গাজীপুর-ঢাকা বিআরটি প্রকল্প বাতিল, হবে ছয় লেনের সড়ক

নিজস্ব প্রতিবেদক, এবিসিনিউজবিডি, ঢাকা (২০ অক্টোবর): প্রায় ১৩ বছর ধরে চলমান বহুল আলোচিত ঢাকা-গাজীপুর বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্প আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এর পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো অপসারণ করে রুটটিকে ছয় লেনের একটি সাধারণ মহাসড়কে রূপান্তর করা হবে। একই সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা ঢাকা বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট পিএলসি বিলুপ্ত করে এর পুরো কার্যক্রম সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) অধীনে ন্যস্ত করা হবে।

গত ১৮ অক্টোবর অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে এই মেগা প্রকল্পের ভবিষ্যৎ রূপরেখা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই সিদ্ধান্তগুলো গৃহীত হয়। এর ঠিক পরের দিন, অর্থাৎ ১৯ অক্টোবর সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ থেকে সংশিষ্ট সকল দপ্তরকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ দিয়ে চিঠি পাঠানো হয়।

সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের বিআরটি উইংয়ের উপসচিব তাসলিমা আহমেদ পলি স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে বলা হয়, বর্তমান বিআরটি করিডরের নির্দিষ্ট বাস স্টেশন ও লেন বিভাজক বা ডিভাইডারগুলো পুরোপুরি সরিয়ে ফেলতে হবে। এরপর সড়কের দুই পাশে তিনটি করে মোট ছয় লেনের একটি আধুনিক সাধারণ মহাসড়ক নির্মাণ করা সমীচীন হবে। তাছাড়া, প্রকল্পের আওতায় নির্মিত অপর্যাপ্ত দুটি দুই লেনের ওভারপাসকে চার লেনে উন্নীত করার সুনির্দিষ্ট কার্যক্রমও হাতে নেওয়া যেতে পারে।

চিঠিতে আরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, এই প্রকল্পে অর্থায়নকারী উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে যথাযথ আলোচনার মাধ্যমে সব ধরনের আইনি জটিলতা কাটিয়ে প্রকল্পটি আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি ঢাকা বিআরটি পিএলসি কোম্পানি বন্ধ ঘোষণা করে এর সমস্ত কর্মকাণ্ড সওজের আওতায় স্থানান্তর করতে হবে।

মন্ত্রিসভার এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে ত্বরিত গতিতে পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে। বিশেষ করে, আগামী ১৫ দিনের মধ্যে কাজের প্রাথমিক অগ্রগতি প্রতিবেদন পাঠাতে হবে। তাছাড়া, পুরো সিদ্ধান্ত পুরোপুরি বাস্তবায়িত না হওয়া পর্যন্ত প্রতি মাসের ৩ তারিখের মধ্যে নিয়মিত অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা দিতে হবে।

উল্লেখ্য, গত ১৮ অক্টোবর মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি বৈঠকের বিভিন্ন খুঁটিনাটি সিদ্ধান্ত গণমাধ্যমের সামনে তুলে ধরলেও এই বিআরটি প্রকল্প বাতিলের বিষয়টি সেদিন সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়নি।

এক যুগেরও বেশি সময় ধরে চলা প্রকল্প, যেখানে ব্যয় ছাড়িয়েছে দ্বিগুণের বেশি

গাজীপুরের শিববাড়ি থেকে শুরু করে রাজধানী ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত প্রায় ২০ দশমিক ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই বিআরটি রুটটি মূলত দুই শহরের মাঝে দ্রুতগতির বাস চলাচল নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে পরিকল্পনা করা হয়েছিল। ২০১২ সালের নভেম্বর মাসে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় এই প্রকল্পটি প্রথম অনুমোদন লাভ করে। সে সময় এর প্রাথমিক প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছিল ২ হাজার ৩৯ কোটি ৮৪ লাখ টাকা এবং ২০১৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে এর কাজ সমাপ্ত করে বিআরটি চালুর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে নানান জটিলতায় নির্ধারিত সেই সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি।

এই প্রকল্পের আওতায় সুনির্দিষ্ট বিআরটি লেন, বিশেষায়িত স্টেশন, একাধিক উড়ালসড়ক, নতুন টঙ্গী সেতু এবং বাস ডিপোর মতো বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবিসহ) বেশ কিছু উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার আর্থিক সহায়তায় প্রকল্পের কাজ এগিয়ে চলে। তবে দীর্ঘমেয়াদী ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতা, বারবার নকশায় পরিবর্তন আনা এবং বিভিন্ন সেবা প্রদানকারী সংস্থার লাইন স্থানান্তরের মতো নানা জটিলতায় কাজের গতি দারুণভাবে ব্যাহত হয়। পরবর্তীতে দীর্ঘ অপেক্ষার পর ২০১৮ সালের দিকে মাঠপর্যায়ে বড় আকারে নির্মাণকাজ শুরু হয়।

কাজের এই দীর্ঘসূত্রতার কারণে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে প্রকল্পের আর্থিক ব্যয়ও। একপর্যায়ে তা বেড়ে পৌঁছায় ৪ হাজার ২৬৮ কোটি ৩২ লাখ টাকায়, যা মূলত প্রাথমিক হিসাবের দ্বিগুণেরও বেশি। পরবর্তীতে ২০২৫ সালে এসে প্রকল্পের ব্যয় আরও বাড়িয়ে প্রায় ৬ হাজার ৫৯৭ কোটি টাকায় উন্নীত করা এবং এর মেয়াদ ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দীর্ঘায়িত করার একটি নতুন প্রস্তাব তোলা হয়েছিল। কিন্তু ওই বছরের ২৭ জুলাই অনুষ্ঠিত একনেক সভায় সেই প্রস্তাবটি শেষ পর্যন্ত অনুমোদন পায়নি।

দীর্ঘ নির্মাণকাজের সুবাদে গাজীপুর, টঙ্গী এবং বিমানবন্দর সংলগ্ন এলাকার সড়কগুলোতে বছরের পর বছর ধরে তীব্র যানজট ও চরম জনভোগান্তি লেগেই ছিল। যেই আধুনিক ও দ্রুত গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ার স্বপ্ন নিয়ে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তার সুফল পুরোপুরি সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। অবশেষে প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা ও দীর্ঘ ভোগান্তির অবসান ঘটিয়ে বিআরটি অবকাঠামো সরিয়ে সাধারণ মহাসড়ক বানানোর এই বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নিল বর্তমান প্রশাসন।

এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো দ্রুততম সময়ে প্রকল্পের বর্তমান অবকাঠামো অপসারণ, ওভারপাস সম্প্রসারণ, আইনি জটিলতার অবসান এবং প্রকল্প বাতিল সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা। তবে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ শেষ হতে ঠিক কত সময় লাগবে, সে বিষয়ে মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তে সুনির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়নি।

মনোয়ারুল হক/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
ব্রেকিং নিউজ