ভারী বর্ষণে জলমগ্ন চট্টগ্রামের ৩ জেলায় এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত, পাহাড় ও দেয়াল ধসে নিহত ২
চট্টগ্রাম ব্যুরো, আলোকিত সময়, (৮ জুলাই) : টানা তিন দিনের অভূতপূর্ব ও ভারী বর্ষণে ভাসছে বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম। নগরীর প্রধান প্রধান সড়ক, বিপণিবিতান, বসতবাড়ি থেকে শুরু করে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান—সবই এখন পানির নিচে।
নজিরবিহীন এই জলাবদ্ধতায় স্থবির হয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষের জনজীবন। কোথাও কোথাও উপড়ে পড়েছে গাছপালা, তলিয়ে গেছে মহাসড়ক এবং উপজেলাগুলোতে দেখা দিয়েছে বন্যার চরম আশঙ্কা। দুর্যোগপূর্ণ এই পরিস্থিতিতে রেললাইনের ওপর পানি জমে যাওয়ায় দুটি যাত্রীবাহী ট্রেন মাঝপথে আটকে পড়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রীরা। এদিকে অতিবর্ষণজনিত কারণে দেয়াল ও পাহাড় ধসের পৃথক ঘটনায় ২ জনের প্রাণহানি ঘটেছে এবং আহত হয়েছেন অন্তত ৫ জন।
পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের তথ্যমতে, সক্রিয় মৌসুমি বায়ু ও উত্তর বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট প্রবল নিম্নচাপের যৌথ প্রভাবে এই রেকর্ডভাঙা বৃষ্টিপাত হয়েছে। গতকাল বিকেল ৩টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ৪১২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়, যা চলতি মৌসুমের সর্বোচ্চ। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দেশের সমুদ্রবন্দরগুলোকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে।
চট্টগ্রাম আবহাওয়া ও ভূপ্রাকৃতিক কেন্দ্রের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ আবদুর রহমান খান জানান, নিম্নচাপটি বর্তমানে ভারতের ঝাড়খণ্ড ও ওড়িশার দিকে অগ্রসর হলেও সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর কারণে আগামী অন্তত এক সপ্তাহ এই বৃষ্টি পাতের ধারা অব্যাহত থাকতে পারে।
বিপর্যস্ত নগর জীবন ও থমকে যাওয়া রেল যোগাযোগ
টানা বর্ষণে নগরীর আগ্রাবাদ, কাতালগঞ্জ, চকবাজার, বাকলিয়া, চান্দগাঁও, হালিশহর ও পতেঙ্গাসহ বিস্তীর্ণ এলাকা এখন জলমগ্ন। হাঁটু থেকে কোমরসমান পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় যাতায়াত করতে গিয়ে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন নগরবাসী। বহু বাসাবাড়ির নিচতলায় পানি ঢুকে আসবাবপত্র ও গৃহস্থালি সামগ্রীর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
এদিকে রেললাইনে পানি জমে যাওয়ায় এবং গাছ ভেঙে পড়ায় রেল যোগাযোগ বিঘ্নিত হয়েছে। গতকাল দুপুরে প্রায় ১ হাজার যাত্রী নিয়ে কক্সবাজারগামী ‘পর্যটক এক্সপ্রেস’ মুরাদপুর এলাকায় আটকে যায়। যাত্রীদের ভোগান্তি লাঘব করতে রেল কর্তৃপক্ষ বিকল্প ইঞ্জিনের সাহায্যে ট্রেনটিকে পুনরায় চট্টগ্রামে ফিরিয়ে আনে।
অন্যদিকে, কক্সবাজার থেকে ছেড়ে আসা চট্টগ্রামগামী ‘প্রবাল এক্সপ্রেস’ ট্রেনটি রেললাইনে গাছ ভেঙে পড়ায় দোহাজারী স্টেশনে আটকা পড়ে। এছাড়া জান আলী হাট ও লোহাগাড়াতেও ট্রেন আটকে পড়ার খবর নিশ্চিত করেছেন চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার আবু জাফর মজুমদার। একই সাথে পাহাড়ী ঢল ও বৃষ্টির পানিতে চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি মহাসড়কের হাটহাজারী অংশ কোমরসমান পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় যান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
পাহাড় ও দেয়াল ধসে প্রাণহানি
টানা বৃষ্টিপাতের জেরে নগরীর রহমান নগর আবাসিক এলাকার বি ব্লকে একটি দেয়াল ধসে শফিকুল রহমান নামের এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে, যার বাড়ি গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে। এই ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও চারজন।
অন্যদিকে, চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া সদরের ইছাখালী গুচ্ছগ্রাম এলাকায় পৃথক পাহাড় ধসের ঘটনায় মাটির নিচে চাপা পড়ে রেণু বেগম (৫৫) নামের এক নারী নিহত হয়েছেন এবং শহর বানু (৭০) নামের আরেক নারী গুরুতর আহত হয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চসিক মেয়রের তৎপরতা
দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতি মোকাবিলায় নগরীর বিভিন্ন জলমগ্ন এলাকা পরিদর্শন করেছেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন।
তিনি জানান, পরিস্থিতির ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখা হচ্ছে এবং দ্রুত পানি নিষ্কাশনে সব সংস্থার সমন্বয়ে কাজ চলছে।
মেয়র আরও উল্লেখ করেন, নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের ৭০ শতাংশ কাজ শেষ হওয়ায় অনেক এলাকায় সুফল মিলছে। তবে হিজড়া খাল, জামালখান খাল ও গুলজার খালের অবশিষ্টাংশের কাজ বাকি থাকায় কিছু এলাকায় এখনো সাময়িক এই জলজট তৈরি হচ্ছে।
তিন জেলায় পরীক্ষা স্থগিত
বন্যা পরিস্থিতি ও দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীনে থাকা চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও রাঙামাটি জেলার রবিবারের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে।
তবে বোর্ডের আওতাধীন বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি জেলাসহ দেশের অন্যান্য সকল শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা পূর্বঘোষিত সময়সূচি অনুযায়ী যথারীতি অনুষ্ঠিত হবে। আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এই সিদ্ধান্ত জানানো হয়।
মনোয়ারুল হক/
