ট্রাম্প-ন্যাটো সম্পর্কে টানাপোড়েন ও বহুমুখী বিতর্কের নতুন সমীকরণ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক, এবিসিনিউজবিডি, (৭ জুলাই) : তুরস্কে ন্যাটোর হাই-প্রোফাইল শীর্ষ সম্মেলন এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং এই পশ্চিমা সামরিক জোটের মধ্যকার অম্ল-মধুর সম্পর্ক আবারও বৈশ্বিক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে।
দীর্ঘদিন ধরেই ন্যাটোর কার্যকারিতা ও প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে ট্রাম্পের সমালোচনামূলক অবস্থান আন্তর্জাতিক মহলে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। একদিকে তিনি যেমন এই জোট থেকে ওয়াশিংটনকে সরিয়ে নেওয়ার প্রচ্ছন্ন হুমকি দিয়েছেন, অন্যদিকে আবার সগর্বে দাবি করেছেন যে, তার কড়া হুঁশিয়ারির কারণেই ইউরোপীয় দেশগুলো তাদের সামরিক বাজেট বাড়াতে বাধ্য হয়েছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে আটলান্টিকের দুই পাড়ের সম্মিলিত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গঠিত এই জোট গত ৭৭ বছরে এক অবিচ্ছেদ্য সামরিক কাঠামোয় রূপ নিয়েছে। তবে ট্রাম্পের মূল আপত্তি এখানেই—তার মতে, ইউরোপের সুরক্ষায় সিংহভাগ আর্থিক ও সামরিক বোঝা যুক্তরাষ্ট্র একাই বয়ে বেড়াচ্ছে, যা মোটেও সমীচীন নয়।
ইরান ইস্যুতে ফাটল ও সমন্বয়হীনতা
সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চরম উত্তেজনা ট্রাম্প ও ন্যাটোর মধ্যকার নীতিগত দূরত্বকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। তেহরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার আগে ট্রাম্প তার ইউরোপীয় মিত্র বা ন্যাটোর নীতিনির্ধারকদের সাথে কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক আলোচনা বা পরামর্শ করেননি।
পরবর্তীতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট প্রকাশ্যে ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, ওয়াশিংটনের এই অভিযানে ন্যাটোর সহযোগীরা অংশ নেয়নি এবং কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা নিশ্চিতেও তারা উদাসীন ছিল। বিপরীতে, ইউরোপীয় দেশগুলোর সাফ কথা—যুদ্ধংদেহী পরিস্থিতি তৈরির আগে তাদের সাথে ন্যূনতম কোনো সমন্বয়ই করা হয়নি। এই টানাপোড়েন দুই পক্ষের মধ্যকার কূটনৈতিক ফাটলকে আরও দীর্ঘায়িত করেছে।
প্রতিরক্ষা বাজেট ও ট্রাম্পের দ্বিমুখী বার্তা
ন্যাটোর কড়া সমালোচক হলেও ট্রাম্প প্রায়শই কৃতিত্ব নিয়ে বলেন, তার ক্রমাগত চাপের মুখে পড়েই জোটের সদস্য রাষ্ট্রগুলো নিজেদের প্রতিরক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়াতে বাধ্য হয়েছে। নিজের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির অংশ হিসেবে তিনি বারবার মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, মিত্রদের নিজেদের নিরাপত্তার খরচ এখন নিজেদেরই জোগাতে হবে।
তবে এই কঠোর মনোভাবের সমান্তরালে ট্রাম্পকে মাঝেমধ্যে ন্যাটোর পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির প্রতিও আনুগত্য প্রকাশ করতে দেখা গেছে। ট্রাম্পের এই স্ববিরোধী ও দ্বিমুখী অবস্থান অনেক সময়ই মিত্র দেশগুলোকে এক ধরনের নীতিগত গোলকধাঁধায় ফেলে দেয়।
গ্রিনল্যান্ড বিতর্ক: সম্পর্কে নতুন সংঘাত
ট্রাম্প ও ন্যাটোর মধ্যকার সম্পর্কের পারদ সবচেয়ে বেশি চড়েছিল ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত দ্বীপ গ্রিনল্যান্ডকে কেন্দ্র করে। মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে ট্রাম্প ঘোষণা করেছিলেন যে, ডেনমার্কের পছন্দ হোক বা না হোক, প্রয়োজনে সামরিক শক্তি খাটিয়ে হলেও গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নেবে যুক্তরাষ্ট্র।
ন্যাটোর একজন সক্রিয় সদস্য দেশের ভূখণ্ড নিয়ে এমন আগ্রাসী মন্তব্যে পশ্চিমা বিশ্বে তীব্র প্রতিক্রিয়া ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে সামরিক শক্তি প্রয়োগের অবস্থান থেকে ট্রাম্প কিছুটা পিছু হটলেও, যারা এই অধিগ্রহণের বিরোধিতা করেছে তাদের ওপর চড়া শুল্ক আরোপের হুমকি দেন। ফলে ইউরোপীয় মিত্রদের সাথে ওয়াশিংটনের দূরত্ব আরও এক ধাপ বেড়ে যায়।
সম্মেলন ঘিরে অনিশ্চয়তা ও বিশ্ববাসীর নজর
ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, চলমান তুরস্ক সম্মেলনে ইউরোপীয় নেতাদের মূল এজেন্ডাই হবে ট্রাম্পকে আশ্বস্ত করা এবং জোটের সুরক্ষায় মার্কিন প্রতিশ্রুতি ধরে রাখা। কিন্তু ইরান সংকট, প্রতিরক্ষা বাজেট নিয়ে কোন্দল এবং গ্রিনল্যান্ড ইস্যুর মতো সংবেদনশীল বিষয়গুলোর কারণে ট্রাম্প-ন্যাটো সম্পর্কের ভবিষ্যৎ এখনও যথেষ্ট ধোঁয়াশাপূর্ণ।
ফলশ্রুতিতে, এই সম্মেলনে ট্রাম্পের প্রতিটি পদক্ষেপ এবং তার দেওয়া বক্তব্যের দিকেই এখন তীক্ষ্ণ নজর রাখছে গোটা বিশ্ব। সূত্র: সিএনএন
মনোয়ারুল হক/
