ইসলামী ব্যাংকে বায়তুল মালের নামে কোটি টাকার দলীয় চাঁদাবাজি, অনিচ্ছায় মিলছে বদলি ও হয়রানি

চট্টগ্রাম ব্যুরো, এবিসিনিউজবিডি, (২৩ জুন) : দেশের শীর্ষস্থানীয় ইসলামী ব্যাংকিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি-এর অভ্যন্তরে সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে ‘বায়তুল মাল’ বা দলীয় তহবিলের নামে কোটি কোটি টাকা জোরপূর্বক আদায়ের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে।

কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অভিযোগ, একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের মদদপুষ্ট অভ্যন্তরীণ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বছরের পর বছর ধরে এই অর্থ সংগ্রহ করা হচ্ছে। কেউ এই চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে বা গড়িমসি করলে তাকে মানসিক হয়রানি, লাঞ্ছনা এবং দূরবর্তী কোনো শাখায় শাস্তিমূলক বদলি (পানিশমেন্ট ট্রান্সফার) করা হচ্ছে।

সোমবার (২২ জুন) চট্টগ্রাম নগরীর কোতোয়ালি মোড়সংলগ্ন বাংলাদেশ ব্যাংকের আঞ্চলিক কার্যালয়ের সামনে চাকরিচ্যুত ব্যাংকারদের এক বিক্ষোভ ও মানববন্ধনে এই অনিয়মের চিত্র তুলে ধরা হয়। পাঁচটি ইসলামি ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তারা এই প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নেন।

পিয়নের হাতে তালিকার মাধ্যমে জিম্মি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা

মানববন্ধনে যোগ দেওয়া ইসলামী ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাঈদ উল্লাহ সাংবাদিকদের কাছে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বেতন হওয়ার দিনই একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা শাখা ব্যবস্থাপকের কক্ষে এসে অবস্থান নিতেন। এরপর ব্যবস্থাপকের পক্ষ থেকে সবার কাছে বার্তা পাঠানো হতো চাঁদা পরিশোধের জন্য। অফিস ছুটির আগে পিয়ন বা নিরাপত্তারক্ষীরা টেবিলে টেবিলে নির্ধারিত টাকার তালিকা নিয়ে হাজির হতেন। পদমর্যাদা অনুযায়ী প্রতি মাসে ১ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত এই চাঁদা নির্ধারণ করা হতো।

সাঈদ উল্লাহ অভিযোগ করেন, গত ৫ আগস্টের পর এই চাঁদাবাজির মাত্রা আরও বেড়ে যায় এবং এর প্রতিবাদ বা গড়িমসি করার কারণেই তাদের চাকরিচ্যুত হতে হয়েছে।

গোপন নথিতে কোটি টাকার ব্যাংক স্টেটমেন্ট ফাঁস

ভুক্তভোগীদের মতে, ধর্মীয় ভাবাবেগ ও গ্রাহক-নির্ভরতাকে পুঁজি করে গড়ে ওঠা এই ব্যাংকের ভেতরের চাঁদাবাজি দীর্ঘকাল ধরে ‘ওপেন সিক্রেট’ ছিল। তবে সম্প্রতি অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়েরের একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট এবং ব্যাংকিং খাতের কিছু অভ্যন্তরীণ নথি ফাঁসের পর বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে।

ফাঁস হওয়া নথির বরাত দিয়ে আন্দোলনকারীরা জানান, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জোনের ‘বায়তুল মাল’ পরিচালনার জন্য ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন তিন কর্মকর্তা—এসপিও আলতাফ উদ্দিন, এসএভিপি নাজিম উদ্দিন এবং এরশাদুল হকের নামে একটি যৌথ ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করা হতো। সেই অ্যাকাউন্টের ব্যাংক স্টেটমেন্টে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত মাত্র ১১ মাসেই ১ কোটি ৫৩ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে। যেখানে সাধারণ কর্মীদের কাছ থেকে ১ থেকে ৫ হাজার টাকা করে জমা নেওয়ার স্পষ্ট বিবরণ রয়েছে। এছাড়া, ‘ইসলাম প্রতিষ্ঠার কাজ’-এর অজুহাতে মোটরসাইকেল কেনার জন্য এবং সরাসরি রাজনৈতিক দলের ফান্ডে অর্থ স্থানান্তরের রসিদও পাওয়া গেছে।

প্রতিকারহীন সিন্ডিকেট ও সচেতন মহলের দাবি

ভুক্তভোগী ব্যাংকারদের দাবি, ব্যাংকের সব স্তরে ওই নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের অনুসারীরা প্রভাবশালী হওয়ায় সাধারণ কর্মীরা জিম্মি হয়ে পড়েছেন। এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করেও কোনো লাভ হয় না, উল্টো অভিযোগকারীর বিরুদ্ধেই নানামুখী বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ফলে চাকরি ও জীবনের নিরাপত্তার ভয়ে অনেকেই মুখ খুলতে সাহস পান না।

এ প্রসঙ্গে সাধারণ ব্যাংক কর্মকর্তা ও সচেতন মহল মনে করছেন, ধর্মীয় অনুভূতির অপব্যবহার করে কর্মজীবীদের কষ্টার্জিত অর্থ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ অনৈতিক। সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলটির নিজস্ব স্বচ্ছতার স্বার্থেই এই তহবিলের মোট পরিমাণ এবং ব্যয়ের খাতগুলো প্রকাশ্যে আনা উচিত। সেই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতের ভেতরে এ ধরনের জোরপূর্বক অর্থ আদায় বন্ধে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের (বাংলাদেশ ব্যাংক) কঠোর নজরদারি ও দ্রুত হস্তক্ষেপের দাবি জানানো হয়েছে।

মনোয়ারুল হক/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
ব্রেকিং নিউজ