৩ ধাপে বাড়বে সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতন, ভাতা কার্যকর ২৮ সালের মধ্যে

নিজস্ব প্রতিবেদক, এবিসিনিউজবিডি, ঢাকা (২০ সেপ্টেম্বর): সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বাড়িয়ে একটি নতুন বেতনকাঠামোর প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সরকার। নতুন এই বেতনব্যবস্থা চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে কার্যকর বলে গণ্য হবে। ঘোষণা অনুযায়ী, মূল বেতন তিন ধাপে বাড়ানো হলেও সব ধরনের ভাতা কার্যকর করা হবে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে।

অর্থ বিভাগ গত বৃহস্পতিবার এই বেতনকাঠামোর গেজেটে স্বাক্ষর করে, যা পরবর্তীতে গতকাল শনিবার জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়। ১ জুলাই থেকে কার্যকর হওয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্মচারীরা বিগত দুই মাসের বর্ধিত বেতনের বকেয়া টাকা একসঙ্গে হাতে পাবেন।

প্রজ্ঞাপনে রূপরেখা দিয়ে বলা হয়েছে, চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত নবম ও তদূর্ধ্ব পদের কর্মকর্তারা তাদের নতুন কাঠামোর বাড়তি মূল বেতনের ৪০ শতাংশ এবং ১০ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীরা ৫০ শতাংশ হারে পাবেন। এরপর আগামী ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত সময়ে প্রথমোক্ত কর্মকর্তারা ৭০ শতাংশ এবং ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীরা ৭৫ শতাংশ বর্ধিত মূল বেতন তুলতে পারবেন। পরবর্তীতে ২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে নতুন স্কেলের শতভাগ মূল বেতন চালু হবে। আর সব ধরনের ভাতা পুরোপুরি কার্যকর হবে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে। একইভাবে পেনশনের সুবিধাভোগী ব্যক্তিরাও ধাপে ধাপে নতুন কাঠামোর পূর্ণাঙ্গ সুবিধা উপভোগ করতে পারবেন।

পাঁচ ধাপে বাড়ছে পেনশন

অবসরে যাওয়া চাকরিজীবীদের পেনশন বাড়ানোর ক্ষেত্রে পাঁচ স্তরের বিন্যাস করা হয়েছে। ফলে যারা অনেক আগে অবসরে গেছেন এবং তুলনামূলক কম অর্থ পাচ্ছেন, তাদের সুবিধা বেশি বৃদ্ধি পাবে। যেমন— সর্বনিম্ন ৯ হাজার টাকা পেনশন পাওয়া ব্যক্তিরা এখন পাবেন ১৮ হাজার টাকা। অন্যদিকে বর্তমান নিয়মে সর্বোচ্চ বা তার বেশি অর্থাৎ ৪০ হাজার ১ টাকা পেনশন পাওয়া ব্যক্তিরা বাড়িয়ে পাবেন ৭০ হাজার ২০০ টাকা।

প্রজ্ঞাপনের নির্দেশনা অনুযায়ী, যাদের নিট পেনশন ৯ হাজার টাকা বা তার নিচে, তাদের ভাতা ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া ৯ হাজার ১ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত ৭৫ শতাংশ, ২০ হাজার ১ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত ৬৫ শতাংশ, ৩০ হাজার ১ থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত ৬০ শতাংশ এবং এর চেয়ে বেশি অর্থাৎ ৪০ হাজার ১ টাকা বা তদূর্ধ্ব পেনশনধারীদের নিট পেনশন ৫৫ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে।

কার মূল বেতন কতটুকু বাড়ছে

নতুন বেতন কাঠামোর বিন্যাস অনুযায়ী প্রথম থেকে একাদশ গ্রেড পর্যন্ত সবার মূল বেতন দ্বিগুণ বা ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি ১২তম থেকে ২০তম গ্রেডের চাকরিজীবীদের মূল বেতন ১১৫ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এর মধ্যে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এবং সমমর্যাদার পদগুলোর নতুন বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৭২ হাজার টাকা, যা আগে ছিল ৮৬ হাজার টাকা। এছাড়া জ্যেষ্ঠ সচিব ও সমমানের পদে বেতন এখন থেকে ৮২ হাজার টাকার পরিবর্তে ১ লাখ ৬৪ হাজার টাকা নির্ধারিত হয়েছে। এই পদগুলোর মূল বেতন নির্দিষ্ট থাকায় ভবিষ্যতে আর বাড়বে না।

