ফ্লোটিলায় আটক ত্রাণকর্মীদের ওপর ইসরায়েলি বাহিনীর যৌন নিপীড়ন ও নির্যাতন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, এবিসিনিউজবিডি, (২৩ মে) : আন্তর্জাতিক জলসীমা থেকে গাজাগামী ত্রাণবাহী ফ্লোটিলার কর্মীদের আটক করার পর তাদের ওপর অমানবিক নির্যাতন ও যৌন সহিংসতার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগীদের মধ্যে অন্তত ১৫ জন ত্রাণকর্মী ইসরায়েলি ডিটেনশন সেন্টারে ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন বলে দাবি করেছেন ফ্লোটিলার আয়োজকরা। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে।

টেলিগ্রামে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে আয়োজক সংস্থা ‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’ জানিয়েছে, আটককৃত কয়েকজন ত্রাণকর্মী মারাত্মকভাবে জখম হওয়ায় তাদের হাসপাতালে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। এর আগে, ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ আটক হওয়া শতাধিক বিদেশী কর্মীকে দেশ থেকে বহিষ্কার করে।

এই ঘটনার পর আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। জার্মানি সরকার জানিয়েছে, ফ্লোটিলায় অংশ নেওয়া তাদের বেশ কয়েকজন নাগরিক আহত হয়েছেন এবং উদ্ভূত অভিযোগগুলো ‘অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুতর’। অন্যদিকে, ইতালির একটি আইনি সূত্র জানিয়েছে—সেখানকার আইনজীবীরা অপহরণ এবং যৌন সহিংসতাসহ সংশ্লিষ্ট অপরাধগুলোর বিষয়ে একটি সম্ভাব্য তদন্ত শুরু করেছেন।

এদিকে, জাতিসংঘের পক্ষ থেকেও এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানানো হয়েছে। এক নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে জাতিসংঘের মুখপাত্র স্টেফানি দুজারিক উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি মন্তব্য করেন, উদ্ধার হওয়া কর্মীদের জবানবন্দি এবং একজন ইসরায়েলি মন্ত্রীর শেয়ার করা ভিডিও ফুটেজ প্রমাণ করে যে, সেখানে আটক ব্যক্তিদের সাথে চরম অবমাননাকর ও অমানবিক আচরণ করা হয়েছে।

ইসরায়েলি বাহিনী গত ১৯ মে আন্তর্জাতিক জলসীমায় ৫০টি জাহাজে থাকা প্রায় ৪৩০ জনকে আটক করে। তারা গাজায় ত্রাণ পৌঁছে দিতে যাচ্ছিলেন।

এর পরদিন ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গাভির একটি ভিডিও প্রকাশ করেন, যেখানে দেখা যায় বিদেশী কর্মীদের কাঁটাতার ও শিপিং কনটেইনার দিয়ে তৈরি অস্থায়ী বন্দিশিবিরে হাঁটু গেড়ে বসিয়ে রাখা হয়েছে। তাদের হাত প্লাস্টিকের বন্ধনী দিয়ে বাঁধা ছিল এবং নেপথ্যে বাজছিল ইসরায়েলের জাতীয় সংগীত।

ভিডিওটি প্রকাশের পর আটক ব্যক্তিদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে ইসরায়েলি সরকারের ওপর চাপ বাড়ে।

দুজারিক বলেন, এখনো আটক থাকা ব্যক্তিদের ‘মুক্ত করে নিজ দেশে পাঠানো উচিত’ এবং ‘যারা এ ধরনের আচরণের জন্য দায়ী, তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন।’

গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা জানিয়েছে, তারা অন্তত ১৫টি যৌন নির্যাতনের ঘটনা নথিভুক্ত করেছে। সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনাগুলো ঘটেছে অস্থায়ী কারাগারে রূপান্তর করা একটি জাহাজে।

তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, আটক ব্যক্তিদের কনটেইনারে নিক্ষেপ করে মাথা ও পাঁজরে আঘাত করা হয়।

‘অপমানজনক নগ্ন তল্লাশি, যৌন হয়রানি, যৌনাঙ্গে হাত দেয়া ও টানা-হেঁচড়া, এবং একাধিক ধর্ষণের’ শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

সংগঠনটি আরো দাবি করে, ‘শুধু ওই জাহাজেই অন্তত ১২টি যৌন হামলার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যার মধ্যে পায়ুপথে ধর্ষণ এবং বন্দুক ঢুকিয়ে জোরপূর্বক যৌন নির্যাতনের ঘটনাও রয়েছে।’

টেলিগ্রামে আরেক পোস্টে তারা জানায়, ‘কাছ থেকে রাবার বুলেট ছোড়া হয়েছে। অনেক মানুষের হাড় ভেঙে গেছে।’

‘আমাদের অংশগ্রহণকারীদের দুর্ভোগের দিকে এখন বিশ্বের দৃষ্টি থাকলেও এটা শুধু সেই নিষ্ঠুরতার একটি ক্ষুদ্র ঝলক, যা ইসরায়েল প্রতিদিন ফিলিস্তিনি বন্দিদের ওপর চালায়।’

ফ্লোটিলায় আটক ইতালীয় অর্থনীতিবিদ লুকা পোগি রোমে পৌঁছে রয়টার্সকে বলেন, ‘আমাদের কাপড় খুলে ফেলা হয়, মাটিতে ছুড়ে মারা হয়, লাথি মারা হয়। অনেককে টেজার দিয়ে বৈদ্যুতিক শক দেয়া হয়েছে, কেউ কেউ যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন এবং অনেককে আইনজীবীর সঙ্গে দেখা করতে দেয়া হয়নি।’

