দেশব্যাপী জাটকা ধরায় ৮ মাসের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর
নিউজ ডেস্ক, এবিসিনিউজবিডি, ঢাকা (২ নভেম্বর): জাতীয় মাছ ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি, জলজ জীববৈচিত্র্যের টেকসই সংরক্ষণ এবং জাতীয় আমিষের চাহিদা পূরণের উদ্দেশ্যে আজ থেকে দেশব্যাপী আনুষ্ঠানিকভাবে জাটকা আহরণ, পরিবহন, মজুত, বাজারজাতকরণ এবং আড়ৎ কিংবা খুচরা বাজারে ক্রয়-বিক্রয়ে আট মাসের নিষেধাজ্ঞা শুরু হয়েছে।
রবিবার (১ নভেম্বর) থেকে দেশজুড়ে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয়েছে, যা আগামী ২০২৭ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বলবৎ থাকবে বলে জানিয়েছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই)-এর ইলিশ গবেষক ও বিজ্ঞানীদের দীর্ঘমেয়াদি মাঠপর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ৮ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত দেশব্যাপী সফলভাবে পরিচালিত ২২ দিনের ‘মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান-২০২৬’-এর ফলে নদীতীরে কোটি কোটি নতুন ইলিশের পোনা জন্ম নিয়েছে, যেগুলো বর্তমানে উপকূলীয় নদ-নদী ও মোহনায় অবাধে বিচরণ করছে।
বিজ্ঞানীদের জৈবিক পরীক্ষায় দেখা গেছে, নভেম্বর মাসের শুরুতে ৩ থেকে ৫ সেন্টিমিটার সাইজের এই পোনাগুলো প্রতি মাসে গড়ে ৩ থেকে ৩.৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। এই আট মাস সময়ে কোনো ধরনের বাধা ছাড়াই যদি সেগুলোকে প্রাকৃতিকভাবে নিরাপদে বেড়ে ওঠার সুযোগ দেওয়া হয়, তবে আগামী মে-জুন মাসের মধ্যে এগুলো ২৫ থেকে ৩০ সেন্টিমিটার দৈর্ঘ্য ও ৪০০ গ্রাম ওজনের পূর্ণাঙ্গ এবং বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক ‘ইলিশে’ রূপ নেবে।
মৎস্য সুরক্ষা ও সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী, এই আট মাস মেয়াদে ২৫ সেন্টিমিটার (বা ১০ ইঞ্চি)-এর চেয়ে ছোট সাইজের ইলিশ বা জাটকা ধরা, পরিবহন, মজুত, বাজারজাতকরণ কিংবা আড়ৎ ও খুচরা বাজারে কেনাবেচা করা সম্পূর্ণ দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।
বিশেষ করে নিষিদ্ধ ঘোষিত কারেন্ট জাল, বেহুন্দি জাল, মশারি জাল ও সুতা জালের ব্যবহার বন্ধ করতে নদ-নদীগুলোতে জিরো-টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হয়েছে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, এই প্রবিধান লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে মৎস্য সংরক্ষণ বিধিমালা মোতাবেক কঠোর আইনি শাস্তির বিধান রয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে— সর্বনিম্ন ১ বছর থেকে সর্বোচ্চ ২ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড, সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত তাৎক্ষণিক অর্থদণ্ড কিংবা উভয় দণ্ড। অপরাধের মাত্রা বিবেচনা করে বিজ্ঞ আদালত কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড উভয় সাজাই একসঙ্গে প্রদান করতে পারেন।
আইন অমান্যকারীদের তাৎক্ষণিক শাস্তি নিশ্চিত করতে নদী তীরবর্তী জেলা ও উপজেলাগুলোতে মৎস্য অধিদপ্তর এবং স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত সার্বক্ষণিক তৎপর রাখা হয়েছে।
মাঠপর্যায়ে এই আইন শতভাগ কঠোরভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে মৎস্য অধিদপ্তরের সঙ্গে দেশের সশস্ত্র বাহিনী ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী যৌথ টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে।
বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও কোস্ট গার্ডের সদরদপ্তরের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, তাদের বিশেষ কমান্ড টিম গভীর সমুদ্র ও উপকূলীয় নদীর মোহনায় বড় জাহাজ ও স্পিডবোট নিয়ে নিয়মিত টহলে নিয়োজিত রয়েছে। একইসঙ্গে নৌ পুলিশ দেশের ৬টি নদী অভয়াশ্রমে সার্বক্ষণিক নজরদারি বজায় রাখবে।
স্থলপথের চেকপোস্ট, মাছের আড়ৎ, পাইকারি বাজার ও কোল্ড স্টোরেজগুলোতে জাটকার অবৈধ পরিবহন ও মজুত ঠেকাতে র্যাব, পুলিশ ও বিজিবি বিশেষ অভিযান পরিচালনা করবে।
জাটকা ধরা নিষিদ্ধ থাকার এই সময়টিতে নদী অববাহিকার নিবন্ধিত জেলেদের জীবনযাত্রা ও গ্রামীণ খাদ্য নিরাপত্তা সচল রাখতে সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় বিশেষ মানবিক সহায়তা কর্মসূচি (ভিজিএফ চাল বরাদ্দ) নিশ্চিত করেছে।
এই কর্মসূচির আওতায় দেশের প্রধান ইলিশ-প্রবণ ২০টি জেলার ৯৬টি উপজেলার লক্ষাধিক কার্ডধারী নিবন্ধিত জেলে পরিবারকে প্রতি মাসে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ৪০ কেজি করে ভিজিএফ চাল বিতরণ করা হবে।
মৎস্য বিজ্ঞানীদের মতে, আশ্বিনের ২২ দিনের মা-ইলিশ রক্ষা কর্মসূচি নদীতে ইলিশের শতভাগ ‘জন্ম’ নিশ্চিত করে, আর পহেলা নভেম্বর থেকে শুরু হওয়া ৮ মাসের জাটকা রক্ষা আইন ইলিশের ‘বেড়ে ওঠা ও পরিপক্বতা’ নিশ্চিত করে থাকে।
মনোয়ারুল হক/
