বিদায়বেলায় বিশ্বকাপ ফাইনালের ষড়যন্ত্র তত্ত্ব নিয়ে যা বললেন মেসি
ক্রীড়া ডেস্ক, এবিসিনিউজবিডি, ঢাকা (৭ অক্টোবর): আর্জেন্টিনা দলের আকাশী-সাদামাটা জার্সি গায়ে আন্তর্জাতিক অধ্যায়ের ইতি টানলেন লিওনেল মেসি। ২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপে মহাতারকার বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের সমাপ্তি আরও রঙিন হতে পারত। তবে ফাইনালে স্পেনের বিপক্ষে ১-০ গোলের একপেশে হারের কারণে টানা দ্বিতীয় বিশ্বজয়ের সোনালী স্বপ্ন অধরাই থেকে যায় আলবিসেলেস্তেদের। এরপর থেকেই ফুটবলে নানা ষড়যন্ত্র তত্ত্বের ডালপালা ছড়াতে শুরু করে, যে বিষয়ে এর আগে দলের বেশ কয়েকজন ফুটবলার ও কোচ মুখ খুললেও এতদিন নীরব ছিলেন মেসি। অবশেষে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে চিরতরে বিদায় জানানোর ক্ষণে সেই সব গুঞ্জন ও ষড়যন্ত্র তত্ত্বের জবাব দিলেন তিনি।
মঙ্গলবার বুেনস আইরেসের মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামে আয়োজিত বিদায় সংবর্ধনায় বিশ্বজয়ী এই অধিনায়ক জানান, শেষ বিশ্বকাপে ট্রফি ধরে রাখার মিশনে দলটি নিজেদের বিন্দু পরিমাণ শক্তিও অবশিষ্ট রাখেনি। সেই সঙ্গে বাইরের নানা সমালোচনা ও আক্রমণের বিপরীতে দলের ভেতরের ঐক্য অটুট রাখার জোরালো আহ্বান জানান তিনি। পুরো ক্যারিয়ারজুড়ে মূলত মাঠে পারফরম্যান্সে কথা বলা স্বল্পভাষী এই তারকা বিদায়লগ্নেও তার সাবলীল বক্তব্যে আবেগঘন পরিবেশ তৈরি করেন।
এদিন মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামে উপস্থিত ভক্ত-সমর্থক ও সতীর্থদের মাঝে যখন বিদায়ের বিষাদ স্পষ্ট, তখন মেসিকে বেশ শান্ত ও সংযত দেখা গেছে। তবে তার আবেগময় বিদায়ী ভাষণ শুনতে শুনতে চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি তরুণ মিডফিল্ডার এনজো ফার্নান্দেজ। বক্তৃতার একপর্যায়ে শেষ বিশ্বকাপের সেই রোমাঞ্চকর স্মৃতি ও কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার গল্প শোনান আর্জেন্টাইন অধিনায়ক।
মেসি তার বক্তব্যে বলেন, ‘আমি আজীবন এই আঙিনায় কাটাতে চেয়েছিলাম, কিন্তু বাস্তবতা হলো বিদায় নেওয়ার এটাই উপযুক্ত সময়। এবারের বিশ্বকাপটি আমার জন্য ব্যক্তিগতভাবে অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং ছিল। আমরা ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন হিসেবে ট্রফি জয়ের স্বপ্ন দেখেছিলাম এবং শিরোপার খুব কাছেও পৌঁছে গিয়েছিলাম। মানুষ যা-ই বলুক না কেন, ফাইনালে অস্বাভাবিক বা রহস্যজনক কিছু ঘটেনি। আমরা মাঠে আমাদের সবটুকু উজাড় করে দিয়েছিলাম। বিশেষ করে ইংল্যান্ডের ম্যাচটি আমাদের শারীরিক ও মানসিকভাবে মারাত্মকভাবে ক্লান্ত করে তুলেছিল। অনেক কষ্টে সেই ধকল কাটিয়ে আমরা ফাইনালে আসি।’
জাতীয় দলের হয়ে দীর্ঘ লড়াইয়ের স্মৃতিচারণ করে তিনি আরও যোগ করেন, ‘এই দেশের জার্সি গায়ে আমরা সব সময় যেভাবে রক্তজল করা লড়াই করেছি, এবারও তার ব্যতিক্রম ছিল না। দীর্ঘ পথচলায় যেসব সতীর্থের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়েছি, তাদের সবার প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা। অতীতেও আমরা এভাবেই লড়েছি, যদিও দুর্ভাগ্যের কারণে সব সময় শিরোপা জেতা সম্ভব হয়নি। তবে আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি, এই জার্সির জন্য আমার প্রতিটি সতীর্থ নিজেদের সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়েছে।’
বক্তব্যের শেষাংশে আন্তর্জাতিক ফুটবলের যাবতীয় সোনালী সাফল্য অর্জন করা মেসি বাইরের সকল সমালোচনা উপেক্ষা করে দলের ভেতরের সংহতি ধরে রাখার তাগিদ দেন। তিনি বলেন, ‘ইতিহাস বহুবার প্রমাণ করেছে যে আমরা যখন দল হিসেবে ঐক্যবদ্ধ থাকি, তখন যেকোনাি প্রতিপক্ষের চেয়ে শক্তিশালী হয়ে উঠি এবং যেকোনো বাধা সহজে পেরিয়ে যেতে পারি। সামনে নিশ্চিতভাবেই আমাদের কঠিন সময় আসবে, কারণ দীর্ঘদিন ধরে আমরা যা অর্জন করেছি তা সহজ কোনো ব্যাপার নয়। এমন দুঃসময়ে আমাদের একে অপরের পাশে আরও শক্তভাবে দাঁড়াতে হবে।’
সতীর্থদের উদ্দেশে দেওয়া শেষ পরামর্শের কথা স্মরণ করে মেসি বলেন, ‘আমি ওদের আগেও বলেছি, বিদায়বেলায়ও একই কথা বলছি—যেকোনো বড় লক্ষ্য অর্জন করতে হলে ইস্পাতকঠিন ঐক্য প্রয়োজন। কারণ এমন কিছু মানুষ সব সময় থাকে যারা জাতীয় দলের ব্যর্থতা দেখতে চায়। আমরা কোনোভাবেই তাদের সেই আনন্দ দিতে পারি না। প্রতিকূল পরিস্থিতিই আসল দলের চরিত্র ফুটিয়ে তোলে। ঐক্য ছাড়া বড় সাফল্য অসম্ভব। আর আমি গর্বের সঙ্গেই বলছি, আমরা একটি অসাধারণ দল ছিলাম বলেই এত সব অর্জন সম্ভব হয়েছে।’
মনোয়ারুল হক/
