জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর: পরিবর্তনের লড়াই ও ভবিষ্যতের অঙ্গীকার

বিশেষ প্রতিনিধি, এবিসিনিউজবিডি, ঢাকা (৫ আগস্ট) : আজ ৫ আগস্ট, ঐতিহাসিক জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্ণ হলো। ২০২৪ সালের এই দিনে ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব আন্দোলনের মুখে টানা দেড় দশকের দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটেছিল। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে শুরু হওয়া সাধারণ মানুষের এই লড়াই দ্রুতই এক গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়, যা দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রেক্ষাপটে এক অভূতপূর্ব অধ্যায়ের সূচনা করে। আত্মত্যাগকারী শহীদ এবং হাজারো আহতের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আজ সারা দেশে পালিত হচ্ছে এই দিনটি।

বিগত দুই বছরে রাষ্ট্র সংস্কার এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ফেরাতে বেশ কিছু মৌলিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। জুলাই অভ্যুত্থানে সংঘটিত গণহত্যার ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও বাকস্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় উদ্যোগ লক্ষ করা গেছে। তবে এই পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার পাশাপাশি অর্থনৈতিক গতিশীলতা ধরে রাখা, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং দেশজুড়ে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখাই ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মূল দর্শন ছিল একটি বৈষম্যহীন, ইনসাফভিত্তিক ও গণতান্ত্রিক সমাজ বিনির্মাণ। দুই বছরের ব্যবধানে নাগরিক অধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কিছুটা জোরদার হলেও, একটি টেকসই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়তে রাজনৈতিক ঐকমত্য ও কাঠামোগত সংস্কারের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা আবশ্যক। গণ-অভ্যুত্থানের এই দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিতে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা—যে রক্তের বিনিময়ে নতুন সূর্যোদয় ঘটেছিল, তার সুফল যেন দেশের প্রতিটি নাগরিকের জীবনে প্রতিফলিত হয়।

বিগত ২৪ মাসে এই অভূতপূর্ব পরিবর্তনের সুফল ধরে রাখা, রাষ্ট্রযন্ত্রের আমূল সংস্কার এবং ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনর্গঠনে সরকার ও বিভিন্ন অংশীজন একযোগে কাজ করেছে।

গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিতে বিগত দুই বছরের মূল প্রাপ্তি, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জগুলো নিচে সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:

১. রাষ্ট্র সংস্কার ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি

অভ্যুত্থান পরবর্তী গঠিত বিভিন্ন সংস্কার কমিশনের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার ভিত্তি তৈরি হয়েছে:

  • বিচার বিভাগ ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল: উচ্চ আদালতে বিচারপতি নিয়োগে স্বচ্ছ নীতি প্রণয়ন এবং গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে দৃশ্যমান রূপ দেওয়া হয়েছে।
  • নির্বাচন ব্যবস্থা: নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন এবং এনআইডি সেবা পুনরায় নির্বাচন কমিশনের অধীনে ন্যস্ত করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে।
  • সংবিধান ও ক্ষমতার ভারসাম্য: প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ভারসাম্য আনয়ন, এক ব্যক্তির দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী না হওয়া এবং দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদের মৌলিক রূপরেখা আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে।

২. অর্থনৈতিক সংস্কার ও ব্যাংকিং খাতের সামাল

বিগত সরকারের বিপুল খেলাপি ঋণ, অর্থ পাচার ও রিজার্ভ সংকটের ধস সামাল দিতে বেশ কিছু কঠোর নীতি গ্রহণ করা হয়েছে:

  • ব্যাংক খাতে সুশাসন: ঝুঁকিপূর্ণ ও দখলকৃত ব্যাংকগুলোর পর্ষদ পুনর্গঠন করে ফরেনসিক অডিটের মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য উন্মোচন করা হয়েছে।
  • রেমিট্যান্স ও রিজার্ভ: হুন্ডি প্রতিরোধ ও প্রণোদনার ফলে প্রবাস আয় বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং বাজারভিত্তিক মুদ্রা হার (ক্রলিং পেগ) কার্যকর করায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের চরম ধস ঠেকানো গেছে।
  • মুদ্রানীতি ও মূল্যস্ফীতি: নীতি সুদহার বাড়িয়ে কঠোর সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালানো হচ্ছে।

৩. প্রধান সামষ্টিক অগ্রগতি ও বিদ্যমান রূপরেখা

ক্ষেত্র / নির্দেশক ২০২৪ (অভ্যুত্থান মুহূর্তের চিত্র) ২০২৬ (বর্তমান দুই বছর পরের চিত্র)
রাজনৈতিক ও বিচার ব্যবস্থা কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থা ও প্রাতিষ্ঠানিক ভঙ্গুরতা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে বিচার শুরু
ব্যাংকিং খাত গোপন খেলাপি ঋণ ও ব্যাপক তারল্য সংকট পর্ষদ পুনর্গঠিত, অডিট সম্পন্ন ও ব্যাংক সংস্কার ত্বরান্বিত
বৈদেশিক রিজার্ভ দ্রুত ক্ষয়িষ্ণু ও ডলার সংকট প্রবাসী আয় বৃদ্ধি ও বহুমুখী আন্তর্জাতিক সহায়তায় স্থিতিশীল
শাসনতান্ত্রিক রূপরেখা একমুখী ক্ষমতার চর্চা সংবিধান ও ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষায় সংস্কার প্রস্তাবনা

৪. অমীমাংসিত চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ পথরেখা

বিগত দুই বছরে নীতিগত বহু অগ্রগতি অর্জিত হলেও কিছু জায়গায় এখনো চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে:

  • আইনি বৈধতা ও ঐকমত্য: প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংস্কারের অগ্রাধিকার এবং সংসদীয় অনুমোদন ছাড়া সাংবিধানিক পরিবর্তনের আইনি বৈধতা নিয়ে তর্ক অমীমাংসিত।
  • আমলাতান্ত্রিক স্থবিরতা: জনপ্রশাসন ও পুলিশ বাহিনীর অভ্যন্তরীণ প্রতিরোধ ও স্থবিরতার কারণে অনেক সংস্কার প্রস্তাবনা বাস্তবে প্রয়োগে ধীরগতি দেখা গেছে।
  • বিনিয়োগ ও মূল্যস্ফীতি: সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির কারণে সুদের হার বাড়ায় বেসরকারি বিনিয়োগ ধীরগতির হয়ে পড়েছে, যা নতুন কর্মসংস্থান তৈরিতে প্রভাব ফেলছে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মূল দর্শন ছিল একটি বৈষম্যহীন, ইনসাফভিত্তিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গঠন। বিগত দুই বছর ছিল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সামলে স্থায়ী সংস্কারের ভিত্তি গড়ার সময়। এখন চূড়ান্ত গণতান্ত্রিক উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সকল রাজনৈতিক পক্ষগুলোর মধ্যে টেকসই ঐকমত্য এবং সুশাসনের ধারাবাহিকতা।

মনোয়ারুল হক/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
ব্রেকিং নিউজ