গভীর সংকটের মুখে এসএস পাওয়ার প্ল্যান্ট, উৎপাদন বন্ধের শঙ্কা

চট্টগ্রাম ব্যুরো, এবিসিনিউজবিডি, (৭ এপ্রিল) : কয়লা সরবরাহ পাওয়ার ক্ষেত্রে গভীর সংকটের মুখে পড়েছে চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে অবস্থিত এসএস পাওয়ার-ওয়ান লিমিটেড বিদ্যুৎকেন্দ্রটি। এ ছাড়া সমুদ্রপথে কয়লা আনার ভাড়া নিয়ে জটিলতা, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের কাছে বড় অঙ্কের পাওনা এবং সঠিক পরিকল্পনার অভাবে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।

জ্বালানিসংকটের বর্তমান পরিস্থিতিতে আগামী ১২ এপ্রিল থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

গত রবিবার বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) চেয়ারম্যানকে পাঠানো এক চিঠিতে এসএস পাওয়ার ওয়ান লিমিটেড এমন আশঙ্কার কথা জানিয়েছে।

চিঠিতে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, চলমান বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে কয়লা সরবরাহ ব্যবস্থায় গুরুতর বিঘ্ন তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে সমুদ্রপথে কয়লা পরিবহনের ভাড়া নির্ধারণ না হওয়ায় নতুন চালান নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। কয়লা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, সরকার নির্ধারিত ভাড়া কাঠামো ছাড়া তারা নতুন কোনো চালানের সময়সূচি নির্ধারণ করবে না। বর্তমানে ইন্দোনেশিয়া থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে কয়লা পরিবহনের ভাড়া প্রতি মেট্রিক টন ২৫ দশমিক শূন্য ৫ মার্কিন ডলার।

দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে এসএস পাওয়ার ওয়ান দাবি জানিয়ে এলেও সমুদ্রপথে কয়লা আনার ভাড়া এখন পর্যন্ত বাস্তবসম্মতভাবে বাজারদরের সঙ্গে মেলানো সম্ভব হয়নি। কাগজে-কলমে আলোচনা হয়েছে, চিঠি গেছে, বৈঠক হয়েছে, এমনকি গত দুই মাসে আরও বেশি তাগাদা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সিদ্ধান্ত আসেনি। এই অমীমাংসিত পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে।

চিঠিতে বলা হয়েছে, কয়লার জাহাজ ঠিক করতে হলে আগে দরকার ভাড়ার নিশ্চয়তা। এই সরল শর্তে অনড় রয়েছেন সরবরাহকারীরা। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ভাড়া নির্ধারিত না হলে ‘লে-ক্যান’ বা জাহাজ পাঠানোর সময়সীমা ঠিক করা সম্ভব নয়। অর্থাৎ কয়লা আসবে কি না, কবে আসবে–সবই অনিশ্চিত।

চিঠিতে তারা জানিয়ে দিয়েছেন, ইন্দোনেশিয়া থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত প্রতি টন কয়লা আনতে এখন খরচ পড়ছে ২৫ দশমিক শূন্য ৫ ডলার। কিন্তু এই বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করে এমন কোনো সরকারি ফ্রেইট কাঠামো এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

এদিকে বকেয়া পাওনার বিষয়টিও বড় চাপ হয়ে উঠেছে এসএস পাওয়ার ওয়ানের জন্য। বাংলাদেশ পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের (বিপিডিবি) কাছে প্রায় ৩ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকার মতো অর্থ আটকে আছে। ফলে এসএস পাওয়ার প্ল্যান্টের নগদপ্রবাহ কমে গেছে। শুধু তা-ই নয়, মাসিক বিল থেকেও সমুদ্রপথের ভাড়ার একটি বড় অংশ কেটে রাখা হচ্ছে নিয়মিত। ফলে কাগজে আয় থাকলেও হাতে নগদ আসছে না। এই আর্থিক টানাপোড়েনের প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে আমদানি ব্যবস্থায়। অর্থের অভাবে কয়লা কিনতে প্রয়োজনীয় এলসিও খোলা যাচ্ছে না। ফলে কয়লাও আনা যাচ্ছে না।

সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এখন জটিল চক্রে আটকে গেছে। ভাড়া ঠিক না হওয়ায় জাহাজ আসছে না। বকেয়া ও কাটছাঁটে নগদ সংকট বাড়ছে। অর্থের অভাবে আমদানির পথও সংকুচিত হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত বিদ্যুৎকেন্দ্রে পর্যাপ্ত কয়লা মজুত না থাকলে উৎপাদন অব্যাহত রাখা কঠিন।

বর্তমানে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির মজুত কয়লার পরিমাণ মাত্র ১ লাখ ৩ হাজার ৬২৯ মেট্রিক টন। এই পরিমাণ কয়লা দিয়ে পূর্ণ সক্ষমতায় সর্বোচ্চ সাত দিনের উৎপাদন করা যাবে। এই সীমিত মজুত নিয়েই এখন উৎপাদন চালাতে হচ্ছে।

এসএস পাওয়ার জানিয়েছে, পরিস্থিতি দ্রুত সমাধান না হলে তারা বিদ্যুৎ সরবরাহ স্থগিত করতে বাধ্য হবে। সমাধানের জন্য প্রতিষ্ঠানটি তিনটি জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। প্রথমত, দ্রুত সমুদ্রপথে পরিবহনের গ্রহণযোগ্য ভাড়া নির্ধারণ, পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য যেভাবে এই ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছিল, এই ক্ষেত্রেও সেভাবে করা যেতে পারে।

দ্বিতীয়ত, বকেয়া বিল পরিশোধ ও আটকে রাখা অর্থ অতি দ্রুত ছাড় করতে হবে। তৃতীয়ত, জাতীয় লোড ডিসপ্যাচ সেন্টারের সঙ্গে সমন্বয় করে বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিকল্পনা ঠিক করা যেতে পারে। এসএস পাওয়ার বলছে, তারা জাতীয় গ্রিডে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে কয়লা সংগ্রহ ও মজুত বজায় রাখা সম্ভব হবে না। ফলে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

মনোয়ারুল হক/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
ব্রেকিং নিউজ