ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি ‘একটি গেম চেঞ্জার’
নিজস্ব প্রতিবেদক, এবিসিনিউজবিডি, ঢাকা (৮ অক্টোবর): চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে সরকারের চুক্তিকে দেশের জন্য একটি বড় পরিবর্তন বা ‘গেম চেঞ্জার’ বলে অভিহিত করেছেন ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন। তার মতে, দুর্নীতি রোধ, সেবার মান বৃদ্ধি, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যে সংযোগ বাড়াতে এই চুক্তিটি অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা পালন করবে।
বৃহস্পতিবার (০৮ অক্টোবর) রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে এসব কথা জানান তিনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের ও ডিপি ওয়ার্ল্ডের চুক্তি নিয়ে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগের জবাব দিয়ে আশিক চৌধুরী লেখেন, সম্প্রতি একটি ডিপি ওয়ার্ল্ডের প্রজেক্টকে কেন্দ্র করে তাকে নিয়ে নানা ভিত্তিহীন গুঞ্জন ও ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ তোলা হয়। এসব সমালোচনাকে পেছনে ফেলে চট্টগ্রাম বন্দর আধুনিকায়নের এই উদ্যোগকে তিনি তার ব্যক্তিগত এবং জাতীয় জীবনের একটি বড় অর্জন হিসেবে দেখছেন। তিনি উল্লেখ করেন, এই প্রকল্প মাফিয়া ধাঁচের দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে একটি জোরালো অবস্থান।
দেশের বন্দরের বর্তমান করুণ চিত্র তুলে ধরে তিনি জানান, বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের র্যাংকিংয়ে আমাদের বন্দরের অবস্থান ৩৬৪তম, যেখানে ভিয়েতনামের কাই মেপ বন্দর রয়েছে ১১তম অবস্থানে। অতিরিক্ত লিড টাইমের কারণে বাংলাদেশ অনেক সময় প্রতিযোগিতামূলক বাজারে পিছিয়ে পড়ছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, কনটেইনার থাকার সময় বা ডুয়েল টাইম মাত্র এক দিন কমাতে পারলেই দেশের রপ্তানি প্রায় ৭.৪ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। এছাড়া এনসিটিতে বর্তমানে যন্ত্রপাতির কার্যকারিতা মাত্র ৭০ শতাংশ, যেখানে বিশ্বমানের বন্দরগুলোতে এটি অন্তত ৯৩ শতাংশ।
সমাধানের পথ বাতলে ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান বলেন, বন্দর খাতের এই দীর্ঘমেয়াদি সংকট দূর করতে বিশ্বের খ্যাতনামা ও অভিজ্ঞ আন্তর্জাতিক অপারেটরদের যুক্ত করার বিকল্প নেই। এর আগে গত বছর ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠান মার্সক গ্রুপের সঙ্গে লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল এবং পিএসএ সিঙ্গাপুরের সঙ্গে বে টার্মিনাল নিয়ে চুক্তি বা আলোচনা হয়েছে। আর এবার এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব পেল ডিপি ওয়ার্ল্ড।
ডিপি ওয়ার্ল্ডের সক্ষমতার তুলনা টেনে তিনি জানান, বর্তমানে আমাদের বন্দরে জাহাজের টার্ন-অ্যারাউন্ড সময় আড়াই দিন লাগলেও ডিপি ওয়ার্ল্ডের ক্ষেত্রে তা মাত্র ২৪ ঘণ্টা। এছাড়া আমাদের বন্দরগুলোতে যেখানে প্রতি ঘণ্টায় গড়ে ২২টি ক্রেন হ্যান্ডেল করা হয়, সেখানে ডিপি ওয়ার্ল্ড বিশ্বব্যাপী গড়ে ৩৫টিরও বেশি কনটেইনার হ্যান্ডেল করে থাকে।
চুক্তির গোপনীয়তা প্রসঙ্গে আশিক চৌধুরী স্পষ্ট করেন যে, পূর্ণাঙ্গ চুক্তি প্রকাশ করলে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের দর-কষাকষির সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। তাই বিশ্বব্যাংক ও এডিবির মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পরামর্শ অনুযায়ী স্বচ্ছতা বজায় রেখে চুক্তির শুধুমাত্র সারাংশ প্রকাশ করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, শ্রমিক সংগঠনসহ নানা মহলের বিভিন্ন আপত্তির মুখেও গত বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে ইনভেস্ট বাংলাদেশের কার্যালয়ে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) ভিত্তিতে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি স্বাক্ষর পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানান, ১৫ বছরের জন্য এনসিটির পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ডিপি ওয়ার্ল্ডকে। তবে টার্মিনালের জমি, অবকাঠামো এবং সার্বিক নিয়ন্ত্রণ চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের হাতেই থাকবে।
চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, ডিপি ওয়ার্ল্ড শুরুতে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা অগ্রিম ফি প্রদান করবে এবং প্রথম ১০ বছরে আধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তিতে ১ হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করবে। এছাড়া নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে না পারলে থাকবে আর্থিক জরিমানার ব্যবস্থা। এই চুক্তির আওতায় ডিপি ওয়ার্ল্ড কনটেইনার হ্যান্ডলিং থেকে প্রাপ্ত আয়ের ৬৭ শতাংশ চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে প্রদান করবে।
মনোয়ারুল হক/


