রাতের বেলা দূষণজনিত কাশি কেন বাড়ে এবং মুক্তির উপায়

লাইফস্টাইল ডেস্ক, এবিসিনিউজবিডি, ঢাকা (১ নভেম্বর): দিনের বেলা যে কাশি সহনীয় মনে হয়, তা রাতে প্রায়ই আরও মারাত্মক রূপ ধারণ করতে পারে, বিশেষ করে বায়ুদূষণের মাত্রা বেশি থাকলে। দূষিত বাতাস শ্বাসতন্ত্রে অস্বস্তি তৈরি করে, শ্লেষ্মা বা মিউকাসের উৎপাদন বাড়িয়ে তোলে এবং শ্বাসনালিকে অধিক সংবেদনশীল করে তোলে। এর সঙ্গে যদি হাঁপানি, অ্যালার্জি কিংবা অ্যাসিড রিফ্লাক্সের মতো সমস্যা যুক্ত হয়, তবে রাতে শান্তিতে ঘুমানো বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। দূষণজনিত কাশি কেন রাতে বৃদ্ধি পায়, তা পরিষ্কারভাবে জানা থাকলে নিজের শ্বাসযন্ত্রের সুরক্ষায় সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া সহজ হয়।

বায়ুদূষণ কীভাবে কাশির উদ্রেক করে?

বায়ুদূষণে নানা ধরনের ক্ষতিকর গ্যাস ও ক্ষুদ্র কণা বিদ্যমান থাকে, যা সহজেই শ্বাসতন্ত্রে প্রবেশ করতে পারে। বিশেষ করে পিএম২.৫ (PM2.5) বা সূক্ষ্ম বস্তুকণা ফুসফুসের গভীরে পৌঁছে প্রদাহ ও অস্বস্তি তৈরি করে। দূষিত বাতাস গলা ও ফুসফুসে বিরক্তি সৃষ্টি করে, যার ফলে শরীর শ্লেষ্মা উৎপাদন করতে শুরু করে এবং শ্বাসনালি পরিষ্কার করার তাগিদে কাশির সৃষ্টি হয়।

যাদের ক্রনিক ব্রঙ্কাইটিস, হাঁপানি, অ্যালার্জি বা শ্বাসতন্ত্রের অন্য কোনো জটিলতা রয়েছে, তারা এসব দূষকের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল হন। তবে পূর্বে ফুসফুসের কোনো সমস্যা না থাকলেও বায়ুদূষণ বাড়লে যে কারও গলা ব্যথা, কাশি এবং শ্বাসকষ্টের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।

রাতে কাশি কেন বেড়ে যায়?

বেশ কিছু নির্দিষ্ট কারণে রাতে দূষণজনিত কাশি আরও প্রকট হতে পারে:

  • গলার পেছনে শ্লেষ্মা জমা হওয়া: শোয়ার পর নাক ও সাইনাস থেকে শ্লেষ্মা গলার পেছনের দিকে গড়িয়ে পড়তে পারে। একে পোস্ট-নাসাল ড্রিপ বলা হয়, যা বারবার কাশির কারণ হয়। সাইনাস সমস্যা, অ্যালার্জি বা শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণে এটি বেশি দেখা যায়।
  • হাঁপানির লক্ষণ তীব্র হওয়া: দ্য টোকাই জার্নাল অফ এক্সপেরিমেন্টাল অ্যান্ড ক্লিনিক্যাল মেডিসিন-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, হাঁপানিতে আক্রান্তদের লক্ষণ রাতে আরও খারাপ হয় কারণ ঘুমের সময় শ্বাসনালি বেশি সংবেদনশীল থাকে। দিনের দূষণে শ্বাসনালিতে আগে থেকেই অস্বস্তি থাকলে তা রাতে কাশি বা বুকে কষ্টের কারণ হতে পারে।
  • অ্যাসিড রিফ্লাক্সের কারণে গলায় অস্বস্তি: শুয়ে পড়লে পাকস্থলীর উপাদান খাদ্যনালি ও গলার দিকে চলে আসার প্রবণতা বাড়ে। অ্যাসিড রিফ্লাক্স নামক এই পরিস্থিতি গলায় অস্বস্তি তৈরি করে এবং বিশেষ করে ভারী বা দেরিতে খাবার খাওয়ার পর কাশির উদ্রেক করে।
  • ঘরের ভেতরের দূষক উপাদান: বাইরের দূষণ থেকে বাঁচতে ঘরে ফিরলেও বিপদ শেষ হয় না। রান্নার ধোঁয়া, সিগারেটের ধোঁয়া, ধূপ, মশার কয়েল এবং ধূলিকণা শ্বাসতন্ত্রের অস্বস্তি বাড়ায়। বাইরের দূষণে শ্বাসনালিতে প্রদাহ থাকলে ঘরের এই উপাদানগুলো কাশি আরও বাড়িয়ে তোলে।

