যুক্তরাষ্ট্রের মেজর নিদাল হাসানের মৃত্যুদণ্ড সরাসরি সম্প্রচার হবে
আন্তর্জাতিক ডেস্ক, এবিসিনিউজবিডি, (৯ অক্টোবর): যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ঘোষণা করেছেন যে, ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে মার্কিন সেনাবাহিনীর সাবেক মেজর নিদাল হাসানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দৃশ্য সাধারণ মানুষ সরাসরি দেখতে পারবে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বিবিসিকে জানিয়েছেন, ২০০৯ সালে ফোর্ট হুডে নিরস্ত্র ১৩ মার্কিন সেনাকে গুলি করে হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত হাসানের মৃত্যুদণ্ড সরাসরি সম্প্রচার (লাইভস্ট্রিম) করার এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, বিগত প্রায় একশ বছরের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে এটিই হতে পারে প্রথম সর্বসমক্ষে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিদের অধিকার নিয়ে কাজ করা আইনজীবী জন মিলস মন্তব্য করেছেন যে, সরাসরি সম্প্রচারের এই উদ্যোগটি ‘আধুনিক যুগে সম্পূর্ণ নজিরবিহীন’ এবং এর ‘আইনি বৈধতা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে’।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ বলেন, ‘আমরা নিশ্চিত করতে চাই যেন সবাই এটি দেখতে পান এবং এটি সবার জন্য উন্মুক্ত থাকে। সবারই পরিষ্কারভাবে অনুধাবন করা উচিত যে এ ধরনের নৃশংসতার জন্য কঠোরতম পরিণতির মুখোমুখি হতে হয়।’
চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে পেন্টাগন ঘোষণা দেয় যে হাসানকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে। গত ৬০ বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে এটি হবে কোনো সামরিক মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রথম ঘটনা। রক্ষণশীল সংবাদমাধ্যম ‘রিয়েল আমেরিকাস ভয়েস’-এর সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে হেগসেথ জানান, হাসানের দণ্ড কার্যকরের জন্য ‘সেনাবাহিনীর একটি ফায়ারিং স্কোয়াড থাকবে, ঠিক যেমনটি হওয়া উচিত।’
হাসান কোনো শেষ ইচ্ছা জানিয়েছেন কি না কিংবা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন কি না—এমন প্রশ্নে হেগসেথ স্পষ্ট করে বলেন, ‘এতে কোনো কিছু আসে যায় না। আগামী ৩ ডিসেম্বর আমরা তার পরিণতির মুখোমুখি হচ্ছি।’ পেন্টাগনের এক মুখপাত্র নিশ্চিত করেছেন যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রতিরক্ষামন্ত্রীর এই সুপারিশ অনুমোদন করেছেন। তবে এই সরাসরি সম্প্রচার প্রক্রিয়াকে হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে সমর্থন করা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে বিবিসি হোয়াইট হাউসের কাছে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানতে চেয়েছে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর বিশ্বজুড়ে ১৭টি দেশে ২ হাজার ৭০০-এরও বেশি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হলেও মাত্র দুটি দেশে তা প্রকাশ্যে সম্পন্ন হয়েছিল। ২০২৫ সালে ইরানে ১১টি এবং আফগানিস্তানে ৬টি প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা ঘটেছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর সেক্রেটারি গত মঙ্গলবার জানিয়েছেন, টেক্সাসের ফোর্ট হুডে আগামী ৩ ডিসেম্বর এই মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দিন ধার্য করা হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সমাপ্তির পর ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে এটিই হতে চলেছে প্রথম কোনো সামরিক মৃত্যুদণ্ড। ভার্জিনিয়ার বাসিন্দা ও সেনাবাহিনীর মনোরোগ বিশেষজ্ঞ হাসান ২০০৯ সালে ফোর্ট হুডের একটি জনাকীর্ণ মেডিকেল সেন্টারে ১৩ জন নিরস্ত্র সেনাকে গুলি করে হত্যার কথা আদালতে স্বীকার করেছিলেন।
সে সময় ২০১৩ সালে নিজের কোর্ট মার্শালের সময় তিনি দাবি করেছিলেন যে তিনি আফগানিস্তানে মুসলিম ও তালেবানদের রক্ষার্থে ওই পদক্ষেপ নিয়েছিলেন এবং আদালতের কাছে তিনি ‘যেকোনো ভুলের’ জন্য ক্ষমাও চেয়েছিলেন।
মার্কিন সামরিক আইন অনুযায়ী, যেকোনো সামরিক মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের পাশাপাশি আইনি আপিল পর্যালোচনার বাধ্যবাধকতা থাকে। একটি উচ্চতর আদালত মামলাটি পুনর্বিবেচনা করে এবং তা এগিয়ে নেওয়ার আইনি বৈধতা যাচাই করে চূড়ান্ত রায় দেয়।
আইনজীবী মিলস জানান, হাসানের আইনি লড়াই বা আপিল প্রক্রিয়া এখনও সম্পূর্ণ শেষ হয়নি। তিনি কেন্দ্রীয় আদালতে নিজের দোষী সাব্যস্ত হওয়া ও সাজার বিরুদ্ধে পর্যালোচনার আবেদন করতে পারেন, যার ফলে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার প্রক্রিয়া শেষ পর্যন্ত স্থগিতও হতে পারে। তাই মিলস মনে করেন, এই মৃত্যুদণ্ড আদৌ নির্ধারিত দিনে কার্যকর হবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ট্রাম্প প্রশাসনের ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড এবং তা সরাসরি সম্প্রচার করার এই পরিকল্পনা মূলত কেবলই লোকানুকূল বা মনোযোগ আকর্ষণের একটি কৌশল মাত্র। এটি বাস্তবে ঘটার সম্ভাবনা বেশ কম এবং এর মাধ্যমে প্রকৃত ন্যায়বিচার নিশ্চিত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
