যমুনা সার কারখানা উৎপাদনে ফিরল, স্থানীয় অর্থনীতিতে প্রাণচাঞ্চল্য
জামালপুর প্রতিনিধি, এবিসিনিউজবিডি, (৬ অক্টোবর): জামালপুরের সরিষাবাড়ীতে অবস্থিত যমুনা সার কারখানায় প্রায় আট মাস পর আবার ইউরিয়া সার উৎপাদন শুরু হয়েছে। গ্যাস সংকট ও নানা যান্ত্রিক জটিলতার কারণে দীর্ঘ দিন কারখানাটি বন্ধ থাকার পর সোমবার দিবাগত রাত ৩টা ১০ মিনিটে পুনরায় উৎপাদন কার্যক্রম চালু হয়।
কারখানার উৎপাদন বিভাগের প্রধান ফজলুল হক সংবাদমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, প্রয়োজনীয় গ্যাসের পর্যাপ্ত চাপ পাওয়ার পরই উৎপাদন প্রক্রিয়ায় যাওয়া সম্ভব হয়েছে।
বন্ধ থাকার নেপথ্য কারণ ও গ্যাস সংকট কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি থেকে গ্যাসের তীব্র সংকটের জেরে যমুনা সার কারখানার উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। এর আগে ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত দীর্ঘ ২৩ মাস গ্যাসের স্বল্পতা এবং বিভিন্ন কারিগরি ত্রুটির কারণে কারখানাটি বন্ধ রাখতে হয়েছিল।
গত ২০ সেপ্টেম্বর কারখানায় সীমিত পরিসরে গ্যাস সরবরাহ শুরু হলেও তা উৎপাদনের জন্য পর্যাপ্ত ছিল না। ফজলুল হক জানান, স্বাভাবিকভাবে ইউরিয়া উৎপাদনের জন্য ৪৬ এমএমসিএফ গ্যাসের চাপ প্রয়োজন হয়, তবে ৪২ থেকে ৪৩ এমএমসিএফ চাপ পেলেও উৎপাদন টিকিয়ে রাখা যায়। এর আগে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড মাত্র ২৭ থেকে ২৮ এমএমসিএফ চাপে গ্যাস সরবরাহ করায় প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হয়নি। অবশেষে সোমবার গভীর রাতে কাঙ্ক্ষিত গ্যাস চাপ পাওয়ার পর উৎপাদন সচল হয়।
স্থানীয় অর্থনীতিতে স্বস্তি ও শ্রমিকদের প্রতিক্রিয়া দীর্ঘ আট মাস পর কারখানাটি চালু হওয়ায় সরিষাবাড়ী ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকার ব্যবসা-বাণিজ্যে নতুন করে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে। এই কারখানার ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল দোকানদার, পরিবহন শ্রমিক এবং বিভিন্ন পেশার মানুষের মাঝে এখন স্বস্তি বিরাজ করছে।
কারখানা শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মোরশেদ আলম তালুকদার জানান, দীর্ঘ সময় উৎপাদন বন্ধ থাকায় অনেক শ্রমিক ও কর্মচারী মারাত্মক আর্থিক সংকটে মানবেতর জীবনযাপন করেছেন। উৎপাদন প্রক্রিয়া নিয়মিত ও সচল থাকলে তারা পুনরায় স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবেন বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
উৎপাদন সক্ষমতা ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব যমুনা সার কারখানার দৈনিক ইউরিয়া উৎপাদন সক্ষমতা ১ হাজার ৭০০ টন। তবে বিগত কয়েক বছর ধরে গ্যাসের স্বল্প চাপ ও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে সাধারণত দৈনিক ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টন সার উৎপাদিত হয়ে থাকে। কারখানার অ্যামোনিয়া অ্যান্ড ইউটিলিটি বিভাগের প্রধান জানান, বর্তমানে কারখানার সবকটি ইউনিট পুরোপুরি সচল রয়েছে। এই ধারা বজায় থাকলে প্রতিদিন পূর্বের মতো ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টন সার উৎপাদন করা সম্ভব হবে।
বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) তালিকাভুক্ত ১ হাজার ৯০০ জন ডিলারের মাধ্যমে এই কারখানার উৎপাদিত সার জামালপুর, শেরপুর, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইলসহ উত্তরবঙ্গের মোট ২১টি জেলায় সরবরাহ করা হয়ে থাকে।
কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, স্বাভাবিক গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত থাকলে যমুনা সার কারখানায় প্রতি মাসে প্রায় ২০০ কোটি টাকার সার উৎপাদন করা সম্ভব, যা থেকে প্রায় ৬০ কোটি টাকা মুনাফা আসে। অন্যদিকে, উৎপাদন বন্ধ থাকা অবস্থায়ও কারখানার যন্ত্রপাতি সচল রাখা এবং আনুষঙ্গিক রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রতি মাসে প্রায় ৬ কোটি টাকার গ্যাস খরচ হয়।
দীর্ঘ বিরতির পর পুনরায় উৎপাদনে ফেরায় এখন নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ বজায় রাখাই কারখানা কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট মহলের প্রধান দাবি ও প্রত্যাশা। সার উৎপাদনে এই ধারাবাহিকতা রক্ষা পেলে দেশের ইউরিয়া সার সরবরাহে কারখানাটির অবদান আরও সুদৃঢ় হবে এবং এর ওপর নির্ভরশীল স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও গতিশীল হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।
মনোয়ারুল হক/
