দুই প্রকল্পে গচ্চা ২৬ কোটি টাকা, আবার বড় প্রকল্পের তোড়জোড়

নিজস্ব প্রতিবেদক, এবিসিনিউজবিডি, ঢাকা (২০ সেপ্টেম্বর): কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) বাস্তবায়নাধীন ছোট হিমাগারবিষয়ক দুটি উদ্যোগ কৃষকবান্ধব না হওয়ায় প্রায় ২৬ কোটি টাকার সরকারি অর্থের অপচয় হয়েছে বলে জানা গেছে। সম্প্রতি ডিআইর কাছে জমা পড়া ফার্মার্স মিনি কোল্ডস্টোরেজ প্রকল্পের প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কর্মকর্তার বক্তব্যে এ চিত্র উঠে এসেছে। এমন নেতিবাচক অভিজ্ঞতার মাঝেই এবার হিমাগার নির্মাণে আরও একটি বৃহৎ প্রকল্প গ্রহণের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়। এ বিষয়ে কৃষিবিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো, পাইলট প্রকল্পের প্রকৃত সাফল্য যাচাই না করে বড় পরিসরে গেলে একদিকে যেমন সরকারি অর্থের অপচয় বাড়বে, অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন প্রান্তিক কৃষকেরাও।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মৌসুমি ফল ও শাকসবজি সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে সরকার দুটি আলাদা প্রকল্পে প্রায় ২৬ কোটি টাকা ব্যয় করেছে। এসব উদ্যোগের আওতায় মোট ১৮০টি ক্ষুদ্র হিমাগার স্থাপনের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও এখন পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়েছে ১৫০টি। এর মধ্যে একটি প্রকল্পে ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ১০০টি হিমাগার নির্মাণ করা হয়; অন্যটিতে ১৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ৮০টি হিমাগার করার কথা থাকলেও কাজ শেষ হয়েছে ৫০টির। ইতোমধ্যে প্রথম প্রকল্পটির মেয়াদ গত জুনে শেষ হয়েছে এবং দ্বিতীয়টির মেয়াদ শেষ হতে চলেছে চলতি অক্টোবরে। তবে নির্মিত এসব হিমাগারের কার্যকারিতা নিয়ে এরই মধ্যে নানা প্রশ্ন উঠেছে। এই বাস্তবতার মধ্যেও কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ প্রায় দুই হাজার নতুন হিমাগার তৈরির একটি বড় প্রকল্প চালুর ঘোষণা দিয়েছেন।

দ্রুত নষ্ট হচ্ছে ফল ও সবজি বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের আর্থিক সহায়তায় প্রায় ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় সাশ্রয়ী কোল্ডস্টোরেজ প্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে কৃষকের আয় বৃদ্ধি প্রকল্প’টি বাস্তবায়িত হয়। ২০২৫ সালের এপ্রিলে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের কাজ শেষ হয় চলতি বছরের জুনে। এর অধীনে ১০০টি মিনি হিমাগার তৈরি করা হলেও বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকায় সেগুলোর অর্ধশতক বা ৫০টি এখনো সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় রয়েছে। তা ছাড়া যেসব হিমাগার সচল আছে, সেগুলোর কাঙ্ক্ষিত সুফল থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন কৃষকরা। গত বুধবার এ বিষয়ে গঠিত অনুসন্ধান ও মূল্যায়ন কমিটি ডিএইর মহাপরিচালকের কাছে তাদের সরেজমিন প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এসব হিমাগারে রাখার ফলে ফল ও শাকসবজি খুব দ্রুত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে এবং সংরক্ষিত পণ্যের মানও টিকছে না। হিমাগারগুলো ব্যয়সাশ্রয়ী না হওয়ায় অনেক কৃষক উল্টো লোকসানের মুখোমুখি হচ্ছেন। ফলে বর্তমান সক্ষমতার বিচারে এই মিনি কোল্ডস্টোরেজগুলোর বাণিজ্যিক কার্যকারিতা নেই। তা ছাড়া সব ধরনের কৃষিপণ্য সংরক্ষণের উপযোগীও এগুলো নয়।

