আয়াতুল্লাহ খামেনির জানাজায় কেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি ছিলেন না
আন্তর্জাতিক ডেস্ক, এবিসিনিউজবিডি, (৬ জুলাই) : ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শেষকৃত্যে লাখো মানুষের জোয়ার নামলেও, সেখানে তাঁর ছেলে তথা বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির রহস্যজনক অনুপস্থিতি নিয়ে নানা গুঞ্জন শুরু হয়েছে।
রবিবার তেহরানে অনুষ্ঠিত জানাজায় প্রয়াত নেতার অন্য তিন পুত্র—মাসউদ, মোস্তফা ও মেইসাম উপস্থিত থাকলেও দেখা মেলেনি মোজতবার। এই রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান এবং বিপ্লবী গার্ডের প্রধান আহমাদ বাহিদিসহ সরকারের শীর্ষস্থানীয় নীতি-নির্ধারকরা উপস্থিত ছিলেন।
চলতি বছরের মার্চে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই মোজতবা খামেনি জনসমক্ষে আসেননি। তাঁর এই হঠাৎ নিখোঁজ থাকা এবং পিতার জানাজায় শরিক না হওয়া নিয়ে তাঁর শারীরিক অবস্থা সংক্রান্ত বিভিন্ন জল্পনা ডালপালা মেলছে। এমনকি তাঁর বাবা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি যে মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ বিমান হামলায় নিহত হয়েছিলেন, সেই একই হামলায় মোজতবাও গুরুতর আহত হয়েছেন বলে তীব্র গুজব ছড়িয়েছে। এছাড়া নিরাপত্তার স্বার্থে ইসরায়েলের সম্ভাব্য টার্গেট হওয়া থেকে বাঁচতেও তিনি নিজেকে আড়ালে রেখেছেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
১৯৮৯ সাল থেকে শুরু করে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দীর্ঘ শাসনকালের অবসান ঘটিয়ে চিরবিদায় নেওয়া আলী খামেনির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াকে ইরান কর্তৃপক্ষ ‘শতাব্দীর সেরা অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। সপ্তাহব্যাপী এই শোক কর্মসূচিতে ইরান ও ইরাকজুড়ে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ থেকে ২ কোটি মানুষের সমাগম ঘটবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বর্তমানে খামেনির মরদেহ তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লা ধর্মীয় কমপ্লেক্সে জনসাধারণের শ্রদ্ধার জন্য রাখা হয়েছে, যেখানে জানাজার ইমামতি করেন প্রবীণ শিয়া আলেম ৯৭ বছর বয়সী আয়াতুল্লাহ জাফর সোবহানি তাবরিজি।
রবিবার দেশজুড়ে সরকারি ছুটি পালনের পর, সোমবারের বিশাল শোকযাত্রার প্রস্তুতি হিসেবে মরদেহ গ্র্যান্ড মোসাল্লা থেকে স্থানান্তর করা হয়। তবে এই মহা-আয়োজনের মধ্যেই ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার বর্তমান ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির পরিস্থিতি উত্তেজনাকর রয়ে গেছে, যেখানে স্থায়ী শান্তির আলোচনা চললেও দুই পক্ষই একে অপরকে সামরিক অভিযানের হুমকি দিয়ে রাখছে।
এদিকে মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প খামেনির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার কারণে শান্তি আলোচনা এক সপ্তাহের জন্য স্থগিত রাখার কথা ঘোষণা করেছেন। তিনি কিছুটা উপহাসের সুরে বলেন, ইরানের শীর্ষ নেতারা যেখানে একসঙ্গে জড়ো হয়েছেন, সেখানে যুক্তরাষ্ট্র চাইলে ‘এক আঘাতেই’ সবাইকে খতম করতে পারত, কিন্তু আলোচনার পথ খোলা রাখতেই তারা তা করছে না। এছাড়া ইরানিদের কান্নাকে ‘ভুয়া’ বলে ট্রাম্প মন্তব্য করলে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন সাধারণ ইরানিরা। জানাজায় অংশ নেওয়া জাহরা সাফায়ি নামের এক নারী পাল্টা জবাবে বলেন, ৪৭ বছর আগে তাঁরা কোনো ভুয়া কান্না বা মেকি আবেগের জন্য বিপ্লব বা শহীদদের আত্মত্যাগ স্বীকার করেননি।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস ও দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জানাজার মঞ্চে দাঁড়িয়ে কবি মোহাম্মদ রাসুলি তাঁর কবিতার মাধ্যমে ট্রাম্পকে হত্যা করা ধর্মীয় দায়িত্ব বলে উল্লেখ করেন। এ সময় উপস্থিত জনতা ‘আমেরিকার ধ্বংস হোক’ এবং ‘ইসরায়েলের পতন হোক’ বলে স্লোগান দেয়। তেহরানের রাস্তায় সাধারণ মানুষের হাতে ‘ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুকে হত্যা করো’ এবং ‘আমরা প্রতিশোধ নেব’ লেখা ব্যানার-ফেস্টুন দেখা যায়।
শুধুমাত্র রাজধানী তেহরানেই এক কোটির বেশি মানুষের সমাগম হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে পদদলিত হওয়ার ঝুঁকি থাকায় জারি রয়েছে কঠোর নিরাপত্তা সতর্কতা। তীব্র গরমের কারণে ইতোমধ্যে ৪ হাজারের বেশি মানুষ চিকিৎসাকেন্দ্রে সেবা নিয়েছেন, যদিও কোনো অপ্রীতিকর মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। শোকাতুরদের স্বস্তি দিতে কৃত্রিম উপায়ে পানি ছিটানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। খামেনির কফিনের পাশে তেহরান হামলায় নিহত তাঁর পরিবারের আরও চার সদস্যের কফিন রাখা হয়েছে, যার মধ্যে তাঁর এক বছর বয়সী নাতনি জাহরা মোহাম্মাদি গোলপায়েগানিও রয়েছে।
পশ্চিমা বিশ্বের সাথে আমৃত্যু সংঘাতের নীতি বজায় রাখা আলী খামেনি মধ্যপ্রাচ্যে গাজার হামাস, লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। সোমবার তেহরানের শোকযাত্রা শেষে মঙ্গলবার তাঁর মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে পবিত্র নগরী কোমে। এরপর বুধবার প্রতিবেশী দেশ ইরাকের শিয়া ধর্মীয় পবিত্র স্থানগুলোতে শ্রদ্ধা নিবেদনের পর, বৃহস্পতিবার তাঁর জন্মস্থান মাশহাদে দাফন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার মাধ্যমে এই দীর্ঘ শোকযাত্রার সমাপ্তি ঘটবে।
মনোয়ারুল হক/
