বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তির কারণে বছরে ১৩২৭ কোটি টাকার রাজস্ব হারাবে সরকার
নিজস্ব প্রতিবেদক (ঢাকা), এবিসিনিউজবিডি, (১১ মার্চ) : বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেড চুক্তির কারণে বছরে সরকার শুল্ক বাবদ প্রায় ১ হাজার ৩২৭ কোটি টাকার রাজস্ব হারাবে বলে জানিয়েছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। শুধু তাই নয়, ওই চুক্তির কারণে ডব্লিউটিও এর আওতাভুক্ত অন্যান্য দেশকেও একই সুবিধা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়েছে, যা ভবিষ্যতের বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে বলে মনে করছে সংস্থাটি।
মঙ্গলবার (১০ মার্চ) রাজধানীর ধানমন্ডির কার্যালয়ে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত ‘২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট সুপারিশালা’ শীর্ষক রাউন্ড টেবিল বৈঠকে এ তথ্য উপস্থাপন করা হয়।
মূল প্রবদ্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের সম্প্রতি ট্রেড চুক্তি উল্লেখ করে ফাহমিদা খাতুন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তিতে (অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড) সই করেছে বাংলাদেশ।
চুক্তির আওতায় আমেরিকা থেকে সাড়ে ৪ হাজার পণ্য শুল্কমুক্ত সুবিধা দিতে হবে। আগামী ৫ থেকে ১০ বছরের মধ্যে আরও ২ হাজার ২১০ প্রকারের পণ্যে শুল্কমুক্তি সুবিধা দেবে। এ কারণে বছর সরকার আমদানি শুল্ক বাবদ প্রায় ১ হাজার ৩২৭ কোটি টাকার রাজস্ব হারাবে। ওই চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রকে এক তরফাভাবে শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা দেওয়া হয়েছে। যা ডব্লিউটিও এর নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এর ফলে ডব্লিউটিও এর আওতায় সদস্য অন্যান্য দেশকেও একই সুবিধা দিতে বাংলাদেশের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
তিনি বলেন, আর একটি বিষয় হচ্ছে ওই চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে নির্দিষ্ট পণ্য ক্রয়ের শর্ত। এ কারণে সরকারের ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অর্থ্যাৎ এই চুক্তি, রাজস্ব আয় ও সরকারি ব্যয়ের যে বিষয়টি রয়েছে, সরকারকে সেটা পুনর্মূল্যায়ন করা দরকার। প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে।
এক প্রশ্নের জবাবে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো প্রফেসর মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাণিজ্যকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা বেড়ে গেছে। এটা ডব্লিউটিওকে দুর্বল করেছে। চুক্তির বিষয়টি উন্মুক্ত করতে হবে। কারণ, এর ভেতর অনেক আর্থিক নেতিবাচক টুলস রয়েছে। চুক্তি বাস্তবায়নের বড় অংশ ব্যক্তি খাত। আর ব্যক্তি খাত ইউএসএ থেকে আনতে বাধ্য করার জন্য ভর্তুকি দিতে হবে সরকারকে। না হলে সে কেন ইউএসএ থেকে আমদানি করবে। এসব হিসাব-নিকাশ করতে হবে। আরও অনেক বিষয় রয়েছে, যেমন-তৃতীয় কোন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক কেমন হবে, কার কাছ থেকে কিনতে পারব, কার কাছ থেকে কিনতে পারব না, এগুলো সার্বভৌমত্বের প্রশ্নেও সাংঘর্ষিক। ইউএসএ সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনার পর আমাদের আলোচনার দ্বার উন্মোচন হয়েছে। আমাদের পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ রয়েছে।
সিপিডির গবেষকরা বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের মধ্যে তেল-গ্যাসের উৎপাদন ও সরবরাহ বিঘ্নিত হচ্ছে। তাতে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেল এক শ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। তবে দেশের জ্বালানি তেলের নিয়ন্ত্রণে সরকারের হাতে কিছু সুযোগ আছে।
সংস্থাটির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারের তেলের দাম স্থানীয় বাজারে কতটুকু প্রতিফলিত হবে, সে ব্যাপারে সরকারের কাছে বিভিন্ন নীতি উপাদান (পলিসি ইনস্ট্রুমেন্ট) রয়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) মুনাফার বাইরেও জ্বালানির ওপর দেশে প্রায় ২০-২৫ শতাংশ বিভিন্ন ধরনের কর রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে সরকার এই কর কমিয়ে দাম নিয়ন্ত্রণের সুযোগ পায়।
বর্তমানে দেশে ডিজেল, অকটেন ও অন্যান্য জ্বালানির কয়েক সপ্তাহের মজুত রয়েছে উল্লেখ করে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের বড় সমস্যা হলো, জ্বালানি তেলের কোনো স্থায়ী স্ট্র্যাটেজিক রিজার্ভ বা কৌশলগত মজুত নেই, যা কিনা পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে রয়েছে। এ ধরনের রিজার্ভ থাকলে সংকটের সময় বাজারে নিশ্চয়তা দেওয়া সম্ভব হয়। বর্তমানে প্যানিক বায়িং বা আতঙ্কে কেনাকাটার কারণে চাহিদার চেয়ে বেশি তেল সংগ্রহের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এটি বেড়ে গেলে তাৎক্ষণিকভাবে মেটানো যেকোনো দেশের জন্যই কঠিন। তাই বাজারকে আস্থায় আনা ও নিশ্চয়তা দেওয়া জরুরি।
