শতদিন পেরিয়ে তারেক রহমানের সরকার, স্বস্তি ও আগামীর অমীমাংসিত চ্যালেঞ্জ

বিশেষ প্রতিনিধি, এবিসিনিউজবিডি, ঢাকা (২৬ মে) : দেশের ১১তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর ইতোমধ্যেই শততম দিন পার করল তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার। এই অল্প সময়ে ব্যক্তি হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর সাদাসিধে ও নিরহংকার জীবনযাত্রা দেশের সাধারণ মানুষের মনে এক অনন্য জায়গা করে নিয়েছে। দীর্ঘ দুই দশকের প্রবাস জীবন শেষে গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফিরেছিলেন বিএনপির বর্তমান চেয়ারম্যান। এরপর আদালতের আইনি প্রক্রিয়া শেষে নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় এবং গত ১৭ ফেব্রুয়ারি দেশের শাসনভার গ্রহণ—সব মিলিয়ে তারেক রহমানের প্রতি জনগণের প্রত্যাশার পারদ ছিল আকাশচুম্বী। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ‘টাইম ম্যাগাজিন’-এর প্রভাবশালী ১০০ ব্যক্তির তালিকায় তার স্থান পাওয়া সেই জনপ্রিয়তারই বহিঃপ্রকাশ।

তবে ১০০ দিন পর এসে রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং সাধারণ মানুষের মনে একটি বড় প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে—প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সততা ও সুনামের প্রতিফলন কি সরকারের সামগ্রিক কার্যক্রমে পুরোপুরি দেখা যাচ্ছে?

১০০ দিন পূর্তি উপলক্ষে সোমবার আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন সরকারের নেওয়া বিভিন্ন সংস্কারমুখী পদক্ষেপ, উন্নয়ন পরিকল্পনা ও ভবিষ্যৎ রূপরেখা তুলে ধরেন। সরকারের শরিক ও নীতিনির্ধারকদের দাবি, ধ্বংসস্তূপের কিনারে দাঁড়িয়ে থাকা একটি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে পুনরায় সঠিক ট্র্যাকে ফিরিয়ে আনার আন্তরিক চেষ্টায় কোনো কমতি ছিল না। বিশেষ করে অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কারের ভিত্তি তৈরিতে এই ১০০ দিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মূল চেতনা ছিল কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সুশাসন এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা। কিন্তু মাঠপর্যায়ের চিত্র এখনো পুরোপুরি স্বস্তিদায়ক নয়। সাধারণ মানুষের প্রধান সংকটের জায়গাগুলো হলো:

  • অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও বাজারে আগুন: লাগামহীন দ্রব্যমূল্য, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং আর্থিক খাতের বিশৃঙ্খলা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলেছে।
  • বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে স্থবিরতা: নতুন কোনো দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ না আসায় যুবসমাজের কর্মসংস্থান তৈরির বিষয়টি এখনো অনিশ্চিত রয়ে গেছে।
  • আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি: সরকার নিজেই স্বীকার করেছে যে, দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি এবং এটি প্রশাসনের জন্য একটি বড় পরীক্ষা।

বিরোধী দলগুলোর পক্ষ থেকে সরকারের এই ১০০ দিনের কার্যক্রমের তীব্র সমালোচনা করা হচ্ছে। তাদের মতে, ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়ন করতে না পারাটা এই সরকারের অন্যতম বড় ব্যর্থতা। এছাড়া সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্ত করা এবং ব্যাংকিং খাতের কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

সবচেয়ে বড় আইনি সংকট তৈরি হয়েছে পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা ১৬টি জরুরি অধ্যাদেশ নিয়ে। এর মধ্যে ছিল:

জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ক্ষমতা বৃদ্ধি অধ্যাদেশ, গুম প্রতিরোধ ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ।

গুম কমিশন ও মানবাধিকার কমিশন বাতিল করে আরও শক্তিশালী আইন করার কথা বলা হলেও, গত ১০ এপ্রিলের মধ্যে এই অধ্যাদেশগুলো বিল আকারে সংসদে উত্থাপন না করায় এগুলো কার্যকারিতা হারিয়েছে। ফলে আইনি ক্ষেত্রে এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করা এই প্রশাসনের প্রধান চ্যালেঞ্জ এখন জনগণের এই বিপুল আস্থা ধরে রাখা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজে যে সততা ও সরলতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তার দলের তৃণমূল বা মাঝারি সারির নেতাকর্মীরা তা কতটা বজায় রাখতে পারছেন—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। অনেক ক্ষেত্রে দলীয় নেতাকর্মীদের অতি-উৎসাহী বা বিতর্কিত কর্মকাণ্ড সরকারের বড় বড় অর্জনকেও ম্লান করে দিচ্ছে।

আগামী দিনগুলোতে এই অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষা এবং অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে ওঠাই হবে এই নতুন সরকারের সফলতার আসল মাপকাঠি।

মনোয়ারুল হক/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
ব্রেকিং নিউজ