তাহসিফের মৃত্যু: অজ্ঞাতনামাদের আসামি করে হত্যা মামলা
নিজস্ব প্রতিবেদক, এবিসিনিউজবিডি, ঢাকা (৩১ অক্টোবর): বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সৌরির রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন তার বাবা কে এম এনায়েতুল করিম।
আজ শনিবার (৩১ অক্টোবর) সকালে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন উত্তরখান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হাবিব। তিনি জানান, তাহসিফের বাবা বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেই মূলত মামলাটি করেছেন। এ বিষয়ে বিস্তারিত অন্যান্য তথ্য নৌ পুলিশের কাছ থেকে সংগ্রহ করার পরামর্শ দেন তিনি।
গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যার দিকে রাজধানীর উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের নিজ বাসা থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হন তাহসিফ। পরিবারের ভাষ্যমতে, তার জুনিয়র বন্ধু দীপের ডাকে সাড়া দিয়ে বাসা থেকে বের হয়েছিলেন তিনি। ওই দিন সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে রাজউক উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের গ্যারেজের সামনে সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে তাহসিফ ও দীপকে একসঙ্গে দেখা যায়। সেখানে তারা কুশল বিনিময় ও হাত মেলানোর পর ভিন্ন দুটি মোটরসাইকেলে করে গন্তব্যে রওনা হন।
পরিবারের কাছে দীপ দাবি করেছিলেন, তাহসিফের মোটরসাইকেলে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেওয়ায় তারা একটি ওয়ার্কশপে গিয়েছিলেন। সেখানে কাজ শেষে একসঙ্গে খাবার খেয়ে তিনি নিজের মতো চলে যান। তবে সেই রাতের চলাফেরা এবং পারস্পরিক যোগাযোগ নিয়ে পরবর্তী সময়ে নানা প্রশ্ন ও তদন্ত শুরু হয়।
ঘটনার পরদিন অর্থাৎ ২৮ অক্টোবর বিকেল সাড়ে সাড়ে চারটার দিকে তুরাগ নদে একটি মরদেহ ভেসে ওঠার খবর পায় পুলিশ। পরে টঙ্গী নদী পুলিশ ফাঁড়ির কর্মীরা রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে মরদেহটি উদ্ধার করেন। নিহতের হাতে থাকা ঘড়ি এবং পকেটে পাওয়া আইফোনের সূত্র ধরেই তার পরিচয় নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হয়। পরদিন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টরের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে জানাজা সম্পন্ন হয় এবং পরে ১২ নম্বর সেক্টরের কবরস্থানে তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়।
এদিকে ঘটনার তদন্তে নেমে গত ২৯ অক্টোবর গভীর রাতে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাবর রোডের একটি বাসা থেকে তাহসিফের জুনিয়র বন্ধু দীপকে নিজেদের হেফাজতে নেয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পরবর্তীতে ৩০ অক্টোবর শুক্রবার তাকে সঙ্গে নিয়ে টঙ্গীর তুরাগ নদসংলগ্ন মাজার বস্তি এলাকায় অভিযান চালায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। দীপের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ওই এলাকা থেকে নম্বরপ্লেটবিহীন একটি কালো রঙের সুজুকি জিক্সার ১৫০ সিসি মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়।
পিবিআইয়ের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে দীপ দাবি করেন, ঘটনার রাতে তারা উভয়েই তুরাগ নদসংলগ্ন এলাকায় গিয়েছিলেন। সেখানে অজ্ঞাতনামা কিছু লোক তাদের ধাওয়া করলে প্রাণভয়ে তাহসিফ নদীতে ঝাঁপ দেন। তবে দীপের এই দাবির সত্যতা এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। পুলিশ তার দেওয়া তথ্যের নানা অসংগতি খতিয়ে দেখে এবং ঘটনাস্থল থেকে সংগৃহীত আলামত নৌ পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে। পরবর্তীতে দীপকেও নৌ পুলিশের জিম্মায় সোপর্দ করা হয়।
ছেলের মর্মান্তিক মৃত্যুর পর শুরু থেকেই এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে দাবি করে আসছেন বাবা কে এম এনায়েতুল করিম। তার জোরালো যুক্তি হলো, তাহসিফ ভালোমতো সাঁতার জানতেন; তাই নিছক নদীতে ঝাঁপ দেওয়ার ফলে তার মৃত্যু হয়েছে—এমন তত্ত্ব নিয়ে তিনি তীব্র সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।
মূলত কী কারণে এবং কাদের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনায় এই মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটেছে, তা এখন পুলিশ ও তদন্তকারী সংস্থার প্রধান আলোচনার বিষয়। নিহতের বাবার দায়ের করা এই হত্যা মামলার মাধ্যমে চাঞ্চল্যকর এই ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটন হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা প্রকাশ করছেন।
নৌ পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. রেজাউল করিম গণমাধ্যমকে জানান, দক্ষিণখান থানায় তাহসিফ সৌরির বাবা বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা রেকর্ড করেছেন। মামলায় নির্দিষ্ট কাউকে না করে অজ্ঞাতনামাদের আসামি করা হয়েছে। এজাহারে বাবা উল্লেখ করেছেন যে দীপ তাকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে গিয়েছিলেন, তবে সরাসরি এই মামলায় দীপকে আসামি করা হয়নি।
তিনি আরও যোগ করেন যে, দীপ বর্তমানে তাদের নিবিড় হেফাজতে রয়েছেন এবং তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তাকে এখনো দক্ষিণখান থানায় হস্তান্তর বা মামলায় আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার দেখানো হয়নি। তবে তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য ও সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্টতার সত্যতা মিললে তাকে এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হতে পারে বলেও জানান এই কর্মকর্তা।
মনোয়ারুল হক/
