মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি: আতঙ্ক কাটলেও ক্ষত শুকায়নি
নিজস্ব প্রতিবেদক (ঢাকা), এবিসিনিউজবিডি, (৯ এপ্রিল) : ৮ এপ্রিল দুপুর ১টা ৪৫ মিনিট। স্কুলের নিরাপত্তাকর্মীরা প্রধান ফটক খোলার প্রস্তুত নিচ্ছিলেন। কিছুক্ষণ পর বেজে উঠবে ছুটির ঘণ্টা। ভেতরে বেশ কয়েকজন অভিভাবক অপেক্ষায়। ঠিক ২টায় বেজে ওঠে ছুটির ঘণ্টা। কাঁধে ব্যাগ নিয়ে দল বেঁধে বের হচ্ছিল কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। স্কুল থেকে বের হওয়ার সময় অনেক শিশুই ঘুরে ফিরে তাকাচ্ছিল বিধ্বস্ত-পোড়া স্কুল ভবনের দিকে। সেই ‘হায়দার আলী’ ভবন, যেখানে বিমানবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়ে প্রাণ হারান ২৮ শিক্ষার্থীসহ ৩৭ জন।
ঘটনার প্রায় ৯ মাস পরও রাজধানীর উত্তরা দিয়াবাড়ীর সেই মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রাঙ্গণে দেখা গেছে বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার করুণ ক্ষতচিহ্ন। মর্মান্তিক ওই ঘটনায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে সে অর্থে আর আতঙ্ক নেই, কিন্তু কোথাও যেন তাদের সহপাঠী ও শিক্ষক হারানোর বেদনা রয়েই গেছে।
বুধবার (৮ এপ্রিল) ওই স্কুলে গেলে আলাপ হয় বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের সঙ্গে। তারা, ঘটনার পর অনেক দিন কেটে গেছে। ক্যাম্পাসে নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছে। তবে শিক্ষার্থীদের সবাই মর্মান্তিক এই ঘটনাটি জানে। আগের মতো তাদের মধ্যে আতঙ্ক নেই। তবে যারা মারা গেছেন, তাদের জন্য মনে এক ধরনের বেদনা রয়েছে। সেই শোক কাটেনি, হয়তো কোনো দিন কাটবেও না। প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে কাউন্সেলিংয়ের উদ্যোগটি শিক্ষার্থীদের খুব কাজে লেগেছে বলেও মন্তব্য করেন অভিভাবকরা।
গত বছরের ২১ জুলাই দিয়াবাড়ীতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রাঙ্গণে একটি প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান আছড়ে পড়ে বিধ্বস্ত হয়। এতে স্কুলের শিশুশিক্ষার্থীদের পাঠদান কক্ষ হায়দার আলী ভবন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভয়াবহ ওই ঘটনায় প্রশিক্ষণ বিমানের পাইলট, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীসহ ৩৭ জনের প্রাণহানি ঘটে। নিহতদের মধ্যে ছিলেন– ২৮ জন শিক্ষার্থী, ৩ জন অভিভাবক, ৩ জন শিক্ষক এবং স্কুলের ১ জন স্টাফ।
বুধবার মূল ফটক দিয়ে ভেতরে ঢুকে ক্যাম্পাস প্রাঙ্গণে যাওয়ার পথে বাঁ-দিকে চোখে পড়ে টিনের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা ক্ষতিগ্রস্ত হায়দার আলী ভবনটি। ভবনের পূর্ব পাশের অংশ ভাঙার কাজ চলছিল। ভবনের পেছনের অংশে থাকা কার্নিশ ভেঙে ফেলা হয়েছে। একই সঙ্গে পূর্বপাশের অংশ ভাঙার কাজও চলমান ছিল।
পাশের ফটকে দায়িত্বরত নিরাপত্তাকর্মী জানান, গত সপ্তাহ থেকে এই ভবন ভাঙার কাজ করছেন শ্রমিকরা। এটি ভেঙে আবার নতুন ভবন হবে বলে শুনেছেন তারা।
বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনার সময় শিক্ষার্থী ইকবাল হোসেন সৈকত নবম শ্রেণিতে পড়ত। এ বছর সে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী। সৈকত বলেছে, ‘আমাদের মধ্যে এখন আতঙ্ক নেই। তবে যারা নিহত হয়েছে, তাদের সবসময় এই প্রতিষ্ঠানের সবাই স্মরণ করে। আমাদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে, সেমিনারে, ওই ঘটনায় নিহত ও আহতদের জন্য দোয়া করা হয়। নিহতের স্মরণে সম্মান জানাতে ১ মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।’
আলাপকালে মাইলস্টোন কর্তৃপক্ষ জানায়, ক্ষতিগ্রস্ত হায়দার ভবন ভেঙে সেখানে নতুন করে ভবন তৈরি করা হবে। এই ভবনে যে যে ক্লাসগুলো পরিচালিত হতো, সেগুলো সরিয়ে ক্যাম্পাসের ৭ নম্বর ভবনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। নতুন ভবনে নিহত-আহতদের স্মরণে স্মৃতিস্তম্ভ বা এমন ধরনের কিছু নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে কর্তৃপক্ষের।
মাইলস্টোন কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের এক শিক্ষার্থীর মা মহুয়া বলেন, ‘এখন অনেকটাই স্বাভাবিক পরিস্থিতি রয়েছে। আগের মতো আর বাচ্চাদের মাঝে আতঙ্ক নেই। বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় আমার মেয়েও কিছুটা আতঙ্কগ্রস্ত হয়েছিল। তবে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে যে কাউন্সেলিং দেওয়া হয়েছে সেটি খুব কাজে লেগেছে। তবে যারা এই দুর্ঘটনায় মারা গেছেন, তারা সব সময় স্মরণীয় হয়ে থাকবেন, এই ঘটনা বা স্মৃতি ভোলার মতো নয়।’
বুধবার এ বিষয়ে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের জনসংযোগ কর্মকর্তা (পিআরও) শাহ বুলবুল বলেন, ‘মাইলস্টোনের শিক্ষার্থীরা এখন সম্পূর্ণ স্বাভাবিক রয়েছে। তাদের মধ্যে কোনো ধরনের ট্রমা বা আতঙ্ক আর নেই। এখন শিক্ষার্থীরা পড়ায় মনোযোগী হয়েছে।’ সৌজন্যে: খবরের কাগজ
মনোয়ারুল হক/
