সবার চোখ আজ পাকিস্তানে
আন্তর্জাতিক ডেস্ক, এবিসিনিউজবিডি, (১১ এপ্রিল) : বিশ্ব রাজনীতির মানচিত্রে এখন সব আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু পাকিস্তান। দীর্ঘ ছয় সপ্তাহের বিধ্বংসী যুদ্ধের পর প্রথমবারের মতো সরাসরি শান্তি আলোচনায় বসতে যাচ্ছে চিরশত্রু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল ইসলামাবাদে পৌঁছেছে। হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা নিরসন এবং মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা ফেরানোই এই বৈঠকের মূল লক্ষ্য। তবে লেবাননে ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত থাকায় এবং দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি অনমনীয় শর্তের কারণে এই আলোচনার সফলতা ঘিরে বিশ্বজুড়ে তৈরি হয়েছে টানটান উত্তেজনা। এই কূটনৈতিক লড়াইয়ের ফলাফলের ওপর নির্ভর করছে বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি তেলের ভবিষ্যৎ।
মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফেরানোর এক মহাপরিকল্পনা নিয়ে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে শুরু হতে যাচ্ছে ঐতিহাসিক ‘ইসলামাবাদ সংলাপ’। দুই মাস আগে শুরু হওয়া যুদ্ধের ভয়াবহতা কাটিয়ে উঠতে এবং বিশ্ব অর্থনীতিকে পতনের হাত থেকে রক্ষা করতে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এখন পাকিস্তানে। গতকাল শুক্রবার বিকেলে এয়ারফোর্স টু বিমানে চড়ার আগে ভ্যান্স স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘আমরা সরল মনে আলোচনার টেবিলে এসেছি, কিন্তু ইরান যদি চতুরতার আশ্রয় নেয়, তবে তারা আমাদের কঠোর রূপ দেখতে পাবে।’
এই শান্তি আলোচনার প্রেক্ষাপট অত্যন্ত জটিল। গত মঙ্গলবার একটি যুদ্ধবিরতি ঘোষণা হলেও লেবানন পরিস্থিতি এখনো অগ্নিগর্ভ। গতকালও দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি বিমান হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে লেবাননের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরাও রয়েছেন। ইরান দাবি করেছে, এই হামলা যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন। কারণ তাদের মতে, এই চুক্তিতে লেবাননের ওপর হামলা বন্ধের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতির সঙ্গে লেবাননের কোনো সম্পর্ক নেই।
বিশ্ব অর্থনীতি এখন সুতোর ওপর ঝুলে আছে। ইরান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে রাখায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। সাধারণ সময়ে এই প্রণালি দিয়ে দৈনিক ১৪০টি জাহাজ যাতায়াত করত, কিন্তু এখন সেখানে কেবল ইরানের নিজস্ব জাহাজ চলছে। এর প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রে মুদ্রাস্ফীতি গত কয়েক বছরের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, ‘ইরান আমাদের চুক্তি ভঙ্গ করে জাহাজ থেকে ট্রানজিট ফি আদায়ের চেষ্টা করছে, যা মেনে নেওয়া হবে না।’
ইসলামাবাদে কড়া নিরাপত্তা, দুই দেশের প্রতিনিধিদলে আছেন যারা
ইসলামাবাদের পাঁচ তারকা হোটেল ‘সেরেনা’ এখন এক দুর্ভেদ্য দুর্গ। হোটেলটিকে কেন্দ্র করে তিন কিলোমিটার এলাকা সিলগালা করে দিয়েছে পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনী। শহরে ঘোষণা করা হয়েছে সাধারণ ছুটি। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, সরাসরি আলোচনার আগে দুই পক্ষের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান চলছে। মার্কিন প্রতিনিধিদলে ভ্যান্সের সঙ্গে রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার। অন্যদিকে ইরানের পক্ষে রয়েছেন অভিজ্ঞ পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এবং পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ।
আলোচনার টেবিলে যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত অত্যন্ত কঠিন। তারা চায় ইরান তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত পুরোপুরি ত্যাগ করুক, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বন্ধ করুক এবং হিজবুল্লাহর মতো আঞ্চলিক মিত্রদের সমর্থন দেওয়া বন্ধ করুক। বিপরীতে ইরানও এবার বেশ আক্রমণাত্মক। ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি তার প্রথম প্রকাশ্য বিবৃতিতে দাবি করেছেন, দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে এবং যুদ্ধের জন্য ইরানকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। তিনি সাফ জানিয়েছেন, ‘আগ্রাসীদের শাস্তি না দিয়ে আমরা ছাড়ব না।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সংলাপ জেডি ভ্যান্সের জন্য এক বিশাল অগ্নিপরীক্ষা। ২০২৮ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি অন্যতম প্রধান দাবিদার। মধ্যপ্রাচ্যের এই জটিল সমস্যার সমাধান করতে পারলে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তার গ্রহণযোগ্যতা বহুগুণ বেড়ে যাবে। অন্যদিকে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু লেবাননের সঙ্গে আলাদা আলোচনার প্রস্তাব দিয়ে পরিস্থিতির জটিলতা কিছুটা কমানোর চেষ্টা করছেন।
সব মিলিয়ে ইসলামাবাদে হতে যাওয়া এই দুই দিনের বৈঠকই বলে দেবে মধ্যপ্রাচ্য কি দীর্ঘস্থায়ী শান্তির পথে হাঁটবে নাকি আরও ভয়াবহ এক মহাযুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাবে। পুরো বিশ্ব এখন রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছে ইসলামাবাদের হোটেল সেরেনা থেকে আসা পরবর্তী বার্তার জন্য।
মনোয়ারুল হক/