অন্যদিকে গ্রেড-১ এর প্রারম্ভিক মূল বেতন ৭৮ হাজার থেকে বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা, গ্রেড-২ এ ৬৬ হাজার থেকে বেড়ে ১ লাখ ৩২ হাজার টাকা, গ্রেড-৩ এ ৫৬ হাজার ৫০০ থেকে বেড়ে ১ লাখ ১৩ হাজার টাকা, গ্রেড-৪ এ ৫০ হাজার থেকে বেড়ে ১ লাখ টাকা, গ্রেড-৫ এ ৪৩ হাজার থেকে বেড়ে ৮৬ হাজার টাকা, গ্রেড-৬ এ ৩৫ হাজার ৫০০ থেকে বেড়ে ৭১ হাজার টাকা, গ্রেড-৭ এ ২৯ হাজার থেকে বেড়ে ৫৮ হাজার টাকা, গ্রেড-৮ এ ২৩ হাজার থেকে বেড়ে ৪৬ হাজার টাকা, গ্রেড-৯ এ ২২ হাজার থেকে বেড়ে ৪৪ হাজার টাকা এবং গ্রেড-১০ এর মূল বেতন ১৬ হাজার থেকে উন্নীত হয়ে ৩২ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে।

নিম্নতর ধাপগুলোর মধ্যে গ্রেড-১১ তে মূল বেতন ১২ হাজার ৫০০ থেকে বেড়ে ২৫ হাজার টাকা, গ্রেড-১২ এ ১১ হাজার ৩০০ থেকে ২৪ হাজার ৩০০ টাকা, গ্রেড-১৩ এ ১১ হাজার থেকে ২৪ হাজার টাকা, গ্রেড-১৪ এ ১০ হাজার ২০০ থেকে ২৩ হাজার ৫০০ টাকা, গ্রেড-১৫ এ ৯ হাজার ৭০০ থেকে ২২ হাজার ৮০০ টাকা, গ্রেড-১৬ এ ৯ হাজার ৩০০ থেকে ২১ হাজার ৯০০ টাকা, গ্রেড-১৭ এ ৯ হাজার থেকে ২১ হাজার ৪০০ টাকা, গ্রেড-১৮ এ ৮ হাজার ৮০০ থেকে ২১ হাজার টাকা, গ্রেড-১৯ এ ৮ হাজার ৫০০ থেকে ২০ হাজার ৫০০ টাকা এবং গ্রেড-২০ এর মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করা হয়েছে।

কোন এলাকায় কেমন বাড়িভাড়া

কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসিক সুবিধার জন্য এলাকাভেদে মূল বেতনের নির্দিষ্ট শতাংশ হারে বাড়িভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকার ক্ষেত্রে গ্রেড-২০ থেকে গ্রেড-১৬ পর্যন্ত কর্মীরা মূল বেতনের ৬০ শতাংশ বাড়িভাড়া পাবেন। এছাড়া গ্রেড-১৫ থেকে গ্রেড-১০ পর্যন্ত ৫০ শতাংশ, গ্রেড-৯ থেকে গ্রেড-৫ পর্যন্ত ৪৫ শতাংশ এবং গ্রেড-৪ থেকে গ্রেড-১ ও তদূর্ধ্ব পদের কর্মকর্তারা ৪০ শতাংশ হারে বাড়িভাড়া পাবেন।

অন্যদিকে খুলনা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, সিলেট, বরিশাল, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, রংপুর, গাজীপুর, ময়মনসিংহ ও বগুড়ার পাশাপাশি সাভার এবং কক্সবাজার পৌর এলাকায় এই হার কিছুটা কম রাখা হয়েছে। এসব অঞ্চলে গ্রেড-২০ থেকে গ্রেড-১৬ পর্যন্ত ৫০ শতাংশ, গ্রেড-১৫ থেকে গ্রেড-১০ পর্যন্ত ৪০ শতাংশ, গ্রেড-৯ থেকে গ্রেড-৫ পর্যন্ত ৩৫ শতাংশ এবং গ্রেড-৪ থেকে তদূর্ধ্ব গ্রেডের চাকরিজীবীরা ৩০ শতাংশ হারে বাড়িভাড়া পাবেন।

দেশের অন্যান্য অঞ্চলের জন্য গ্রেড-২০ থেকে গ্রেড-১৬ পর্যন্ত ৪৫ শতাংশ, গ্রেড-১৫ থেকে গ্রেড-১০ পর্যন্ত ৩৫ শতাংশ, গ্রেড-৯ থেকে গ্রেড-৫ পর্যন্ত ৩০ শতাংশ এবং গ্রেড-৪ থেকে তদূর্ধ্ব গ্রেডের কর্মীদের জন্য মূল বেতনের ২৫ শতাংশ হারে বাড়িভাড়া নির্ধারিত হয়েছে।

