পলায়ন ও অসদাচরণের ঘটনায় ৭ পুলিশ কর্মকর্তার চাকরি গেল
নিজস্ব প্রতিবেদক, এবিসিনিউজবিডি, ঢাকা (৩১ অক্টোবর): দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকা, সরকারি নির্দেশ অমান্য করা এবং অসদাচরণের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে পুলিশের ৭ জন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে সরকার। এর মধ্যে ছয়জনকে চাকরি থেকে সরাসরি বরখাস্ত করা হয়েছে এবং অন্য একজনকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। বরখাস্তকৃতদের তালিকায় রয়েছেন ডিআইজি, অতিরিক্ত ডিআইজি, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও সহকারী পুলিশ কমিশনার পদমর্যাদার বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শৃঙ্খলা-১ ও শৃঙ্খলা-২ শাখা থেকে জারিকৃত পৃথক প্রজ্ঞাপন এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি পর্যালোচনা করে এসব তথ্য জানা গেছে। ‘সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮’ অনুযায়ী বিভাগীয় তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া, বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) পরামর্শ এবং রাষ্ট্রপতির সুনির্দিষ্ট অনুমোদনের পর এই শাস্তিমূলক পদক্ষেপ কার্যকর করা হয়।
শাস্তির মুখে পড়া কর্মকর্তারা হলেন— সাবেক ডিআইজি মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ, সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি শ্যামল কুমার মুখার্জী, সাবেক ডিআইজি মো. আনিসুর রহমান, সাবেক সহকারী পুলিশ কমিশনার ফারহানা তাসকিন, সাবেক সহকারী পুলিশ কমিশনার মো. মনিরুজ্জামান সরকার এবং সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এস এম জাহাঙ্গীর হাছান। এছাড়া সহকারী পুলিশ কমিশনার কাজী মিজানুর রহমানকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়েছে।
বিদেশে গিয়ে আর ফেরেননি দুই কর্মকর্তা
বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে ফারহানা তাসকিন ও মো. মনিরুজ্জামান সরকারের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন বিদেশে অবস্থান করে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
ডিএমপির প্রশাসন-ট্রাফিক উত্তর বিভাগের সহকারী পুলিশ কমিশনার ফারহানা তাসকিন স্বামীর সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে ২০১৮ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ৪২ দিনের বহিঃবাংলাদেশ ছুটি নিয়ে কানাডায় যান। পরবর্তীতে অসুস্থতার অজুহাত দেখিয়ে আরও ৩৬ দিনের ছুটি বাড়ানোর আবেদন করেন তিনি। এরপর কানাডার একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তিন বছর মেয়াদি সিপিএ কোর্সে অধ্যয়নের জন্য শিক্ষাছুটির আবেদন করলেও মন্ত্রণালয় তা নাকচ করে অবিলম্বে দেশে ফিরে কাজে যোগ দেওয়ার নির্দেশ দেয়। তবে তিনি আর ফেরেননি।
প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়, ২০১৮ সালের ২৮ মার্চ ছুটি শেষ হওয়ার পর তিনি আর কর্মস্থলে যোগ দেননি। তার বিরুদ্ধে ২০২৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয় এবং তদন্তে পলায়নের অভিযোগ প্রমাণিত হয়। দ্বিতীয় কারণ দর্শানোর নোটিশের কোনো জবাব না দেওয়ায় পিএসসির পরামর্শ ও রাষ্ট্রপতির অনুমোদনে ২০১৮ সালের ২৮ মার্চ থেকেই তাকে বরখাস্ত করা হয়।
অন্যদিকে, ডিএমপির সাবেক সহকারী পুলিশ কমিশনার মো. মনিরুজ্জামান সরকার যুক্তরাজ্যের কিংস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ে অপরাধবিজ্ঞানে পিএইচডি অর্জনের জন্য ২০১২ সালে প্রেষণে যান। পরবর্তীতে বেশ কয়েক দফায় তার বিনা বেতনে ছুটি বাড়ানো হলেও সর্বশেষ ২০১৯ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২১ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত আরও দুই বছরের ছুটির আবেদন করলে তা নাকচ করা হয় এবং তাকে দেশে ফিরে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয়। নির্দেশনা অমান্য করে তিনিও দেশে ফেরেননি।
২০২০ সালের ৫ অক্টোবর তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হলে তদন্তে অসদাচরণ ও পলায়নের অভিযোগ প্রমাণিত হয়। দ্বিতীয় কারণ দর্শানোর নোটিশের জবাব না দেওয়া এবং পিএসসির পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতির অনুমোদন সাপেক্ষে ২০১৯ সালের ১ জুলাই থেকে তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়।
কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন তিন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা
