দুই দিনের বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম অচল: জলাবদ্ধতায় ক্ষতি ৫০ কোটির বেশি

চট্টগ্রাম ব্যুরো, এবিসিনিউজবিডি, (৫ মে) : চট্টগ্রামে বৃষ্টি মানেই আতঙ্ক—আর সেই আতঙ্কই এবার বাস্তবে রূপ নিয়েছে। বৈশাখের অল্প বৃষ্টিতেই তলিয়ে গেছে নগরের নিচু এলাকাগুলো। জলাবদ্ধতায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা। প্রাথমিক হিসাবে জানা গেছে, দুই দিনের এই জলাবদ্ধতায় ক্ষতির পরিমাণ ৫০ কোটি টাকারও বেশি।

বৃষ্টির পানি জমে নগরের বিভিন্ন এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে স্থবিরতা। নিচু এলাকা প্লাবিত হওয়ায় বাসাবাড়িতে পানি ঢুকে পড়ে, নষ্ট হয় আসবাবপত্র ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। অনেক জায়গায় সড়কের অবস্থা বেহাল হয়ে পড়েছে—গর্ত সৃষ্টি হওয়ায় যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। পানিতে তলিয়ে গেছে দোকানের পণ্য, নষ্ট হয়েছে কোটি টাকার মালামাল।

তবে এবারের জলাবদ্ধতা অন্যবারের চেয়ে কিছুটা ভিন্ন আলোচনায় ছিল। এবারের দুর্ভোগের কথা জাতীয় সংসদে আলোচনা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চট্টগ্রামবাসীর দুর্দশার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন। ব্যবস্থা নিতে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমকে জরুরিভিত্তিতে চট্টগ্রাম পাঠিয়েছেন। তিনি এসেই চট্টগ্রামবাসীর ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢেলেছেন।

তিনি বলেছেন, ‘চট্টগ্রাম মহানগরী পানিতে ডুবে যাওয়ার যে খবর ছড়িয়েছে, তার অনেকটাই ভিত্তিহীন, বানোয়াট ও কাল্পনিক। ২০২৪ সালের ছবি ব্যবহার করেও অপপ্রচার চালানো হয়েছে।’

তার এই মন্তব্যে চট্টগ্রামবাসী তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারা মন্ত্রীর সমালোচনা করেছেন।

পরে প্রতিমন্ত্রী চট্টগ্রামের বিভিন্ন সরকারি সংস্থার কর্মকর্তাদের নিয়ে আয়োজিত বৈঠকে জলাবদ্ধতার জন্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চেয়ারম্যান এবং ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালককে দায়ী করেন।

মন্ত্রী সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী নুরুল করিমকে সরকারবিরোধী বলেও আখ্যা দেন, যা তিনি সরাসরি নাকচ করেন।

সিডিএ চেয়ারম্যান বলেন, জলাবদ্ধতা প্রকল্পের প্রতিটি বিষয়ে তিনি খবর রাখছেন। সেনাবাহিনী খালের কাজ করার জন্য বিভিন্ন জায়গায় অস্থায়ী বাঁধ দেওয়ায় কিছু এলাকার পানি নিষ্কাশন হতে দেরি হয়েছে। সেই বাঁধগুলো কেটে দেওয়ার জন্য তাদের বলা হয়েছে।

প্রবর্তক মোড় ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সড়কে প্রায় ৫ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে জানা গেছে। বিশেষ করে ওষুধ ও সার্জিক্যাল পণ্য পানিতে ভিজে অচল হয়ে পড়েছে।

মুরাদপুর, বহদ্দারহাট, চকবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় একই চিত্র দেখা গেছে। অনেক রেস্টুরেন্টের রান্না করা খাবার পানিতে ভিজে ফেলে দিতে হয়েছে, যার ফলে বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।

প্রবর্তক মোড়ের এক ব্যবসায়ী জানান, জীবনের সঞ্চয় দিয়ে গড়া তার দোকান দুই দিনের জলাবদ্ধতায় প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে।

অন্যদিকে, একটি রেস্টুরেন্টের ব্যবস্থাপক জানান, একদিনেই তাদের প্রায় তিন লাখ টাকার খাবার নষ্ট হয়েছে।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের তথ্যমতে, জলাবদ্ধতায় সড়ক, নালা ও নির্মাণাধীন প্রকল্প মিলিয়ে প্রায় ৩৫ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। অনেক সড়কের উপরের অংশ উঠে গেছে এবং নালার দেয়াল ভেঙে পড়েছে।

জলাবদ্ধতা নিয়ে সরকারি পর্যায়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। এ বিষয়ে দেওয়া এক মন্তব্যকে ঘিরে জনমনে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।

পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বৈঠকে জলাবদ্ধতার জন্য উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাকে দায়ী করা হয়।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, নগরের খালগুলোতে নির্মিত অস্থায়ী বাঁধ অপসারণের কাজ চলছে। আশা করা হচ্ছে, দ্রুত এসব বাধা সরানো গেলে পানি নিষ্কাশন স্বাভাবিক হবে।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, নিচু এলাকাগুলোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ না করলে এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন।

চট্টগ্রামে দুই দিনের জলাবদ্ধতায় ব্যবসা-বাণিজ্য, অবকাঠামো ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বড় ধাক্কা লেগেছে। সাময়িক সমাধানের পাশাপাশি টেকসই পরিকল্পনাই এখন সময়ের দাবি।

জানতে চাইলে বৃহত্তর চট্টগ্রাম উন্নয়ন সংগ্রাম কমিটির মহাসচিব মুজিবুল হক শাকুর বলেন, চট্টগ্রামবাসী কখনোই মিথ্যা কথা বলে না। জলাবদ্ধতা হয়েছে এটা সত্য। তা নিরসনে চট্টগ্রামের মেয়র ডা. শাহাদত হোসেন এবং দেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আন্তরিক বলে আমার মনে হয়েছে। চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিয়ে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী হাস্যকর একটি মন্তব্য করেছেন। জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ার পরদিন মন্ত্রী নিজে এসে সড়কে পানি দেখেছেন। সমস্যাকে উপেক্ষা করলে সমাধান আসবে না। বরং গুরুত্ব দিয়ে সমাধানের চেষ্টা করতে হবে।

বিশেষজ্ঞের মত
চট্টগ্রাম ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটের সাবেক চেয়ারম্যান ও পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামের অন্যতম নেতা প্রকৌশলী দেলোয়ার হোসেন মজুমদার বলেন, সিটি গভর্নমেন্ট বাস্তবায়ন ছাড়া চট্টগ্রাম শহরের সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়। কারণ এখানে একেকটি সংস্থা একেকভাবে কাজ করে। একেক সংস্থার মন্ত্রণালয় আলাদা। তাই কেউ কাউকে সহযোগিতা করতে চাইলেও পারে না।

তিনি বলেন, চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা সমস্যা বহুদিনের। সম্প্রতি বিপুল অর্থ ব্যয় করে একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়নের পরও সমাধান আসেনি। কারণ, সমস্যাটিকে সমন্বিতভাবে না দেখে ভিন্ন ভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে খণ্ডিতভাবে সমাধানের চেষ্টা করা হয়েছে। বর্তমানে সিডিএ, সিটি করপোরেশন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড- এই তিন সংস্থার অধীনে চারটি বড় প্রকল্পের কাজ শেষ পর্যায়ে। এগুলো একক পরিকল্পনার অংশ না হয়ে আলাদা কাঠামোয় বাস্তবায়িত হচ্ছে। ফলে একটি প্রকল্পের কাজ অন্যটির সঙ্গে পুরোপুরি সংযুক্ত নয়।

প্রকৌশলী দেলোয়ার জানান, জলাবদ্ধতার জন্য খাল, নালা, জলাধার, নদী, জোয়ার-ভাটা- সবকিছু একসঙ্গে কাজ করে। সেখানে যদি এক সংস্থা খাল খনন করে, আরেক সংস্থা ড্রেন তৈরি করে, কিন্তু তাদের মধ্যে যদি কার্যকর সমন্বয় না থাকে তাহলে পানি নিষ্কাশনের ধারাবাহিকতা ভেঙে যায়। বর্তমানে তাই ঘটছে।

জলাবদ্ধতা নিরসনের মেগা প্রকল্পের গোড়ায় কিছু গলদ ছিল। নগরের চিহ্নিত ৭৪টি খালের মধ্যে মাত্র ৩৬টি খাল একটি প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এ কারণে পানি চলাচলের স্বাভাবিক পথ কোথাও না কোথাও আটকে যাচ্ছে। একইভাবে ১৯৯৫ সালের ড্রেনেজ মহাপরিকল্পনায় প্রস্তাবিত রিটেনশন পন্ড বা জলাধারগুলো বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না। অতিরিক্ত পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা না থাকলে পানি উপচে পড়বে। কারণ, একদিকে খাল খনন করা হচ্ছে, অন্যদিকে জলাধার ও নিচু জমি ভরাট করা হচ্ছে।

এবার দেখা গেছে, খালের সংস্কারকাজের জন্য অস্থায়ী বাঁধ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সময়মতো অপসারণ না করায় জলাবদ্ধতা হয়েছে। এর সঙ্গে রয়েছে বর্জ্যব্যবস্থাপনার দুর্বলতা। সবচেয়ে বড় ঘাটতি রয়েছে খাল রক্ষণাবেক্ষণে।

মনোয়ারুল হক/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
ব্রেকিং নিউজ