কোণঠাসা ১৯৭১, ডাকসু দেয়ালে জিন্নাহর ছবি ও ইতিহাসের বিতর্ক

বিশেষ প্রতিনিধি, এবিসিনিউজবিডি, ঢাকা (১৫ সেপ্টেম্বর): ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) জাদুঘর ও আর্কাইভে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি প্রদর্শন নিয়ে সাম্প্রতিক বিতর্ক কেবল একটি নির্দিষ্ট ছবির উপস্থিতি বা অনুপস্থিতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর পরিধি আরও অনেক বিস্তৃত। মূল প্রশ্নটি এখন সামনে চলে এসেছে—আমরা কি আমাদের জাতীয় ইতিহাসের স্মৃতিপটে কেবল নির্দিষ্ট কিছু অংশ রাখছি এবং সুকৌশলে মুছে ফেলছি অন্য অধ্যায়গুলো? নাকি নতুন করে লেখা হচ্ছে আমাদের শেকড়ের ইতিহাস?

ডাকসু আর্কাইভ বিতর্ক ও জিন্নাহর ছবির প্রেক্ষাপট

সম্প্রতি ডাকসু আর্কাইভ চালুর পর সেখানে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহকে কেন্দ্র করে বেশ কিছু ঐতিহাসিক উপাদান ও ছবি স্থান পায়। এর মধ্যে ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ রাষ্ট্রভাষা প্রসঙ্গে জিন্নাহর বিতর্কিত বক্তব্যের ছবি, ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের ছবি এবং ১৯৭০ সালের নির্বাচন সংক্রান্ত পত্রিকার কাটিংও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

এই প্রদর্শনীকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের একটি অংশের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদের জন্ম হয়। প্রতিবাদের একপর্যায়ে এক শিক্ষার্থী দেয়াল থেকে জিন্নাহর ছবি নামিয়ে ফেলেন। এর জবাবে অন্য একটি পক্ষ ১৯৮১ সালে বায়তুল মোকাররমের সামনে সাবেক জামায়াত আমির গোলাম আযমকে জুতা পেটার একটি ঐতিহাসিক ছবি সেখানে টানিয়ে দেয়। পুরো ঘটনাটি খতিয়ে দেখতে ইতোমধ্যে তদন্তের ঘোষণা দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

ইতিহাসের নির্মম সত্য হলো, জিন্নাহ উপমহাদেশের রাজনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব এবং পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা। ফলে কোনো ঐতিহাসিক আর্কাইভে তাঁর ছবি বা তথ্য থাকার তাত্ত্বিক কারণ থাকতে পারে। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বিদ্যাপীঠের দেয়ালে যখন তাঁর ছবি প্রদর্শিত হয়, তখন তার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও ভাষার প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

১৯৪৮ সালের মার্চে উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণার মাধ্যমে জিন্নাহ যে অবস্থান নিয়েছিলেন, তা অবধারিতভাবে পূর্ব বাংলার মানুষের স্বাধিকার ও ভাষিক চেতনার সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছিল। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন কেবল মুখের বুলির লড়াই ছিল না; এটি ছিল বাঙালির জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষপর্ব। সুতরাং, ভাষা আন্দোলনকে বাংলাদেশের জন্মলগ্নের ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার কোনো অবকাশ নেই।

১৯৪৭ বনাম ১৯৭১: ইতিহাস ব্যাখ্যার টানাপোড়েন

গত ২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর থেকেই বাংলাদেশের ইতিহাস নতুন করে রচনার এক অদৃশ্য প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। এর অংশ হিসেবে ২০২৪ ও ২০২৫ সালে ঢাকার বিভিন্ন মঞ্চে জিন্নাহর জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী পালনের মতো ঘটনাও ঘটেছে, যা স্বাধীনতার পর বেশ বিরল। এসব অনুষ্ঠানে কোনো কোনো বক্তার বক্তব্যে ১৯৪৭ সালের দেশভাগকে ‘প্রথম স্বাধীনতা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি দাবি করা হয়েছে, ভারত পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশকে বিচ্ছিন্ন করেছিল।

