১১৫ দিনের রুদ্ধশ্বাস বন্দিদশা কাটিয়ে হরমুজ অতিক্রম করল বাংলার জয়যাত্রা

চট্টগ্রাম ব্যুরো, এবিসিনিউজবিডি, (২৩ জুন) : মধ্যপ্রাচ্যের তীব্র যুদ্ধাবস্থার মাঝে পারস্য উপসাগরে দীর্ঘ ১১৫ দিনের রুদ্ধশ্বাস বন্দিদশা কাটিয়ে অবশেষে মুক্ত আলোয় ডানা মেলেছে বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের (বিএসসি) রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কার্গো জাহাজ ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’। চরম উত্তেজনাপূর্ণ হরমুজ প্রণালী সফলভাবে অতিক্রম করে ৩৮ হাজার ৮৯৪ টন ধারণক্ষমতার এই বাল্ক ক্যারিয়ারটি এখন দক্ষিণ আফ্রিকার অভিমুখে এগিয়ে চলেছে।

বিশ্ব মেরিটাইম ইতিহাসে বিএসসির এই সফল উদ্ধার অভিযানকে অনন্য ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টের এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর মাহমুদুল মালেক এই স্বস্তিদায়ক খবরটি নিশ্চিত করেছেন।

সংকট ও সাহসিকতার এই গল্প শুরু হয়েছিল গত ২৬ জানুয়ারি। একটি সিঙ্গাপুরভিত্তিক চার্টারের অধীনে কাতার থেকে ৩৯ হাজার টন স্টিল কয়েল নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল আলি বন্দরে আসে জাহাজটি। কিন্তু ২৮ ফেব্রুয়ারি ওই অঞ্চলে আকস্মিক তীব্র সামরিক সংঘাত শুরু হলে চরম ঝুঁকির মুখে পড়ে জাহাজটি। এমন যুদ্ধপরিস্থিতির মধ্যেও গত ১১ মার্চ সাহসিকতার সাথে কার্গো খালাস করা হলেও হরমুজ প্রণালী পার হওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। তবে বিএসসি ম্যানেজমেন্ট হাত গুটিয়ে বসে থাকেনি; জাহাজটিকে অলস বসিয়ে না রেখে কৌশলগত বাণিজ্যিক পরিকল্পনায় সৌদি আরবের রাস আল খায়ের বন্দর থেকে প্রায় ৩৭ হাজার মেট্রিক টন সার বোঝাই করা হয়—যা এখন দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউন ও ডারবান বন্দরে পৌঁছানোর কথা। এই দূরদর্শী সিদ্ধান্তের ফলে জাহাজটি এক দিনের জন্যও ‘অফ-হায়ার’ বা লোকসানের মুখে পড়েনি।

এমভি বাংলার জয়যাত্রার ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, ১১৫ দিন পর অবশেষে আমরা মুক্ত হয়েছি। মাথার ওপর দিয়ে ড্রোন ও মিসাইল গেছে, মনে হতো যেকোনো মুহূর্তে সব শেষ হয়ে যাবে। ঘুমানোর সময় মনে হতো আজই বুঝি জীবনের শেষ রাত।

এই দীর্ঘ অবরুদ্ধ সময়ে জাহাজে থাকা ৩১ জন বাংলাদেশি নাবিক ও ক্রুর জীবন ছিল চরম আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তায় ঘেরা। গত ১৮ এপ্রিল ইরান নৌবাহিনী কৌশলগত কারণে জাহাজটির যাতায়াতের অনুমতি প্রত্যাখ্যান করলে সংকট আরও ঘনীভূত হয়। তবে অবরুদ্ধ দিনগুলোতে নাবিকদের মনোবল চাঙ্গা রাখতে বিএসসি অবিরাম লজিস্টিকস সহায়তা দিয়ে গেছে। জাহাজে সুপেয় পানি, খাবার, রসদ ও জ্বালানির সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার পাশাপাশি নাবিকদের সাধারণ ভাতার বাইরেও দৈনিক ৫ ডলার বিশেষ মিল অ্যালাউন্স, ঈদে বিশেষ প্রণোদনা এবং ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের জন্য ‘ওয়ার ওয়েজ’ প্রদান করা হয়।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ বন্দরে প্রয়োজনীয় বাঙ্কারিং ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্লিয়ারেন্স শেষে বর্তমানে জাহাজটির সকল নাবিক সম্পূর্ণ নিরাপদ ও সুস্থ আছেন। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও অদম্য মনোবল ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার জোরে বাংলাদেশ মেরিটাইম সেক্টর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের সক্ষমতার এক নতুন নজির স্থাপন করল।

মনোয়ারুল হক/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
ব্রেকিং নিউজ