নিজস্ব এআই গড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ
আইটি ডেস্ক, এবিসিনিউজবিডি, ঢাকা (২ নভেম্বর): কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দুনিয়ায় প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে ব্যবসা, শিল্প ও অর্থনীতির চালচিত্র। যে জাতি যত দ্রুত নিজস্ব প্রযুক্তি উদ্ভাবনে সক্ষম হয়, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় তাদের এগিয়ে থাকার সুযোগ ততটাই সুদৃঢ় হয়। বর্তমানে বাংলাদেশেও এআই প্রযুক্তির ব্যবহার ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে। তবে প্রশ্ন উঠেছে, কেবল বিদেশি প্রযুক্তির ওপর ভর করে কি এই বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকা সম্ভব? বিশ্লেষক ও সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছেন, কেবল প্রযুক্তি ব্যবহারের গণ্ডিতে আটকে থাকলে চলবে না; বরং বাংলাদেশকে নিজস্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরি, মৌলিক গবেষণা, দক্ষ জনশক্তি এবং টেকসই প্রযুক্তিগত অবকাঠামো গড়ে তোলার পথে হাঁটতে হবে। পাশাপাশি, এই খাত ঘিরে নতুন শিল্পায়ন ও দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের এক অপার সম্ভাবনাও উন্মোচিত হচ্ছে।
তবে এই বিশাল সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার পথে প্রধান অন্তরায় হলো প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ঘাটতি। বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল বিদেশি প্রযুক্তির ব্যবহারের ওপর নির্ভর করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় দীর্ঘমেয়াদে এগিয়ে থাকা অবাস্তব। টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও প্রযুক্তিগত সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করতে হলে নিজস্ব এআই অবকাঠামো, বাংলা ভাষার লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (এলএলএম), ব্যাপক গবেষণা, দক্ষ মানবসম্পদ এবং দেশীয় উদ্ভাবনের কোনো বিকল্প নেই। এই লক্ষ্য সামনে রেখেই আগামী ১২ মাসের মধ্যে দেশের নিজস্ব সার্বভৌম এআই অবকাঠামো চালুর সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে এই খাতকে কেন্দ্র করে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ, প্রযুক্তি উদ্যোক্তা তৈরি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের অবস্থান দৃঢ় করার পথও উন্মুক্ত হচ্ছে।
এ বিষয়ে সরকারের ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ জানিয়েছেন, আগামী এক বছরের মধ্যেই দেশে সার্বভৌম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অবকাঠামো চালু করা হবে। ইতোমধ্যে এর জন্য প্রয়োজনীয় মেমোরি মডিউল ও কম্পিউটিং চিপ সংগ্রহের প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা হয়েছে। প্রস্তাবিত এই অবকাঠামোটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, স্টার্টআপ উদ্যোগ, বিশ্ববিদ্যালয় এবং শিক্ষার্থীদের জন্য উন্মুক্ত রাখা হবে। এর ফলে দেশের মেধাবী প্রযুক্তিবিদরা বাংলা ভাষার নিজস্ব এলএলএম নির্মাণসহ যুগোপযোগী নানা এআই সেবা উদ্ভাবনের সুযোগ পাবেন। বর্তমানে দেশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়লেও উন্নত মডেল তৈরি ও তা পরিচালনার জন্য হাই-পারফরম্যান্স জিপিইউ, পর্যাপ্ত কম্পিউটিং অবকাঠামো, বিশাল তথ্যভাণ্ডার এবং গবেষণার পর্যাপ্ত সুযোগ সীমিত রয়েছে। ফলে বাধ্য হয়েই বিদেশি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের তৈরি ক্লাউড সেবা ও মডেলের ওপর নির্ভর করতে হয়। নিজস্ব এই অবকাঠামো বাস্তবায়িত হলে এ ধরনের নির্ভরতা উল্লেখযোগ্য হারে কমার পাশাপাশি স্থানীয় উদ্যোক্তাদের নতুন পণ্য ও সেবা তৈরির পথ প্রশস্ত হবে।
উপদেষ্টার পরিকল্পনা অনুযায়ী, শুরুতে কোনো বিশাল আকৃতির এআই কেন্দ্র নির্মাণের পরিবর্তে তুলনামূলক ছোট ও মডিউলার প্রকৃতির অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে। পরবর্তীতে বেসরকারি খাতের চাহিদা বাড়লে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোও তাতে নিজেদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা যুক্ত করতে পারবে। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে উন্নতমানের জিপিইউ সংগ্রহের বিষয়েও বর্তমানে আলোচনা চলছে।
এদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সেমিকন্ডাক্টর খাতকে ঘিরে বিনিয়োগের এক নতুন দিগন্ত দেখতে পাচ্ছে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)। বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন (আশিক চৌধুরী) প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পায়ন, উচ্চমূল্য সংযোজন এবং উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন। বিশেষ করে সেমিকন্ডাক্টর খাতে বাংলাদেশের জন্য দারুণ বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, এই খাতে বিশাল অঙ্কের বিনিয়োগের সুযোগ থাকলেও তৈরি পোশাক খাতের মতো প্রথাগত ব্যাপক কর্মসংস্থান হয়তো তৈরি হবে না; তবে এর মাধ্যমে প্রযুক্তিগত দক্ষতা, উচ্চমূল্যের উৎপাদন এবং নতুন বাজার দখলের সুযোগ বহুগুণ বেড়ে যাবে। বিনিয়োগের এই পরিধি কেবল এআই সফটওয়্যার তৈরির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ক্লাউড কম্পিউটিং, ডেটা সেন্টার, চিপ ডিজাইন, সেমিকন্ডাক্টর, সাইবার নিরাপত্তা, সফটওয়্যার উন্নয়ন এবং এআইভিত্তিক বিভিন্ন শিল্পসেবা—সব ক্ষেত্রেই নতুন বিনিয়োগের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এই খাতগুলোতে বিদেশি বিনিয়োগ আকрыণের পাশাপাশি দেশীয় প্রতিষ্ঠান ও উদ্যোক্তাদের নিজস্ব সক্ষমতা বাড়িয়ে তোলাও সমভাবে জরুরি।
অন্যদিকে, সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড অর্থনৈতিক রিসার্চের (সিএসইআর) চেয়ারম্যান এবং ল্যাবএইড হাসপাতাল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাকিফ শামীমের মতে, বাংলাদেশকে এখন কেবল প্রযুক্তি ব্যবহারের পর্যায় থেকে বেরিয়ে নিজস্ব প্রযুক্তি উদ্ভাবনের সক্ষমতা অর্জনের দিকে দৃঢ় পায়ে এগিয়ে যেতে হবে। বিদেশি প্রতিষ্ঠানের তৈরি করা সফটওয়্যার, ক্লাউড সেবা কিংবা এআই মডেল ব্যবহার করে হয়তো সাময়িক সুবিধা পাওয়া সম্ভব, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে টেকসই অর্থনৈতিক মূল্য তৈরি করতে হলে নিজস্ব গবেষণা, দক্ষ জনবল, স্থানীয় উপাত্তের ভাণ্ডার, প্রযুক্তি উন্নয়নের অবকাঠামো এবং উদ্ভাবনী উদ্যোগ একান্ত প্রয়োজন।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, এ দেশের আবহাওয়া, কৃষি, জনঘনত্ব, ভাষা ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। ফলে বিদেশি প্রযুক্তির ওপর অন্ধভাবে নির্ভর করে দেশের সব মৌলিক সমস্যার কার্যকর সমাধান পাওয়া যাবে না। আকস্মিক বন্যার পূর্বাভাস তৈরি, কৃষকদের উপযোগী আবহাওয়াভিত্তিক পরামর্শ প্রদান, নগর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, পোশাকশিল্পের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং বাংলা ভাষায় শতভাগ নির্ভুল ডিজিটাল সেবা নিশ্চিত করতে হলে স্থানীয় তথ্য ও বাস্তব Ground Reality-র ওপর ভিত্তি করেই এআই গড়ে তুলতে হবে। তার মতে, মূল জোর দিতে হবে বাংলা ভাষাভিত্তিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নয়নে। কেবল প্রমিত বাংলা নয়, বরং আঞ্চলিক ভাষা এবং সামগ্রিক সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট অনুধাবনে সক্ষম প্রযুক্তি তৈরি করা সময়ের দাবি। এ জন্য মানসম্মত বাংলা ডিজিটাল ডেটাসেট তৈরি, ভাষা প্রক্রিয়াকরণ নিয়ে গবেষণা এবং নিজস্ব এআই মডেলের উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ অপরিহার্য।
সাকিফ শামীমের বিশ্লেষণে আরও উঠে এসেছে যে, শিল্প খাত, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে নিবিড় ও কার্যকর সহযোগিতা ছাড়া এই সক্ষমতা অর্জন করা সম্ভব নয়। প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণাকে শিল্পের বাস্তব সমস্যা সমাধানে কাজে লাগাতে যৌথ গবেষণা কার্যক্রম, প্রযুক্তি হস্তান্তর, গবেষণায় পর্যাপ্ত অর্থায়ন এবং মেধাস্বত্ব বা ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি রাইটস নিশ্চিত করা দরকার। একই সঙ্গে মেশিন লার্নিং, ডেটা সায়েন্স, এআই, রোবটিক্স এবং সাইবার নিরাপত্তাবিষয়ক শিক্ষা কার্যক্রমে প্রায়োগিক বা প্র্যাকটিক্যাল লার্নিংয়ের পরিধি বাড়াতে হবে। বর্তমান কর্মীবাহিনীকেও আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে মানিয়ে নিতে নিরন্তর পুনঃদক্ষতা অর্জনের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।
তার মতে, বাংলাদেশের আগামীর ডিজিটাল অগ্রযাত্রার মূল মন্ত্র হওয়া উচিত শুধু প্রযুক্তি ব্যবহার করা নয়, বরং প্রযুক্তি সৃষ্টি করার ক্ষমতা অর্জন করা। বৈশ্বিক প্রযুক্তির সাহায্য নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা থাকলেও দেশের দীর্ঘমেয়াদি সমৃদ্ধির ভিত্তি রচিত হবে নিজস্ব জ্ঞান, মৌলিক গবেষণা ও মননশীল উদ্ভাবনের ওপর। এআই খাতের বিনিয়োগের সম্ভাবনা কেবল প্রযুক্তি খাতের গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং কৃষি, ব্যাংকিং, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, পরিবহন, তৈরি পোশাক এবং সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহব্যবস্থাসহ সর্বত্রই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বহুমুখী ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। এই লক্ষ্যে ২০২৮ সাল থেকে নতুন অংশীদারত্বমূলক কার্যক্রম শুরুর পাশাপাশি যৌথ সহযোগিতামূলক পরিকল্পনা প্রণয়নের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হচ্ছে।
মনোয়ারুল হক/