ইতালীয় কর্মী ইলারিয়া মানকোসু বলেন, ফ্লোটিলার সদস্যদের দুটি তথাকথিত ‘কারাগার জাহাজে’ নেয়া হয়েছিল। এর মধ্যে একটিতে থাকা ব্যক্তিরা বেশি সহিংসতার শিকার হন।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, তাদের কনটেইনারে আটকে পাঁচ সেনাসদস্য মারধর করে; এতে কারো পাঁজর ও হাত ভেঙে যায়। বৈদ্যুতিক শক দেয়ার যন্ত্র টেজার ব্যবহারের কারণে কারো কারো চোখ ও কানে গুরুতর আঘাত লাগে।

মানকোসু বলেন, দুই দিন ধরে তাদের ওই জাহাজে রাখা হয়, যেখানে চলমান পানি ছিল না। কম্বল না থাকায় তারা রাতে কার্ডবোর্ড ও প্লাস্টিক দিয়ে শরীর ঢেকে রাখতেন। অধিকাংশ পোশাকও কেড়ে নেয়া হয়েছিল।

তিনি আরো বলেন, স্থলে আনার পর তাদের কয়েক ঘণ্টা হাঁটু গেড়ে বসিয়ে রাখা হয় এবং নড়াচড়া বা কথা বললে লাথি ও ধাক্কা দেয়া হতো। পরে তাদের এমন কারাগারে নেয়া হয়, যেখানে ঘুমাতে না দেয়ার জন্য বারবার কক্ষ পরিবর্তন করা হতো।

ইতালির প্রসিকিউটররা অপহরণ, নির্যাতন ও যৌন সহিংসতার সম্ভাব্য অভিযোগ তদন্ত করছেন এবং আগামী কয়েক দিনে ইতালিতে ফিরে আসা কর্মীদের সাক্ষ্য নেবেন বলে আইনি সূত্র জানিয়েছে।

জার্মান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র জানান, তুরস্কের ইস্তাম্বুলে পৌঁছানো জার্মান কর্মীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা কনস্যুলার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কয়েকজন আহত হয়েছেন এবং তাদের চিকিৎসা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে।

তিনি বলেন, জার্মান নাগরিকদের মানবিক আচরণ নিশ্চিত করা ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ’ এবং ‘যেসব গুরুতর অভিযোগ উঠেছে, সেগুলোর পূর্ণ ব্যাখ্যা চাওয়া হচ্ছে।’

ফরাসি নাগরিকদের ফেরাতে সহায়তাকারী কর্মী সাবরিয়া কারিক রয়টার্সকে জানান, ৩৭ জন ফরাসি নাগরিকের মধ্যে পাঁচজনকে তুরস্কে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে। কারো পাঁজর ভেঙেছে, কারো মেরুদণ্ডে চিড় ধরেছে। কয়েকজন ধর্ষণসহ যৌন সহিংসতার বিস্তারিত অভিযোগও করেছেন।

স্পেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসে ম্যানুয়েল আলবারেস জানান, ৪৪ জন স্প্যানিশ সদস্য শুক্রবার ইস্তাম্বুল থেকে মাদ্রিদ ও বার্সেলোনাগামী ফ্লাইটে ফিরবেন। তাদের মধ্যে চারজন আঘাতের চিকিৎসা নিয়েছেন।

ইসরায়েলের কারা কর্তৃপক্ষ এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ইসরায়েলি কারা বিভাগের এক মুখপাত্র বিবৃতিতে বলেন, ‘উত্থাপিত অভিযোগগুলো মিথ্যা এবং সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।’

তিনি দাবি করেন, ‘সব বন্দি ও আটক ব্যক্তিকে আইন অনুযায়ী রাখা হয় এবং তাদের মৌলিক অধিকার রক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।’

ইসরায়েল-লেবানন যুদ্ধের সময় ২০০৬ সালে ফ্লোটিলা আন্দোলনের সূচনা হয়। ২০০৭ সালে গাজার ওপর অবরোধ আরোপের পর এটি আরো বিস্তৃত হয়।

এরপর থেকে আন্তর্জাতিক সংহতি গোষ্ঠীগুলোর সংগঠিত শত শত জাহাজ মানবিক সহায়তা ও কর্মী নিয়ে গাজায় পৌঁছানোর চেষ্টা করেছে।

২০০৮ সালে ফ্রি গাজা মুভমেন্টের দুটি নৌযান অবরোধ সত্ত্বেও প্রথমবার সমুদ্রপথে গাজায় পৌঁছাতে সক্ষম হয়।

২০১০ সালে ইসরায়েলি কমান্ডোরা তুর্কি জাহাজ মাভি মারমারায় অভিযান চালায়; এতে ১০ জন কর্মী নিহত ও কয়েক ডজন আহত হন।

এরপর থেকে আন্তর্জাতিক জলসীমায় প্রায় সব ফ্লোটিলাই ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে আটক হয়েছে।

নৌ-অভিযানের পর ইসরায়েলে নিয়ে যাওয়া কর্মীদের কাছ থেকে নির্যাতনের অভিযোগ প্রায়ই এসেছে। আয়োজকদের দাবি, হামাস-সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ও নিষেধাজ্ঞাকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে আরো কঠোর দমন-পীড়ন চালানো হচ্ছে।

মনোয়ারুল হক/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
ব্রেকিং নিউজ