পদোন্নতি না পেলে উচ্চতর গ্রেডের সুবিধা

প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, কোনো কর্মচারী একই পদে দীর্ঘদিন পদোন্নতি ছাড়া আট বছর পূর্ণ করলে নবম বছরে পরবর্তী উচ্চতর গ্রেড লাভ করবেন। এভাবে আট বছর পূর্তিতে উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার পর কোনো পদোন্নতি ছাড়া আরও ছয় বছর চাকরি করলে সপ্তম বছরে গিয়ে তারা আরও একটি উচ্চতর গ্রেড পাবেন। চতুর্থ গ্রেড পর্যন্ত এই নিয়ম কার্যকর থাকবে। এছাড়া ব্লকড পদে থাকা কর্মচারীরা দুটি উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার পর দ্বিতীয় গ্রেড প্রাপ্তির আট বছর পূর্তি সাপেক্ষে নবম বছরে তৃতীয় উচ্চতর গ্রেডের সুবিধা পাবেন। তবে পুরো চাকরিজীবনে এই সুবিধা সর্বোচ্চ তিনবারের বেশি পাওয়া যাবে না।

চিকিৎসা ভাতা সংক্রান্ত বিধান

নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, সরকারি কর্মীরা ৫০ বছর বয়স পর্যন্ত প্রতি মাসে ৩ হাজার টাকা এবং বয়স ৫০ বছর ১ দিন থেকে পিআরএল বা প্রাক-অবসরের শেষ দিন পর্যন্ত মাসিক ৪ হাজার টাকা করে চিকিৎসা ভাতা পাবেন। অন্যদিকে অবসরপ্রাপ্ত এবং আজীবন পারিবারিক পেনশনভোগীরা ৫০ বছর বয়স পর্যন্ত ৩ হাজার টাকা, ৫০ থেকে ৬০ বছর বয়স পর্যন্ত ৪ হাজার টাকা, ৬০ থেকে ৭০ বছর বয়স পর্যন্ত ৫ হাজার টাকা এবং সত্তরোর্ধ্ব বয়সের ব্যক্তিরা প্রতি মাসে ৬ হাজার টাকা করে চিকিৎসা ভাতা পাবেন।

অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা ও ভাতা

কর্মচারীরা মূল বেতনের ১৫ শতাংশ হারে বাংলা নববর্ষ ভাতা এবং বছরের নির্দিষ্ট সময়ে মূল বেতনের সমপরিমাণ দুটি উৎসব ভাতা পাবেন। ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মীরা মাসিক ৫০০ টাকা টিফিন ভাতা (যেসব অফিস লাঞ্চ সরবরাহ করে না) এবং শিক্ষা সহায়ক ভাতা হিসেবে প্রথম সন্তানের জন্য ৫০০ টাকা ও অনধিক দুই সন্তানের জন্য মোট ১ হাজার টাকা পাবেন।

সিটি করপোরেশন এলাকায় কর্মরত ১১-২০তম গ্রেডের কর্মচারীরা প্রতি মাসে ৬ হাজার টাকা যাতায়াত ভাতা পাবেন। এছাড়াও পঞ্চম ও তদূর্ধ্ব গ্রেডের কর্মচারীরা ৫০০ টাকা এবং ষষ্ঠ থেকে বিশতম গ্রেডের কর্মীরা প্রতি মাসে ১৫০ টাকা মোবাইল ভাতা পাবেন। প্রতিবন্ধী সন্তান থাকলে দুজন পর্যন্ত সন্তানের বিপরীতে প্রতি মাসে ৩ হাজার টাকা করে ভাতা দেওয়া হবে।

উল্লেখ্য, নতুন এই বেতনকাঠামো প্রণয়নের উদ্দেশ্যে বিগত অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই একটি বেতন কমিশন গঠন করেছিল। কমিশন গত ২১ জানুয়ারি তাদের প্রতিবেদন জমা দিলেও বর্তমান নির্বাচিত সরকারের হাতে এর বাস্তবায়নের দায়িত্ব ন্যস্ত হয়। পরবর্তীতে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর গত ২১ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনিকে প্রধান করে ১০ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। সেই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে গত ৩১ আগস্ট মন্ত্রিসভায় নতুন বেতনকাঠামো অনুমোদিত হয় এবং আইন মন্ত্রণালয়ের আইনি যাচাই-বাছাই শেষে অবশেষে প্রজ্ঞাপন আকারে জারি করা হলো।

মনোয়ারুল হক/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
ব্রেকিং নিউজ