আ.লীগকে বাদ দিয়ে নির্বাচন হলে তা অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে না: সিপিডি

নিজস্ব প্রতিবেদক (ঢাকা), এবিসিনিউজবিডি, (৮ ফেব্রুয়ারি) : ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচন থেকে আওয়ামী লীগকে বাদ দেওয়া হলে ওই নির্বাচন অন্তর্ভুক্তিমূলক ও গ্রহণযোগ্য হবে না- এমন মন্তব্য করেছে গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।

শনিবার (৭ জানুয়ারি) ঢাকায় এক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে সিপিডি জানায়, কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের বিপুলসংখ্যক সমর্থক ও ভোটার চূড়ান্ত নির্বাচনি ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। তাদের মতামত ও অংশগ্রহণ উপেক্ষা করা হলে নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।

‘সবুজ টেকসই অর্থনীতির চালচিত্র ও প্রত্যাশা: প্রার্থী ও ভোটার জরিপের ফলাফল’ শীর্ষক এই ব্রিফিংয়ে বিভিন্ন নির্বাচনি এলাকায় পরিচালিত জরিপের তথ্য উপস্থাপন করা হয়। সিপিডির মতে, দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় কোনো বড় রাজনৈতিক শক্তি ও তাদের ভোটারদের বাইরে রেখে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করা কঠিন।

মিডিয়া ব্রিফিংয়ে জরিপের তথ্য উপস্থাপন করেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী হেলেন মাশিয়াত, অনুষ্ঠান সহযোগী সামি মোহাম্মদ, মালিহা সাবাহ ও নূর ইয়ানা জান্নাত।

সিপিডি জানায়, একটি বিশ্বাসযোগ্য, অংশগ্রহণমূলক ও গণতান্ত্রিক নির্বাচন নিশ্চিত করতে হলে সব প্রধান রাজনৈতিক পক্ষ এবং তাদের সমর্থক ভোটারদের অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। তা না হলে নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে দেশে ও বিদেশে প্রশ্ন ওঠার আশঙ্কা থাকবে।

গবেষণা সংস্থাটির মতে, নির্বাচন কেবল একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়। এটি জনগণের প্রতিনিধিত্ব ও মতামতের প্রতিফলন। সে কারণে রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করাই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতার প্রধান শর্ত।

সিপিডির সাম্প্রতিক জরিপে আরও উঠে এসেছে, দেশের প্রায় চার ভাগের তিন ভাগ বা ৭৭ শতাংশ ভোটার মনে করেন, রাস্তা, কালভার্ট নির্মাণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলেই উন্নয়ন নিশ্চিত হয়। অর্থাৎ উন্নয়ন সম্পর্কে ভোটারদের ধারণা এখনো অবকাঠামোকেন্দ্রিক। জাতীয় নির্বাচনে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রেও এই ধারণা তাদের প্রভাবিত করছে।

গবেষণায় দেখা যায়, শহরাঞ্চলের প্রায় ৮৬ শতাংশ ভোটার উন্নয়নের সঙ্গে ব্রিজ ও সড়ক নির্মাণকে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করে দেখেন। পার্বত্য চট্টগ্রাম, উপকূলীয় অঞ্চল, জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ ও প্রান্তিক এলাকাগুলোতেও এই ধারণা প্রবল।

ভোটারদের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের মধ্যেও উন্নয়ন নিয়ে প্রায় একই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি দেখা গেছে। কিছু ক্ষেত্রে দলীয় প্রতিনিধিদের ধারণা তুলনামূলকভাবে বিস্তৃত হলেও ভোটারদের ভাবনা এখনো মূলত অবকাঠামোকেন্দ্রিক রয়ে গেছে।

সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী হেলেন মাশিয়াত বলেন, ‘বাংলাদেশে সবুজ সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব—৯৫ শতাংশ ভোটার এমন আশাবাদী ধারণা পোষণ করেন।’ তিনি আরও বলেন, উন্নয়ন ধারণার এই একমুখী প্রবণতা দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই উন্নয়ন, পরিবেশ সুরক্ষা ও জলবায়ু অভিযোজনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে আড়ালে ফেলে দিতে পারে। তার মতে, উন্নয়ন আলোচনায় কর্মসংস্থান ও অবকাঠামোর পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও জীবনমানের বিষয়গুলোকে আরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

এই জরিপে ১৫০টি নির্বাচনি এলাকার ৪৫০ জন নির্বাচন প্রার্থী, তাদের মনোনীত প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার ১ হাজার ২০০ ভোটারের মতামত নেওয়া হয়েছে। পরিবেশ, সবুজ অর্থনীতি ও সামাজিক উন্নয়ন—এই তিন স্তম্ভে ভোটার ও প্রার্থীদের দৃষ্টিভঙ্গি, প্রত্যাশা ও বাস্তব পরিকল্পনা বিশ্লেষণ করা হয়।

জরিপে উঠে এসেছে, পরিবেশ রক্ষার উপায় হিসেবে প্রায় ৬১ শতাংশ ভোটার গাছ লাগানো ও প্লাস্টিক ব্যবহার কমানোর ওপর জোর দিয়েছেন। রাজনৈতিক প্রার্থীরাও প্রায় একই ধরনের সমাধানের কথা বলেছেন। গবেষকদের মতে, ভোটারদের মধ্যে একটি আচরণগত প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। তারা যেটি ব্যক্তিগতভাবে সহজে করতে পারেন, সেটিকেই পরিবেশ রক্ষার প্রধান সমাধান হিসেবে দেখছেন।

জরিপে দেখা গেছে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্পর্কে জানেন—এমন ভোটারের হার ৪৭ শতাংশ। প্রার্থীদের ক্ষেত্রে এই হার প্রায় ৪২ শতাংশ। তবে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে পরিবেশ সুরক্ষা ও টেকসই উন্নয়নের কেন্দ্রীয় উপাদান হিসেবে দেখার ক্ষেত্রে এখনো ঘাটতি রয়েছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

গবেষণায় আরও দেখা যায়, পরিবেশ ও অর্থনীতির তুলনায় সামাজিক স্তম্ভকে সবচেয়ে কম গুরুত্ব দিচ্ছেন ভোটার ও প্রার্থীরা। ভোটারদের কাছে দারিদ্র্য, আয় ও কর্মসংস্থানের চাপ এতটাই প্রবল যে সামাজিক বিষয়গুলো তাদের কাছে গৌণ হয়ে উঠছে।

সামাজিক উন্নয়নের প্রশ্নে ভোটারদের অগ্রাধিকার সীমিত দুটি বিষয়ে। সেগুলো হলো স্বাস্থ্য ও শিক্ষা। সিপিডির মতে, এই বাস্তবতা দেখায় দেশের বড় একটি অংশ এখনো মৌলিক চাহিদা পূরণের সংগ্রামে রয়েছে।

মনোয়ারুল হক/  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
ব্রেকিং নিউজ