা শুরু হবে। চূড়ান্ত চুক্তিতে মূলত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং অর্থনৈতিক পুনর্গঠন বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকবে। পাশাপাশি ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন বিষয়টি আলোচনার বাইরে রাখা হয়েছে।
এছাড়া নতুন তথ্য অনুযায়ী, খসড়ায় লেবাননের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষার বিষয়ে অতিরিক্ত নিশ্চয়তা সংযুক্ত করা হয়েছে বলে জানা গেছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানিয়েছেন, প্রস্তাবিত খসড়াটি এখনো সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর পর্যালোচনা ও চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
মনোয়ারুল হক/