ডিআইজির পদমর্যাদার কর্মকর্তারা কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকায় তাদের বিরুদ্ধেও নেওয়া হয়েছে কঠোর ব্যবস্থা। ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) হিসেবে কর্মরত ছিলেন ডিআইজি মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ। ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট থেকে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কোনো ধরনের অনুমতি ছাড়াই তিনি কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন। তার বর্তমান, স্থায়ী ঠিকানা ও ই-মেইলে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি কর্মস্থলে ফেরেননি।
এ ঘটনায় ২০২৬ সালের ১৫ এপ্রিল বিভাগীয় মামলা করা হলে তদন্তে পলায়নের অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়। দ্বিতীয় কারণ দর্শানোর নোটিশের জবাব না দেওয়ায় রাষ্ট্রপতির অনুমোদন ও পিএসসির পরামর্শক্রমে ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট থেকে তাকে বরখাস্ত করা হয়।
সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি শ্যামল কুমার মুখার্জী সর্বশেষ ট্যুরিস্ট পুলিশে কর্মরত ছিলেন। ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি তাকে রাজশাহীতে রেঞ্জ ডিআইজির কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়। ২২ জানুয়ারি সেখানে যোগদানের পর একই দিন তিন সপ্তাহের বিশ্রামের কথা উল্লেখ করে প্রস্থান প্রতিবেদন জমা দিলেও নির্ধারিত সময় শেষে তিনি আর কর্মস্থলে ফেরেননি। ২০২৫ সালের ৩ জুলাই তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা রুজু করা হয় এবং তদন্তে পলায়নের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ২০২৫ সালের ২২ জানুয়ারি থেকে তাকে বরখাস্ত করা হয়।
অপরদিকে, রাজশাহী রেঞ্জের সাবেক ডিআইজি মো. আনিসুর রহমান ২০২৪ সালের ২৭ আগস্ট নৌ পুলিশে সংযুক্ত হয়ে যোগদান করেন। অসুস্থতার কথা বলে ২০২৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি একটি প্রতিবেদন জমা দিলেও তাতে ছুটির ধরন, মেয়াদ ও অবস্থানের সুনির্দিষ্ট স্থান উল্লেখ করেননি এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও জমা দেননি। একাধিকবার নোটিশ পাঠানোর পরও কর্মস্থলে যোগ না দেওয়ায় অসদাচরণ ও পলায়নের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়। তদন্তে উভয় অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় পিএসসির পরামর্শ ও রাষ্ট্রপতির অনুমোদনে ২০২৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়।
ছুটি শেষে ফেরেননি অতিরিক্ত পুলিশ সুপার
নৌ পুলিশের টাঙ্গাইল অঞ্চলে কর্মরত ছিলেন সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এস এম জাহাঙ্গীর হাছান। ১৫ দিনের বহিঃবাংলাদেশ ছুটি নিয়ে ২০২৪ সালের ৮ অক্টোবর তিনি কর্মস্থল ত্যাগ করেন। পরবর্তীতে আরও ৬০ দিনের ছুটি বৃদ্ধির আবেদন নাকচ হওয়া সত্ত্বেও তিনি কর্মস্থলে যোগ দেননি। পলায়নের অভিযোগে বিভাগীয় মামলা দায়েরের পর তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় পিএসসির পরামর্শ ও রাষ্ট্রপতির অনুমোদনক্রমে ২০২৪ সালের ২৩ অক্টোবর থেকে তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে।
অসদাচরণের দায়ে সহকারী পুলিশ সুপারের বাধ্যতামূলক অবসর
অন্য একটি ঘটনায় সিআইডির দিনাজপুর জেলায় কর্মরত সহকারী পুলিশ সুপার কাজী মিজানুর রহমানকে সরাসরি বরখাস্ত না করে বাধ্যতামূলক অবসর প্রদান করা হয়েছে। এর আগে তিনি ডিএমপির তেজগাঁও ট্রাফিক জোনে সহকারী পুলিশ কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
বিভাগীয় মামলার অভিযোগে বলা হয়, ২০২২ সালের এপ্রিল মাসে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের এক কনস্টেবলের স্ত্রীর সঙ্গে ফেসবুকের মাধ্যমে তার পরিচয় হয়। পরবর্তীতে ওই নারীর সঙ্গে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় দায়েরকৃত আদালতের পর্যবেক্ষণেও তাদের স্বেচ্ছায় শারীরিক সম্পর্কের বিষয়টি উঠে আসে মর্মে বিভাগীয় নথির সারসংক্ষেপে উল্লেখ করা হয়েছে।
একজন পুলিশ কর্মকর্তার এমন বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে পুরো বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়েছে বলে বিভাগীয় তদন্তে প্রতীয়মান হয়। ‘সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮’-এর ৩(খ) বিধি অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগ আনা হয়। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর তাকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। পিএসসির পরামর্শ এবং রাষ্ট্রপতির গত ২৫ অক্টোবরের অনুমোদনের পর এই সংক্রান্ত আদেশ জারি করা হয়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এসব প্রজ্ঞাপনে রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে স্বাক্ষর করেছেন সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী। সংশ্লিষ্ট অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে গৃহীত শাস্তিমূলক এই আদেশগুলো অবিলম্বে কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মনোয়ারুল হক/