অতিরিক্ত দূষণের দিনে রাতের বেলা কাশি কমানোর উপায়

কিছু কার্যকর পদক্ষেপ মেনে চললে দূষক উপادানের সংস্পর্শ কমানো এবং গলার অস্বস্তি থেকে স্বস্তি পাওয়া সম্ভব:

  • এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স (AQI) পরীক্ষা করুন: দূষণ বেশি থাকলে বাইরে দীর্ঘক্ষণ থাকা বা ব্যায়াম করা থেকে বিরত থাকুন। সম্ভব হলে ঘরের ভেতর অপেক্ষাকৃত নির্মল পরিবেশে শরীরচর্চা করুন।
  • ঘরের ভেতরের বায়ুর মান উন্নত করুন: বাইরে দূষণ বেশি থাকলে ঘরের বাতাস পরিষ্কার রাখতে জানালা বন্ধ রাখুন। প্রয়োজন সাপেক্ষে HEPA ফিল্টারযুক্ত এয়ার পিউরিফায়ার ব্যবহার করুন।
  • ঘরের ভেতরের অস্বস্তিকর উপাদান এড়িয়ে চলুন: ঘরের মধ্যে ধূমপান করা থেকে বিরত থাকুন। পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা নেই এমন স্থানে মশার কয়েল বা ধূপ জ্বালানো এড়িয়ে চলুন। ধুলোবালি কমানোর পাশাপাশি রান্নার ধোঁয়া যথাসম্ভব পরিহার করুন।
  • পর্যাপ্ত পানি পান করুন: প্রচুর পানি পানে গলার অস্বস্তি কমে এবং কফ বা শ্লেষ্মা অতিরিক্ত ঘন হয়ে যাওয়া রোধ করা যায়।
  • শোয়ার ভঙ্গিতে পরিবর্তন আনুন: পোস্ট-নেজাল ড্রিপ বা অ্যাসিড রিফ্লাক্সের কারণে কাশি হলে ঘুমানোর সময় মাথা কিছুটা উঁচুতে রাখলে আরাম মেলে।
  • বিদ্যমান শারীরিক সমস্যার সঠিক ব্যবস্থাপনা: হাঁপানি থাকলে চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী চিকিৎসা পরিকল্পনা মেনে চলুন এবং ওষুধ কাছে রাখুন। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ বন্ধ বা পরিবর্তন করবেন না।

কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?

দূষিত বাতাসের সংস্পর্শে আসার ফলে মাঝে মাঝে কাশি হওয়া স্বাভাবিক এবং অস্বস্তি দূর হলে সাধারণত তা সেরেও যায়। তবে দীর্ঘস্থায়ী বা বারবার ফিরে আসা কাশির কারণ কেবল দূষণই হতে পারে—এমন ধারণা করা ঠিক নয়।

কাশি যদি তিন সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হয়, বারবার ফিরে আসে কিংবা ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায়, তবে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। এ ছাড়া তীব্র শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা, কাশির সঙ্গে রক্ত দেখা দেওয়া বা ঠোঁট নীল হয়ে যাওয়ার মতো গুরুতর লক্ষণ প্রকাশ পেলে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা সহায়তা নিন।

মনোয়ারুল হক/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
ব্রেকিং নিউজ