ইয়েল ল স্কুলের ভিজিটিং লেকচারার ইউজিন আর ফিডেল এই পদক্ষেপকে ‘অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক’ হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, ‘মৃত্যুদণ্ড সরাসরি সম্প্রচার করার এই ভাবনা মধ্যযুগীয় বর্বরতার কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। সমাজ হিসেবে আমরা সেই অন্ধকার অধ্যায় বহু আগেই পেছনে ফেলে এসেছি বলেই আমাদের ধারণা ছিল।’ ফিডেলের মতে, হাসান যদি আইনি লড়াই অব্যাহত রাখেন, তবে সেই বিচারিক প্রক্রিয়া হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের বর্তমান কার্যকালের মেয়াদকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কিছু অঙ্গরাজ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময় নির্দিষ্ট কিছু মানুষের উপস্থিতির অনুমতি থাকলেও ফোর্ডহ্যাম ইউনিভার্সিটির আইনের অধ্যাপক ডেবোরা ডেনো নিশ্চিত করেছেন যে, এর আগে কখনোই কোনো মৃত্যুদণ্ডের দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচার করা হয়নি।
তিনি উল্লেখ করেন, এই ধরনের সরাসরি সম্প্রচার এমন এক মাত্রার স্বচ্ছতা তৈরি করবে যা অতীতে কখনোই দেখা যায়নি। দেশের অর্ধেকেরও বেশি নাগরিক মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখার পক্ষে মত দিলেও এর ব্যবহার এখন কমে এসেছে। এই যুক্তির ভিত্তিতে বলা যেতে পারে, জনগণ যদি সত্যিই মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখতে চায়, তবে তাদের সামনে পরিষ্কারভাবে দৃশ্যমান করা উচিত যে এই প্রক্রিয়াটি ঠিক কীভাবে সম্পন্ন হয়।
তবে ডেনো সতর্ক করে বলেন, এই লাইভস্ট্রিম প্রচারের ক্ষেত্রে বেশ কিছু আইনি ও প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ রয়েছে; যেমন এতে কোনো বয়সসীমা বা নির্দিষ্ট কনটেন্ট বিধিনিষেধ আরোপ করা হবে কি না এবং সংশ্লিষ্ট অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোর নিজস্ব নীতিমালা ও শর্তাবলীর সঙ্গে এটি সাংঘর্ষিক হবে কি না।
এখনও পর্যন্ত নিশ্চিত নয় যে এই সরাসরি সম্প্রচারটি ঠিক কোন মাধ্যমে বা প্ল্যাটফর্মে দেখানো হবে। কারণ বর্তমানের অধিকাংশ প্রধান সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মেই এমন সংবেদনশীল বা মৃত্যুর দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচারের কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, মেটার মালিকানাধীন ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুক ও থ্রেডস মৃত্যুদণ্ডের যেকোনো লাইভ স্ট্রিম নিষিদ্ধ করেছে। টিকটকেও একই ধরনের নিষেধাজ্ঞা বলবৎ রয়েছে।
ইলন মাস্কের মালিকানাধীন ‘এক্স’ (সাবেক টুইটার) প্ল্যাটফর্মটি কনটেন্ট মডারেশনের নীতিমালা কিছুটা শিথিল করলেও তারা জানিয়েছে, কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর দৃশ্যযুক্ত কনটেন্ট তখনই অপসারিত হবে যদি সংশ্লিষ্ট পরিবার বা কোনো অনুমোদিত প্রতিনিধির পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট অনুরোধ আসে। অন্যদিকে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নিজস্ব প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালে সরাসরি ভিডিও সম্প্রচারের কোনো সুবিধা নেই।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্যমতে, বিগত বছরগুলোতে সর্বাধিক মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের শীর্ষ দেশগুলোর তালিকায় রয়েছে চীন, ইরান, সৌদি আরব, ইয়েমেন ও যুক্তরাষ্ট্র। প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের শেষ বছর পর্যন্ত টানা ১৭ বছর যুক্তরাষ্ট্রে কোনো মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়নি। তবে ঠিক সেই শেষ বছরেই অত্যন্ত তড়িঘড়ি করে ১৩ জনের মৃত্যুদণ্ড সম্পন্ন করা হয়েছিল। পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর ট্রাম্প তাঁর পূর্বসূরি জো বাইডেনের দেওয়া মৃত্যুদণ্ড স্থগিতের নির্বাহী আদেশ বাতিল করে দেন।
যুক্তরাষ্ট্রে সর্বশেষ সামরিক মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল ১৯৬১ সালে। সে সময় ১১ বছরের এক অস্ট্রিয়ান কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর এক মার্কিন সেনাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোয়াইট ডি আইজেনহাওয়ার সেই দণ্ড অনুমোদন করেছিলেন। এমনকি ভুক্তভোগীর পরিবার পরবর্তী প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির কাছে অপরাধীর প্রাণভিক্ষা চেয়ে আবেদন করা সত্ত্বেও সেই রায় কার্যকর করা হয়েছিল।
এ ছাড়া ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে সর্বশেষ সামরিক মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছিল ১৯৪৫ সালের জানুয়ারি মাসে, যখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে এক পলাতক মার্কিন সেনাকে গুলি করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।
মনোয়ারুল হক/
