সীমান্ত উত্তেজনা ছাপিয়ে ঢাকা-দিল্লির নতুন কৌশল: আসছে যৌথ টহল ও গোয়েন্দা তৎপরতা
নিউজ ডেস্ক, এবিসিনিউজবিডি, ঢাকা (১৩ জুন) : বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার অভিন্ন সীমান্তে অস্থিরতা ও ‘পুশ ইন’ বিতর্কের মাঝেই এক বড় ধরনের নিরাপত্তা সমঝোতায় পৌঁছেছে ঢাকা ও নয়া দিল্লি। সীমান্ত সুরক্ষায় পারস্পরিক সহযোগিতা আরও জোরদার করতে এবার সমন্বিত টহলের পাশাপাশি উন্নত প্রযুক্তির গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুই প্রতিবেশী দেশ। শুক্রবার প্রকাশিত এক যৌথ বিবৃতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
সম্প্রতি তথাকথিত ‘অবৈধ অভিবাসী’ পুশব্যাক করার ভারতীয় প্রচেষ্টাকে কেন্দ্র করে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল, তার অবসানে এই সিদ্ধান্তকে একটি বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সঠিক আইনি প্রক্রিয়া ও প্রোটোকল না মেনে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী কর্তৃক বাংলাদেশে জোরপূর্বক মানুষ ঠেলে দেওয়ার (পুশ ইন) চেষ্টা নিয়ে ঢাকা দীর্ঘদিন ধরে তীব্র আপত্তি জানিয়ে আসছিল। বিশেষ করে ২০২৪ সালে বাংলাদেশে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে কিছুটা শীতলতা তৈরি হয়। এরই মাঝে ভারতের অভ্যন্তরে অনথিভুক্ত অভিবাসীদের চিহ্নিত ও বহিষ্কারের কড়া পদক্ষেপ ঢাকার সাথে সম্পর্ক জোড়া লাগানোর কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে আরও জটিল করে তোলে।
তবে সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে ভারতের নয়া দিল্লিতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এবং ভারতের বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের (বিএসএফ) শীর্ষ কর্মকর্তাদের চার দিনব্যাপী মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠকটি বেশ সফলভাবেই শেষ হয়েছে। বৈঠক শেষে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর পক্ষ থেকে আলোচনাকে অত্যন্ত ‘আন্তরিক, ইতিবাচক এবং দূরদর্শী’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।
সীমান্তের অপরাধ দমন, চোরাচালান রোধ এবং অনুপ্রবেশ ঠেকাতে এই নতুন যৌথ উদ্যোগ মাঠপর্যায়ে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখে, এখন সেটাই দেখার বিষয়।
নিয়মিত আয়োজিত এই বৈঠকে সীমান্ত এলাকায় ‘অবৈধ, অনিচ্ছাকৃত এবং জোরপূর্বক সীমান্ত অতিক্রমের’ বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এটি ক্রমেই একটি বিতর্কিত ও স্পর্শকাতর ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৪ হাজার কিলোমিটারের বেশি দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে, যা বিশ্বের দীর্ঘতম সীমান্তগুলোর একটি। ভারতের ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) যারা ত্রিপুরা, পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের মতো গুরুত্বপূর্ণ সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলো শাসন করে, তথাকথিত অনথিভুক্ত অভিবাসন মোকাবিলাকে অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণা করেছে। গত বছর থেকে দলটি ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে চিহ্নিত তথাকথিত ‘বাংলাভাষী মুসলমানদের’ বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে আসছে।
বাংলাদেশ জানিয়েছে, এ ধরনের কার্যক্রম বন্ধের আহ্বান জানিয়ে তারা নয়াদিল্লির কাছে এক ডজনের বেশি চিঠি পাঠিয়েছে। বিজিবি জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে তারা এ ধরনের একাধিক কথিত ‘পুশ ইন’ প্রচেষ্টা প্রতিহত করেছে। পাশাপাশি সীমান্ত এলাকায় মোতায়েন, গোয়েন্দা তৎপরতা এবং ড্রোন নজরদারিও জোরদার করা হয়েছে।
চলতি সপ্তাহের শুরুতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে সীমান্ত পেরিয়ে পাঠিয়ে দেওয়া ‘একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়।’ তিনি সতর্ক করে বলেন, এ ধরনের ঘটনা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নের প্রচেষ্টাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
বাংলাদেশ জানিয়েছে, কথিত জোরপূর্বক সীমান্ত অতিক্রম ঠেকাতে সীমান্তের বিভিন্ন অংশে টহল জোরদার করা হয়েছে এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রমও চালু করা হয়েছে। অন্যদিকে ভারত মে মাসে জানিয়েছিল, তারা আনুষ্ঠানিক কাগজপত্র ছাড়া ভারতে বসবাসরত ২ হাজার ৮৬০ জনের বেশি সন্দেহভাজন বাংলাদেশি নাগরিকের জাতীয়তা যাচাই করতে ঢাকার সহায়তা চেয়েছে।
যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দুই পক্ষ মানব পাচার, সীমান্তে প্রাণহানি, চোরাচালান, সীমান্ত অবকাঠামো এবং সমন্বিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা (কো-অর্ডিনেটেড বর্ডার ম্যানেজমেন্ট প্ল্যান) বাস্তবায়ন নিয়েও আলোচনা করেছে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে শান্তি, প্রশান্তি এবং স্থিতিশীলতা বজায় রাখার অঙ্গীকার দুই পক্ষ পুনর্ব্যক্ত করেছে।’ পাশাপাশি সমন্বিত টহল জোরদার, নজরদারি বৃদ্ধি, তাৎক্ষণিক তথ্য আদান-প্রদান উন্নত করা এবং আন্তসীমান্ত অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে যৌথ পদক্ষেপ বাড়ানোর বিষয়েও একমত হয়েছে তারা।
যৌথ বিবৃতিতে জানানো হয়, দুই দেশের শীর্ষ সীমান্ত কর্মকর্তাদের পরবর্তী বৈঠক আগামী নভেম্বরে ঢাকায় অনুষ্ঠিত হবে।
মনোয়ারুল হক/