১২ কোটি টাকার এই প্রকল্পের আওতায় চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে একটি ছোট হিমাগার স্থাপন করেছিলেন উদ্যোক্তা কৃষক কামাল পারভেজ। তিনি জানান, এখানে সংরক্ষণের পর সবজির গুণগত মান আর ঠিক থাকে না; সবজি কুঁচকে যাওয়ার পাশাপাশি রঙও বদলে যায়। কুমিল্লার চান্দিনার কৃষক শরীফ হোসেনও প্রায় একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান। গাজীপুর সদর উপজেলার শাহিনুর ইসলাম শাহিন জানান, হিমাগারে কাঁঠাল রাখার পর তা নষ্ট হয়ে গেছে, পেঁপের রঙ বদলেছে এবং আলুতেও অঙ্কুর গজিয়ে গেছে।

ডিএইর অনুসন্ধান কমিটি এই প্রকল্পের ২৬টি হিমাগার সরেজমিন পরিদর্শন করে। তাদের সুপারিশে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের অর্থে নির্মিত এই ফার্মার্স মিনি কোল্ডস্টোরেজগুলো বর্তমান অবস্থায় আর না বাড়িয়ে আরও গভীর গবেষণার মাধ্যমে প্রাপ্ত ফলাফলের ভিত্তিতে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।

ফার্মার্স মিনি কোল্ডস্টোরেজ কার্যক্রম মূল্যায়ন কমিটির আহ্বায়ক ও ডিএইর অতিরিক্ত পরিচালক মো. রওশন আলম বলেন, ‘মাঠপর্যায়ে যা পাওয়া গেছে, প্রতিবেদনে সেটাই তুলে ধরা হয়েছে এবং সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার হয়েছে কি না, তা যাচাই করা হয়েছে।’ মূল্যায়ন প্রতিবেদনটি হাতে পাওয়ায় মিনি হিমাগার নিয়ে সরকারের পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হবে বলে তিনি মনে করেন।

প্রথম উদ্যোগের পর সরকার ‘জলবায়ু সহনশীল কৃষির জন্য ফার্মার্স মিনি কোল্ডস্টোরেজ স্থাপন প্রকল্প’ নামে আরও একটি পদক্ষেপ নেয়। ২০২৫ সালের অক্টোবরে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হচ্ছে চলতি বছরের অক্টোবরে। ১৪ কোটি টাকার এই প্রকল্পের অধীনে ৮০টি মিনি হিমাগার স্থাপনের লক্ষ্য থাকলেও এখন পর্যন্ত কাজ শেষ হয়েছে ৫০টির। খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, হিমাগারগুলোর স্থান নির্বাচন এবং কৃষক বাছাই প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার ঘাটতি ছিল। এ ছাড়া কাঙ্ক্ষিত সুফল থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন কৃষকরা। উল্লেখ্য, প্রতিটি হিমাগার নির্মাণে গড়ে ১৭ লাখ টাকার বেশি খরচ হয়েছে।

উভয় হিমাগার প্রকল্পের পরিচালক (পিডি) তালহা জুবাইর মাসরুর ডিএইর কার্যালয়ে জানান, এই হিমাগারগুলোতে ঠিক কোন কোন ফসল রাখা যাবে এবং কুল চেম্বার কীভাবে পরিচালনা করতে হবে, সে বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা থাকতে হবে। তবে যেসব উদ্যোক্তা কৃষক এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, তাঁরা তুলনামূলক ভালো ফল পেয়েছেন।

ফসল নষ্ট হওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে প্রকল্প পরিচালক বলেন, ‘লোডশেডিং এবং কিছু হিমাগারের ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকায় সংরক্ষিত ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিছু কারিগরি বিষয় ও উদ্যোক্তাদের সচেতনতার অভাবের কারণেও কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পুরোপুরি আসেনি।’

