অর্থসংকটে ইসরায়েল, পিছিয়ে গেল ১২ অ্যাপাচি হেলিকপ্টার সরবরাহ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, এবিসিনিউজবিডি, (১৫ সেপ্টেম্বর): যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রাগারে গোলাবারুদের টান এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় অস্থিরতার খবরের মধ্যেই বড় ধরনের আর্থিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছে ইসরায়েল। এ অবস্থার কারণে তেলআবিব ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার একটি জরুরি প্রতিরক্ষা চুক্তি আপাতত থমকে গেছে। ফলে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর বহরে যুক্ত হওয়ার কথা থাকা ১২টি অত্যাধুনিক অ্যাপাচি অ্যাটাক হেলিকপ্টার পাওয়ার বিষয়টি চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

পার্সটুডের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ইরানের সংঘাতের পর মার্কিন সামরিক বাহিনীর অস্ত্রের ঘাটতি ও সরবরাহে জটিলতা নিয়ে পেন্টাগন একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ঠিক সেই সময়েই ইসরায়েলি চ্যানেল ১২ এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করে।

চ্যানেল ১২-এর তথ্যানুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং কোম্পানির উৎপাদন কারখানায় ইসরায়েলের জন্য তৈরি এক ডজন অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ইতোমধ্যে প্রস্তুত অবস্থায় ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে যথাযথ অর্থ পরিশোধ করতে না পারায় বোয়িং কর্তৃপক্ষ ওই হেলিকপ্টারগুলো অন্য কোনো ক্রেতার কাছে বিক্রি করে দেওয়ার কথা ভাবছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, এই চুক্তিটি টিকিয়ে রাখতে দ্রুত কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না নেওয়া হলে, ইসরায়েলি বিমানবাহিনীর নতুন এই অ্যাপাচিগুলো হাতে পেতে দীর্ঘ তিন বছর পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে।

ট্যাংক ও গোলাবারুদ ঘাটতির মুখে ইসরায়েলি বাহিনী

ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা খাতের আর্থিক সংকট কেবল হেলিকপ্টার ক্রয়ের মাঝেই সীমাবদ্ধ নেই। এর আগে দেশটির অপর গণমাধ্যম ‘কান ১১’র এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মারাত্মক আর্থিক অনটন এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ সংগ্রহে ব্যর্থতার কারণে বেশ কয়েকটি ট্যাংক ব্যাটালিয়নের অপারেশনাল কার্যক্রম স্থগিত রাখার চিন্তা করছে সামরিক নেতৃত্ব।

পাশাপাশি, ইসরায়েলের শীর্ষস্থানীয় অস্ত্র প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান এলবিট সিস্টেমস মারকাভা ট্যাংকের নির্দিষ্ট কিছু কামানের গোলা উৎপাদন বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানা গেছে। একইসঙ্গে ফিল্ড গান ও মর্টারের গোলাবারুদ উৎপাদনের লাইনগুলোও বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রবল শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

সামরিক শিল্পে ১৫ বিলিয়ন শেকেল দেনা

সব মিলিয়ে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর ভেতরের আর্থিক দুরবস্থা এখন চরমে পৌঁছেছে। প্রতিরক্ষা বাজেট বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে দেশটির রাজনৈতিক মহল ও সামরিক নীতিনির্ধারকদের মধ্যকার মতপার্থক্য ও দ্বন্দ্ব দিন দিন তীব্র আকার ধারণ করছে।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নির্দেশ সত্ত্বেও প্রস্তাবিত অতিরিক্ত ৪০ বিলিয়ন শেকেল (প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলার) সামরিক বাজেট আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন দেয়নি দেশটির অর্থ মন্ত্রণালয়।

ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর এক শীর্ষ কর্মকর্তা ‘কান’ চ্যানেলকে বলেছেন, দেশের বিভিন্ন সামরিক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কাছে দেশটির সেনাবাহিনীর বকেয়া ঋণের পরিমাণ ইতোমধ্যে ১৫ বিলিয়ন শেকেল ছাড়িয়ে গেছে। পরিস্থিতি যদি এমনই চলতে থাকে, তবে একই সঙ্গে একাধিক ফ্রন্টে যুদ্ধ পরিচালনা কিংবা সার্বিক সামরিক প্রস্তুতি বজায় রাখার সক্ষমতা মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

ইরানের সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় ৩৩.৪ বিলিয়ন ডলার

এদিকে মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসি নিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পেন্টাগনের ইন্সপেক্টর জেনারেলের প্রকাশিত প্রথম যুদ্ধসংক্রান্ত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ইরানের বিরুদ্ধে সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৩৩.৪ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে।

এই বিশাল ব্যয়ের মধ্যে আনুমানিক ২২.৩ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে কেবল গোলাবারুদ বাবদ। এছাড়া ৩.৭ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জাম হারানোর ক্ষতিপূরণে এবং বাকি ৭.৪ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে অন্যান্য খাতে।

পেন্টাগন জানিয়েছে, এই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের ফলে মার্কিন সামরিক বাহিনীর গোলাবারুদের মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে এবং সামগ্রিক সাপ্লাই চেইনে প্রচণ্ড চাপ তৈরি হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, একদিকে ইসরায়েলের নিজস্ব সামরিক বাজেটে টানাপোড়েন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় জটিলতা, অন্যদিকে খোদ যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডারেও ঘাটতির চাপ—এই দ্বিমুখী সংকট তেলআবিব ও ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের সামরিক সহযোগিতাকে এক নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে। সূত্র: পার্সটুডে

মনোয়ারুল হক/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
ব্রেকিং নিউজ