নতুন পে-স্কেলের গেজেট এবং বাস্তবায়ন কবে নাগাদ, কী বলছেন অর্থ উপদেষ্টা?
নিজস্ব প্রতিবেদক (ঢাকা), এবিসিনিউজবিডি, (২ জুলাই) : সরকারি চাকুরিজীবীদের জন্য নতুন অর্থবছরে বেতন বাড়ছে— বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর এমন স্পষ্ট ঘোষণার পর থেকেই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা। ১ জুলাই থেকে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হওয়ার কথা থাকলেও সরকারের পক্ষ থেকে এখনো চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশ করা হয়নি। ফলে কোন গ্রেডে ঠিক কত টাকা বেতন বাড়ছে, তা নিয়ে ধোঁয়াশা কাটেনি। অন্তর্বর্তী সরকারের গঠন করা কমিশনের প্রস্তাব হুবহু কার্যকর হবে, নাকি বর্তমান সরকার নতুন কোনো রূপরেখা আনছে— তা জানতে আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।
অবশ্য ক্ষমতা গ্রহণের পর সামগ্রিক পরিস্থিতি মূল্যায়নে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করে বর্তমান সরকার। এই কমিটি ইতোমধ্যে নতুন বেতন কাঠামোর একটি খসড়া রূপরেখা প্রস্তুত করেছে, যা বর্তমানে চূড়ান্তকরণের কাজ চলছে। নতুন এই কাঠামোতে মূল্যস্ফীতির চাপ সামলানোর উপায় এবং কয়টি ধাপে সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো হবে, তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, ১ জুলাই থেকে নতুন বেতন কার্যকর করার পরিকল্পনা থাকলেও আইনি প্রক্রিয়া, প্রশাসনিক আদেশ এবং গেজেট প্রকাশের বাধ্যবাধকতার কারণে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে কিছুটা বিলম্ব হতে পারে। তবে গেজেট প্রকাশে দেরি হলেও, কর্মচারীরা বকেয়াসহ বর্ধিত বেতন পাবেন— এমন আলোচনাও চলছে নীতিপ্রোত মহলে। সরকারের পক্ষ থেকেও আশ্বস্ত করা হচ্ছে যে, ‘যথাসময়েই’ নতুন এই বেতন স্কেল আলোর মুখ দেখবে।
কমিশনের সুপারিশ ও বিশাল বাজেটের চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশে সর্বশেষ জাতীয় বেতন স্কেল কার্যকর হয়েছিল ২০১৫ সালে। এরপর দীর্ঘ এক দশক ধরে বার্ষিক ৫ শতাংশ হারে স্বয়ংক্রিয় ইনক্রিমেন্ট পেলেও নতুন কোনো পে-স্কেল পাননি সরকারি চাকুরিজীবীরা। ফলে জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ার কারণে নতুন বেতন কাঠামোর দাবি দীর্ঘদিনের।
এই প্রেক্ষাপটে ২০২৫ সালে সাবেক অর্থ সচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে ‘জাতীয় বেতন কমিশন, ২০২৫’ গঠন করেছিল তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার। গত ২২ জানুয়ারি জমা দেওয়া প্রতিবেদনে কমিশন কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর অভাবনীয় সুপারিশ করে। যেখানে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮,২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০,০০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ধাপ ৭৮,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০,০০০ টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। এছাড়া বৈশাখী ভাতা ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করা এবং ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের যাতায়াত ভাতায় বড় ধরনের সংস্কারের কথা বলা হয়েছিল। তবে এই বিশাল সুপারিশ পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন, যা জাতীয় বাজেটে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
‘ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন’: অর্থ উপদেষ্টার বক্তব্য
অর্থনৈতিক বাস্তবতার বিষয়টি মাথায় রেখেই নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সরকার পদক্ষেপ নিচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি জানান, নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি রক্ষায় ইতিমধ্যে পুরো বিষয়টি রিভিউ করা হয়েছে।
তবে কবে নাগাদ চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশ হবে— এমন প্রশ্নের সরাসরি জবাব না দিয়ে উপদেষ্টা স্পষ্ট করেছেন যে, নতুন পে-স্কেল একবারে নয়, বরং পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে। প্রথম ধাপে কর্মচারীদের মূল বেতন (বেসিক) বাড়ানো হবে এবং পরবর্তীতে অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা যুক্ত হবে। কোন গ্রেডে কত টাকা বাড়ছে, তা রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা ও চূড়ান্ত পর্যালোচনার পরই জানা যাবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
উল্লেখ্য, জাতীয় সংসদে বাজেট পেশ করার সময় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছিলেন, বিগত ১১ বছর ধরে একই কাঠামোতে বেতন পাওয়ায় মূল্যস্ফীতির কারণে কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বেড়েছে। তাই আগামী ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ধাপে ধাপে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের ঘোষণা দেন তিনি। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে আভাস পাওয়া গেছে, সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে চলতি জুলাই মাসের মাঝামাঝি বা শেষ সপ্তাহের মধ্যেই বেতন বৃদ্ধির বহুল প্রতীক্ষিত এই গেজেটটি প্রকাশ করা হতে পারে। সূত্র: বিবিসি বাংলা
মনোয়ারুল হক/