তবে ঐতিহাসিক সত্য হলো, ১৯৪৭ সালে পূর্ব বাংলা পাকিস্তানের অংশ হয়েছিল বটে, কিন্তু বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে ১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। ১৯৪৭ সালকে মূল ভিত্তি ধরে ১৯৭১ কে দুই মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যকার নিছক বিচ্ছেদ হিসেবে দেখানোর একটি সুপ্ত প্রয়াস বর্তমান বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।

শুরু থেকেই অর্থনৈতিক শোষণ, রাজনৈতিক বৈষম্য এবং সাংস্কৃতিক পরাধীনতার বিরুদ্ধে বাঙালি দীর্ঘ লড়াই চালিয়েছে। ভাষা আন্দোলন, ৬ দফা, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান এবং ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বিপুল জয়ের পরও যখন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তর করেনি, তখন অনিবার্যভাবে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ ও অপারেশন সার্চলাইট। এই ধারাবাহিকতা অস্বীকার করার অর্থ ইতিহাসকে বিকৃত করা।

রাজনৈতিক বলয় ও মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত মালিকানা

আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন ধরে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে নিজেদের রাজনৈতিক একচেটিয়া সম্পত্তি বানিয়ে ফেলার চেষ্টা করেছে—এই সমালোচনা যৌক্তিক। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, সেই ক্ষোভের সুযোগ নিয়ে একাত্তরের স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি বা পাকিস্তানি রাজনৈতিক প্রকল্পকে নতুন করে পুনর্বাসন করা হবে। একইভাবে, জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক তৎপরতা কিংবা ১৯৭১ সালে তাদের ভূমিকা নতুন ব্যাখ্যার মোড়কে উপস্থাপন করার কোনো সুযোগ নেই।

ইতিহাস কোনো একক দল বা গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম থেকে শুরু করে অগণিত বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাংস্কৃতিক কর্মী এবং ভারতের মাটিতে আশ্রয় নেওয়া লাখো সাধারণ মানুষের সম্মিলিত রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে এই বাংলাদেশ।

সমাধান কোথায়? ছবি থাকুক, সঙ্গে থাকুক পুরো ইতিহাস

ডাকসু আর্কাইভে জিন্নাহর ছবি নামিয়ে ফেলা বা বিতর্ক ধামাচাপা দেওয়া কোনো স্থায়ী সমাধান হতে পারে না। সমাধান হলো পূর্ণাঙ্গ ও বিকৃতিহীন ইতিহাসের উপস্থাপন। জিন্নাহর ছবির পাশে তাঁর ১৯৪৮ সালের সেই বিতর্কিত বক্তব্যও থাকতে হবে, থাকতে হবে কেন বাঙালি সেই বৈষম্যমূলক নীতি প্রত্যাখ্যান করেছিল তার যৌক্তিক কারণ। আর্কাইবের কাজ কাউকে হিরো বানানো নয়, বরং তরুণ প্রজন্মকে প্রশ্ন করতে শেখানো।

জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান আমাদের সামনে ইতিহাসকে দলীয় লেজুড়বৃত্তি থেকে মুক্ত করার অনন্য এক সুযোগ এনে দিয়েছে। সেই সুযোগকে কোনোভাবেই ১৯৭১-এর মূল চেতনা মুছে ফেলার হাতিয়ারে পরিণত করা যাবে না। মুক্তিযুদ্ধ কিংবা বাংলাদেশের জন্ম ইতিহাস কোনো নির্দিষ্ট দল বা বিদেশি শক্তির সার্টিফিকেট বা ব্যাখ্যার মুখাপেক্ষী নয়। এই দেশ যেভাবে এবং যে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জন্ম নিয়েছে, সেই সামগ্রিক সত্যকে ধারণ করাই এখনকার সবচেয়ে বড় সময়োপযোগী দাবি।

মনোয়ারুল হক/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
ব্রেকিং নিউজ