তাহসিফ হত্যা মামলায় দীপ ৪ দিনের রিমান্ডে
নিজস্ব প্রতিবেদক, এবিসিনিউজবিডি, ঢাকা (৩১ অক্টোবর): বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা কে এম তাহসিফ সৌরি হত্যা মামলার সন্দেহভাজন আসামি আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে চার দিনের রিমান্ডে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। শনিবার (৩১ অক্টোবর) শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত এ আদেশ দেন। তবে চাঞ্চল্যকর এই রিমান্ড শুনানিতে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা জামিন আবেদন না করে বরং মামলার সঠিক তদন্তের স্বার্থে ‘সতর্কতার সঙ্গে’ জিজ্ঞাসাবাদের বিশেষ আবেদন জানান।
দুপুর সোয়া দুইটার দিকে অভিযুক্ত দীপকে এজলাসে হাজির করা হয়। মামলার নিবিড় তদন্ত নিশ্চিত করতে নৌ-পুলিশের টঙ্গী ফাঁড়ির পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিন তার বিরুদ্ধে সাত দিনের রিমান্ডের আবেদন দাখিল করেন। বেলা তিনটার পরপরই বিচারক কার্যক্রম শুরু করেন।
এ সময় তদন্ত কর্মকর্তা রিমান্ড চাওয়ার যৌক্তিক কারণগুলো আদালতের সামনে তুলে ধরেন। রাষ্ট্রপক্ষের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর আজিজুল হক দিদার রিমান্ডের পক্ষে জোর সওয়াল করেন।
অন্যদিকে, আসামির পক্ষে আইনি লড়াই করেন আইনজীবী মনিরুল ইসলাম ও মুতাসিম বিল্লাহ। আদালতে তারা জানান, নিহত ব্যক্তির সঙ্গে দীপের দীর্ঘ ছয় বছরের সুসম্পর্ক ছিল। ইতোমধ্যে তিনি দুই দিন ধরে পুলিশি হেফাজতে রয়েছেন। মামলার মূল রহস্য উদ্ঘাটনের প্রয়োজনে রিমান্ডে নেওয়ার প্রয়োজন হলে তাদের কোনো আপত্তি নেই, তবে জিজ্ঞাসাবাদ যেন অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সম্পন্ন করা হয়।
আইনজীবীরা আরও অভিযোগ করেন যে, তারা বর্তমানে মিডিয়া ট্রায়ালের শিকার হচ্ছেন। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আদালত চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
আদেশ দেওয়ার সময় আদালত উল্লেখ করেন, আসামির জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য চার দিন পুলিশ রিমান্ড মঞ্জুর করা হলো। পরে কড়া নিরাপত্তা বলয়ের মধ্য দিয়ে তাকে পুনরায় হাজতখানায় ফিরিয়ে নেওয়া হয়।
রিমান্ড আবেদনে তদন্ত কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, নিহত তাহসিফ সৌরি বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা ছিলেন এবং তুরাগের ১৮ নম্বর সেক্টরের একটি ফ্ল্যাটে বসবাস করতেন। গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যা ৬টার দিকে আসামি আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপ তাকে বাসা থেকে ডেকে বাইরে নিয়ে যান এবং এরপর থেকেই তিনি নিখোঁজ ছিলেন।
পরদিন ২৮ অক্টোবর বিকেলে জরুরি সেবা ‘৯৯৯’-এর কল পেয়ে উত্তরখানের রাজাবাড়ী ঘাট সংলগ্ন তুরাগ নদী থেকে একটি ভাসমান মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। সুরতহাল করার সময় পকেটে থাকা মোবাইল ফোনের মাধ্যমে নিহতের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়।
পরবর্তীতে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় জানা যায়, ঘটনার দিন তাহসিফকে টঙ্গী পশ্চিম থানার মাজার বস্তি এলাকায় নিয়ে গিয়েছিলেন দীপ। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে দীপ জানান, নিহত সৌরি তার সিনিয়র ভাই ছিলেন।
আবেদনে আরও বলা হয়, প্রাথমিক অনুসন্ধানে এই হত্যাকাণ্ডে দীপের সরাসরি সংশ্লিষ্টতার জোরালো প্রমাণ পাওয়া গেছে। মামলার তদন্তে অগ্রগতি আনা এবং আসামি যেন জামিনে মুক্ত হয়ে তদন্ত কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করতে না পারেন, সেজন্য তাকে রিমান্ডে নেওয়া জরুরি।
যে কারণে রিমান্ড মঞ্জুরের আবেদন করা হয়:
- হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের মূল রহস্য ও কারণ (মোটিভ) উদ্ঘাটন।
- ঘটনার সাথে জড়িত অন্যান্য অজ্ঞাতনামা আসামিদের শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনা।
- হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত আলামত ও মামলার সাথে সংশ্লিষ্ট প্রয়োজনীয় সাক্ষ্যপ্রমাণ উদ্ধার।
- নিহত সাবেক কর্মকর্তার ব্যক্তিগত মোটরসাইকেলটি খুঁজে বের করা।
- অপরাধ সংঘটনের মূল স্থান বা স্পট নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা।
উল্লেখ্য, গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় জুনিয়র বন্ধু দীপের ডাকে বাসা থেকে বের হয়ে রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হন সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সৌরি। পরদিন বিকেলে তুরাগ নদ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে নৌ-পুলিশ।
এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে গত শুক্রবার রাত ১টা ৫ মিনিটে রাজধানীর উত্তরখান থানায় মামলা দায়ের করেন নিহতের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম। পরবর্তী সময়ে পুলিশ দীপকে এই মামলায় সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার দেখায়।
এজহারে বাবা উল্লেখ করেন, ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যার পর দীপ নামের এক জুনিয়রের ফোন পেয়ে তাহসিফ বাসা থেকে বের হন। রাত গভীর হলেও না ফেরায় মা বারবার যোগাযোগ করলে তিনি দ্রুত ফিরে আসার কথা জানান। এরপর রাত ১টা ৩৫ মিনিটে মেসেঞ্জারের ভয়েস বার্তায় তিনি জানান যে তিনি রওনা হয়েছেন। কিন্তু পরদিন বিকেল গড়ালেও তিনি ফেরেননি।
২৮ অক্টোবর বিকেলে উত্তরখানের নৌ-পুলিশ ফোন করে রাজাবাড়ী ঘাট সংলগ্ন তুরাগ নদ থেকে মরদেহ উদ্ধারের খবর জানায়। পরবর্তীতে শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে ২৯ অক্টোবর দুপুরে পরিবারের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হয়। ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে ওই দিন বিকেলে উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টর কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
মনোয়ারুল হক/
