প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব পেট্রোবাংলার

নিউজ ডেস্ক, এবিসিনিউজবিডি, ঢাকা (৩১ জুলাই) : ভর্তুকির ক্রমবর্ধমান চাপ কমাতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও যানবাহনে ব্যবহৃত সংকুচিত প্রাকৃতিক গ্যাসের (সিএনজি) দাম বাড়ানোর নতুন উদ্যোগ হাতে নিয়েছে পেট্রোবাংলা।

সম্প্রতি জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগে পাঠানো এক প্রস্তাবে বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম ১৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৫ টাকা এবং সিএনজির দাম ৪৩ টাকা থেকে প্রায় ৬৫ টাকা নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির উচ্চমূল্য এবং আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির ধাক্কা সামাল দিতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

প্রস্তাবটি বর্তমানে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগে পর্যালোচনার টেবিলে রয়েছে এবং প্রাথমিক যাচাই-বাছাই শেষে তা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কাছে পাঠানো হবে। আইন অনুযায়ী বিইআরসি গণশুনানি আয়োজন এবং সব পক্ষের মতামত ও আর্থিক বিশ্লেষণ যাচাইয়ের পর গ্যাসের নতুন দাম নির্ধারণ করবে; সরাসরি পেট্রোবাংলা বা বিতরণ কোম্পানির প্রস্তাব বাস্তবায়নের কোনো সুযোগ নেই। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, বর্তমান পদক্ষেপে কেবল বিদ্যুৎ ও সিএনজি খাতকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে—আবাসিক, বাণিজ্যিক কিংবা চলমান শিল্প গ্রাহকদের জন্য নতুন করে দাম বাড়ানোর কোনো প্রস্তাব দেওয়া হয়নি। এর আগে গত বছরের এপ্রিল মাসে নতুন শিল্পে এবং নভেম্বরে সার কারখানায় গ্যাসের দাম সমন্বয় করা হয়েছিল।

গ্যাসের দামের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলোও তাদের বিতরণ মাশুল বাড়ানোর জন্য জোরালো আবেদন জানিয়েছে। কোম্পানিগুলোর দাবি, বর্তমান মাশুল দিয়ে দৈনন্দিন পরিচালন ব্যয় মেটানো দুরূহ হয়ে পড়েছে এবং অনেক প্রতিষ্ঠানই খুঁড়িয়ে চলছে।

বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানান, বিষয়টি তাদের কানে এসেছে এবং দাপ্তরিকভাবে প্রস্তাব হাতে পেলেই নিয়মানুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

পেট্রোবাংলার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির চড়া দামের কারণে সংস্থাটির গ্যাস সংগ্রহ ব্যয় ব্যাপক হারে বেড়ে গেছে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিভিন্ন উৎস থেকে সংগৃহীত গ্যাসের গড় ক্রয়মূল্য ছিল প্রতি ঘনমিটার ৩১.৬৫ টাকা, অথচ বিক্রয়মূল্য ছিল মাত্র ২৩.৬৩ টাকা। এর ফলে প্রতি ঘনমিটারে প্রায় ৮.০২ টাকা করে ঘাটতি তৈরি হয়। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও হরমুজ প্রণালির সংকটের পর পরিস্থিতি আরও জটিল রূপ নেয়—চলতি বছরের এপ্রিল থেকে জুন প্রান্তিকে গ্যাসের গড় ক্রয়মূল্য একলাফে ৪৫.৭৯ টাকায় গিয়ে ঠেকে। অথচ আগের পুরনো মূল্যে গ্যাস সরবরাহ অব্যাহত থাকায় ওই তিন মাসেই প্রতি ঘনমিটারে ২১.৮২ টাকার বিশাল ঘাটতির সৃষ্টি হয়। সব মিলিয়ে গত অর্থবছরে পেট্রোবাংলার মোট আর্থিক লোকসানের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১৬,৫00 কোটি টাকা, যার বিপরীতে সরকারের পক্ষ থেকে ১৪,৬০০ কোটি টাকার ভর্তুকি দেওয়া হয়।

দেশে গ্যাস সরবরাহে দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক—উভয় উৎসের ওপরই নির্ভরতা রয়েছে। রাষ্ট্রীয় ও বহুজাতিক বিভিন্ন উৎস থেকে তুলনামূলক কম দামে গ্যাস পাওয়া গেলেও কাতার ও ওমান থেকে আমদানি করা এলএনজির দাম প্রতি হাজার ঘনফুট প্রায় ১০.৬৬ থেকে ১০.৯০ ডলারের কাছাকাছি হওয়ায় আমদানি ব্যয় কয়েক গুণ বেশি পড়ে। একসময়ে দেশীয় ক্ষেত্রগুলো থেকে দৈনিক প্রায় ২৮০ কোটি ঘনফুট গ্যাস তোলা হলেও রিজার্ভ হ্রাসের কারণে তা বর্তমানে কমে নেমেছে প্রায় ১৬৫ কোটি ঘনফুটে। বিগত অর্থবছরে মোট চাহিদার প্রায় ৩০ শতাংশ আমদানি ও ৭০ শতাংশ দেশীয় উৎস থেকে মেটানো হলেও পেট্রোবাংলার আশঙ্কা, ২০৩০ সালের মধ্যেই এই অনুপাত উল্টে গিয়ে ৭০ শতাংশ আমদানি নির্ভরতা তৈরি হতে পারে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘকাল ধরে পর্যাপ্ত অনুসন্ধান ও ড্রিলিং কার্যক্রমের অভাবে দেশীয় উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে সংকুচিত হচ্ছে। ১৯৯৫ সালের জ্বালানি নীতিতে প্রতিবছর অন্তত চারটি নতুন অনুসন্ধান কূপ খননের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও তা নিয়মিত বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে নতুন ক্ষেত্র আবিষ্কার থমকে গেছে এবং শিল্পায়ন ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

বিশেষজ্ঞদের জোরালো পরামর্শ, শুধু আমদানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বাড়িয়ে ভর্তুকির বোঝা ভারী না করে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে জরুরি ভিত্তিতে বিনিয়োগ ও তৎপরতা বাড়াতে হবে।

মনোয়ারুল হক/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
ব্রেকিং নিউজ