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আব্দুর রহিম বলেন, ‘মিনি হিমাগারগুলোর স্থান নির্বাচন নির্দিষ্ট ফসলভিত্তিক এলাকায় হওয়া উচিত ছিল। কয়েকটি হিমাগার ঘুরে দেখা গেছে, এগুলো দীর্ঘ সময় ফসল সংরক্ষণ করতে পারে না। যদি অন্তত তিন মাস পর্যন্ত ফসল সংরক্ষণ করা যেত, তবে তা অনেক বেশি উপযোগী হতো।’

নতুন ৫০০ কোটি টাকার পরিকল্পনা আগামী এক থেকে দুই বছরের মধ্যে দেশে দুই হাজার ছোট হিমাগার নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের—এমন কথা জানিয়েছিলেন কৃষিমন্ত্রী। গত ১৫ জুন রাজধানীর একটি অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ক্ষুদ্র হিমাগারগুলো পরিচালনার জন্য প্রতিটিতে ২০ জন কৃষকের সমন্বয়ে একটি করে কমিটি গঠন করা হবে এবং এগুলো সম্পূর্ণ সৌরবিদ্যুতের সাহায্যে পরিচালিত হবে। সরকারের পক্ষ থেকে এসংক্রান্ত পাইলটিং কাজ এরই মধ্যে শেষ হয়েছে বলেও জানান মন্ত্রী।

আমিন উর রশিদ উল্লেখ করেন, দুই হাজার ক্ষুদ্র হিমাগার নির্মিত হলে দেশের প্রায় ৪০ হাজার কৃষক সরাসরি উপকৃত হবেন। কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ছোট দুই প্রকল্পের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে হিমাগার স্থাপনের এই নতুন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে নতুন প্রকল্পে কেবল হিমাগার নয়, এর সঙ্গে সমবায়ভিত্তিক স্বল্পকালীন ফসল সংরক্ষণের ব্যবস্থাও থাকবে, যার মাধ্যমে কৃষকরা বাজার যাচাই করে পণ্য বিক্রি করতে পারবেন এবং সংগ্রহ-পরবর্তী ক্ষতি কমবে। এর সঙ্গে গ্রেডিং, প্যাকেজিং, সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনা, সোলার এয়ারফ্লো প্রযুক্তিতে পেঁয়াজ সংরক্ষণ, সোলার ফ্রুট ড্রায়ার ও ক্ষুদ্র প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধাও যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

‘সৌরশক্তিনির্ভর মিনি হিমাগার ও ফসল সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনা প্রকল্প’ শীর্ষক প্রস্তাবিত নতুন এই বড় প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে (ডিপিপি) প্রায় ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রাক্কলন করা হয়েছে। তবে পূর্ববর্তী দুটি প্রকল্পের নেতিবাচক ফলাফলের কারণে বড় এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন নিয়ে কিছু অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা উইংয়ের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, ‘এ ধরনের প্রকল্পের মাধ্যমে নির্দিষ্ট কিছু মানুষের পকেট ভরলেও প্রান্তিক কৃষকের প্রকৃত উপকার নিশ্চিত হয় না।’

মিনি কোল্ডস্টোরেজ স্থাপন প্রকল্পের পিডি তালহা জুবাইর মাসরুর প্রস্তাবিত নতুন প্রকল্পটির ডিপিপি তৈরি করেছেন। তাঁর মতে, রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত নানা বিরোধের কারণে ডিএইর কিছু কর্মকর্তা এই বড় প্রকল্পের বিষয়ে নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করছেন। তবে কৃষিমন্ত্রী গণমাধ্যমে ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করায় প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে বলে তিনি আশাবাদী।

এ বিষয়ে কৃষিসচিব মো. সেলিম খানের বক্তব্য জানতে একাধিকবার কল ও বার্তা পাঠানো হলেও তাঁর তরফ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। সার্বিক বিষয়ে কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘পাইলট প্রকল্পের বাস্তব চিত্র ও সাফল্য দেখেই সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। সংবাদমাধ্যমে ছোট হিমাগারগুলোর ব্যর্থতার খবর এসেছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিপুল অর্থ ব্যয় করে দুই হাজার হিমাগার তৈরির পরিকল্পনা কোনোভাবেই বাস্তবসম্মত বলে মনে হয় না।’

মনোয়ারুল হক/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
ব্রেকিং নিউজ