লেবাননে নজিরবিহীন হামলা ইসরায়েলের

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, এবিসিনিউজবিডি, (৯ এপ্রিল) : লেবাননের রাজধানী বৈরুতে ভয়াবহ বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। ১০ মিনিটেরও কম সময়ে ১০০টি বিমান হামলা চালানো হয়। দেশটির কর্তৃপক্ষের মতে শত শত মানুষ হতাহত হয়েছে।

এই হামলাকে সাম্প্রতিক ইতিহাসে নজিরবিহীন বলা হচ্ছে। সম্ভবত ১৯৮২ সালে ইসরায়েলের লেবানন আগ্রাসনের পর এমন বড় আকারের আক্রমণ আর দেখা যায়নি। বিমান হামলাগুলোর বেশির ভাগই বৈরুতের এমন এলাকায় আঘাত হানে, যেগুলো সাধারণত হিজবুল্লাহ-সংশ্লিষ্ট নয়।

ইরান যুদ্ধ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সমালোচকরা তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। শীর্ষ রাজনৈতিক নেতারা প্রকাশ্যে তাকে ‘মিথ্যাবাদী’ ও ‘ভীতু’ বলেও আখ্যা দিচ্ছেন। এই পরিস্থিতিতে আবারও সামনে চলে এসেছে লেবানন ফ্রন্ট। ইসরায়েলিদের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ইরান যুদ্ধের তুলনায় এই ফ্রন্টে তাদের ক্ষয়ক্ষতি বেশি হয়েছে। ফলে কোনো চাপ ছাড়াই হঠাৎ করে এই যুদ্ধ শেষ করা রাজনৈতিকভাবে বড় ধাক্কা হতে পারে।

এই কারণেই ইসরায়েল সরকার ও সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, তারা হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে হামলা আরও বাড়াবে এবং ইরান ও লেবাননের যুদ্ধফ্রন্টকে একসঙ্গে জড়িয়ে ফেলার ধারণা তারা মেনে নেবে না। ইসরায়েল চায়, লেবানন যুদ্ধ কীভাবে শেষ হবে, তা তারা নিজেরাই নির্ধারণ করবে। কারণ ইরান ফ্রন্টে তাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ তুলনামূলকভাবে কম ছিল।

এরই মধ্যে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর হামলা স্থগিতের যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা তারা সমর্থন করে। তবে এই দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির আওতায় লেবানন পড়বে না। অর্থাৎ, ইসরায়েলের চলমান সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকবে।

বুধবার (৮ এপ্রিল) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া বিবৃতিতে নেতানিয়াহু বলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের সেই প্রচেষ্টাকে ইসরায়েল সমর্থন করে, যার লক্ষ্য হলো ‘ইরান যেন আর যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল, আরব প্রতিবেশী দেশগুলো এবং বিশ্বের জন্য পারমাণবিক, ক্ষেপণাস্ত্র ও সন্ত্রাসী হুমকি হয়ে না থাকে’। তবে তিনি স্পষ্ট করে দেন, এই দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ‘লেবাননকে অন্তর্ভুক্ত করে না’।

এর আগে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ ঘোষণা করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও তাদের মিত্ররা ‘লেবাননসহ সর্বত্র অবিলম্বে যুদ্ধবিরতিতে’ সম্মত হয়েছে। তিনি বলেন, এ সিদ্ধান্ত ‘তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর’। অন্যদিকে লেবাননের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা জানায়, দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলি বাহিনী হামলা অব্যাহত রেখেছে। তারা টায়ার অঞ্চলের স্রিফা শহরে বোমা হামলা চালিয়েছে এবং আশপাশের একটি ভবন থেকে লোকজন জন্য সরিয়ে নেওয়ার সতর্কতা জারি করেছে।

লেবাননের সেনাবাহিনীও বুধবার নাগরিকদের দক্ষিণাঞ্চলে ফিরে না যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। এক বিবৃতিতে তারা বলে, ‘আঞ্চলিক পরিস্থিতি এবং যুদ্ধবিরতির গুজবের মধ্যে নাগরিকদের অনুরোধ করা হচ্ছে দক্ষিণের গ্রাম ও শহরে ফেরার আগে অপেক্ষা করতে এবং যেখানে ইসরায়েলি বাহিনী অগ্রসর হয়েছে, সেই এলাকাগুলোর কাছাকাছি না যেতে। কারণ সেখানে এখনো হামলার ঝুঁকি রয়েছে।’

গত ২ মার্চ থেকে লেবানন এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, যখন ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের ওপর হামলা শুরু করে। তারা দাবি করে, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধের প্রথম দিন ইসরায়েলের হাতে আলি খামেনি নিহত হওয়ার প্রতিশোধ হিসেবেই এই হামলা চালানো হয়েছে। পাশাপাশি ২০২৪ সালের নভেম্বরের যুদ্ধবিরতি বারবার লঙ্ঘনের অভিযোগও তোলে তারা।

এ যুদ্ধবিরতিটি হয়েছিল ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া গাজা যুদ্ধের পর এক বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা সীমান্ত সংঘর্ষের পর। লেবাননের কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২ মার্চ থেকে ইসরায়েলের হামলায় প্রায় দেড় হাজার মানুষ নিহত হয়েছে এবং প্রায় ১২ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। একই সঙ্গে ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননে স্থল অভিযানও শুরু করেছে এবং ‘বাফার জোন’ তৈরির জন্য আরও এলাকা দখলের লক্ষ্য জানিয়েছে।

নেতানিয়াহুর ঘোষণার বিষয়ে এখনো হিজবুল্লাহ বা লেবানন সরকারের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। বৈরুত থেকে আল জাজিরার সাংবাদিক জেইনা খোদর জানিয়েছেন, ইরানের পক্ষে যুদ্ধে যোগ দেওয়ার ফলে সংঘাত আরও বিস্তৃত হয়েছে এবং ইসরায়েলকে একাধিক ফ্রন্টে ব্যস্ত করে ফেলেছে।

তার মতে, হিজবুল্লাহ মনে করে যে, এ যুদ্ধে অংশ নিলে সম্ভাব্য আলোচনায় তাদের রাজনৈতিক প্রভাব বাড়বে। কারণ ২০২৪ সালের যুদ্ধবিরতির শর্ত বাস্তবায়নে ব্যর্থতার জন্য তারা লেবানন সরকারকে সমালোচনা করে আসছে।

খোদর আরও বলেন, ইসরায়েল এখনো দক্ষিণ লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহার করেনি, বন্দিদের মুক্তি দেয়নি এবং বাস্তুচ্যুতদের ঘরে ফেরার সুযোগ দেয়নি। এখন মূল প্রশ্ন হলো, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আসন্ন আলোচনায় ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ সংঘাতের বিষয়টি উঠবে কি না। লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালাম মনে করেন, দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহ যে সামরিক অভিযান চালাচ্ছে, তার পেছনে ইরানের ভূমিকা রয়েছে। তাই আগামী দুই সপ্তাহের আলোচনা লেবাননের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে যাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত খোদরের ভাষায়, ইসরায়েল চায় নিরাপত্তা নিশ্চয়তা, যা লেবানন সরকার বা রাষ্ট্রের পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়। সূত্র: আল-জাজিরা

মনোয়ারুল হক/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
ব্রেকিং নিউজ