সিপিডির এই সম্মাননীয় ফেলো বলেন, সরকার বর্তমানে জ্বালানি পরিস্থিতি সামাল দিতে স্পট বায়িং করছে। ভারতের সঙ্গে পাইপলাইনের মাধ্যমে ডিজেল আমদানির চুক্তিটি পুনরায় চালু করছে। এ ছাড়া প্রয়োজনে মালয়েশিয়াসহ অন্যান্য বিকল্প উৎস থেকেও জ্বালানি আনার ব্যবস্থা রয়েছে। এখানে মূল লক্ষ্য হলো, জ্বালানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা। আবার বাড়তি দামে জ্বালানি কিনতে রিজার্ভের ওপর যেন চাপ না পড়ে, সেদিকেও সরকারকে নজর রাখতে হবে। সে ক্ষেত্রে ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইডিবি) থেকে ঋণ নেওয়া যেতে পারে।
মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, জ্বালানি তেল কিনতে রিজার্ভের ওপর চাপ কমানো জরুরি। তার কারণ রিজার্ভের ওপর খাদ্যনিরাপত্তা ও সার আমদানির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নির্ভর করে। বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় একটি স্বল্পমেয়াদি সমন্বিত পরিকল্পনার পাশাপাশি মধ্য মেয়াদে জ্বালানি তেলের একটি স্ট্র্যাটেজিক রিজার্ভ গড়ে তোলা প্রয়োজন, যা বাজারকে নিশ্চয়তা দেবে। এমনকি ভবিষ্যতে প্যানিক বায়িং থেকে নিষ্কৃতি দেবে।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, বর্তমান সময়ে দেশের ভেতরে-বাইরে চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে সুনির্দিষ্ট ও কৌশলগত নীতিগত পদক্ষেপ গ্রহণ করাটা অত্যন্ত প্রয়োজন। নীতিনির্ধারকদের জন্য প্রধান অগ্রাধিকার এখন হওয়া উচিত, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করা। এর জন্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্বব্যবস্থায় শৃঙ্খলা, বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ লাগবে।
ফাহমিদা খাতুন আরও বলেন, আগামী অর্থবছরের বাজেটটি নবনির্বাচিত বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেট। এটা সরকারের জন্য একটা গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ, যার মাধ্যমে তারা তাদের নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়নের সূচনা করতে পারে এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনা ও সরকারি ব্যয়ের দক্ষতার ক্ষেত্রে কার্যকর একটা নেতৃত্ব প্রদর্শন করতে পারে। তিনি আরও বলেন, বর্তমান অস্থিরতা মোকাবিলা করার জন্য অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জনের পাশাপাশি অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তিটা শক্তিশালী করার জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে হবে।
রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বড় চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা বলেন, বাজেটে মূল বিষয় হচ্ছে রাজস্ব আদায়। রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি উল্লেখযোগ্য হারে। চলতি অর্থবছরের জানুয়ারি পর্যন্ত রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি ১২.৯ শতাংশ, যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৪.৫ শতাংশ হারে। বাকি সময়ে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে ৫৯.৪ হারে রাজস্ব আদায় করতে হবে। যা অসম্ভব। কারণ এখন পর্যন্ত রাজস্ব ঘাটতি ৬০ হাজার কোটি টাকা দাঁড়িয়েছে। বাকি সময়ে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ চ্যালেঞ্জিং বিষয়। রাজস্ব আদায় যেহেতু কম, সে কারণে ব্যাংকের ওপর নির্ভশীলতা অনেক বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকার ব্যাংকিং সেক্টর থেকে ৫৯ হাজার ৬৫৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। বিপরীতে ব্যাংক বহির্ভূত ঋণ ও বৈদেশিক সাহায্য উল্লেখযোগ্য হারে কমে গিয়েছে। ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ আর্থিক খাতে ঝুঁকি সৃষ্টি করেছে, অন্যদিকে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবাহ কমে গেছে। এই সময়ে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ শতাংশের ওপরে। চলমান মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে জ্বালানিসংকট যদি চলতে থাকে তাহলে মূল্যস্ফীতির অতিরিক্ত চাপ তৈরি হবে। কারণ আমাদের জ্বালানি বড় অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। অন্যদিকে বার্ষিক উন্নয়নেও ধীরগতি। জানুয়ারি পর্যন্ত এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল মাত্র ২০.৩ শতাংশ। যা বিগত ১৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম। চলতি অর্থবছরে রপ্তানি আয় ৩.২ হারে কমেছে। বিপরীতে জানুয়ারি পর্যন্ত আমদানি বেড়েছে ৩.৯ শতাংশ হারে।
তিনি বলেন, আগামী অর্থবছরের বাজেট দেওয়ার সময় উচ্চাভিলাষী প্রবণতা থেকে সরে আসতে হবে। কারণ চলতি অর্থবছরে অনেক বেশি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেও তা অর্জনের কাছাকাছি যেতে পারিনি। যেমন রাজস্ব আদায় একটা উদাহরণ হতে পারে। লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় আদায় অনেক কম। বর্তমান সরকারের কর ডিজিপি অনুপাতের নির্বাচনি ইশতেহারের লক্ষ্যমাত্রা ১৫ শতাংশ রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে চলতি অর্থবছরের কর জিডিপি অনুপাত ৬.৮ শতাংশ। তাই ওই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হলে দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর রাজস্ব ব্যবস্থাপনা ও সংস্কার প্রয়োজন। অপ্রয়োজনীয় সরকারি ব্যয় কমাতে হবে। বিনিয়োগ কমেছে, যার সঙ্গে কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে গেছে।
মনোয়ারুল হক/
