তাহসিফের বন্ধুকে নৌ পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছে পিবিআই

নিজস্ব প্রতিবেদক, এবিসিনিউজবিডি, ঢাকা (৩১ অক্টোবর): বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় তার ঘনিষ্ঠ ‘জুনিয়র বন্ধু’ দীপকে নৌ পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। নিখোঁজ হওয়ার আগের রাতে তাহসিফের সঙ্গে দীর্ঘ প্রায় ছয় ঘণ্টা সময় কাটিয়েছিলেন এই দীপ। গত বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) গভীর রাতে রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকার বাবর রোডের বি ব্লকের একটি বাসা থেকে তাকে নিজেদের হেফাজতে নেয় পিবিআই।

পরদিন শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) দীপকে সঙ্গে নিয়ে টঙ্গীর তুরাগ নদসংলগ্ন মাজার বস্তি এলাকার ঘটনাস্থল সরেজমিন পরিদর্শন করে তদন্ত দল এবং বিভিন্ন তথ্য যাচাই-বাছাই করা হয়। পরে মধ্যরাতে পিবিআইয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা গণমাধ্যমের কাছে বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

পুলিশের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, বৃহস্পতিবার রাতে মোহাম্মদপুরের বাবর রোডের বি ব্লকের একটি আবাসিক ভবনের তৃতীয় তলা থেকে দীপকে আটক করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। আটক দীপ ওই এলাকার বাসিন্দা সেলিম রেজার সন্তান।

ঘটনাস্থলে দীপের দেখানো তথ্য যাচাই ও মোটরসাইকেল উদ্ধার

শুক্রবার সকালে দীপকে নিয়ে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকার তুরাগ নদসংলগ্ন ঘটনাস্থলে যায় পিবিআইয়ের তদন্ত দল। সেখানে ২৯ নম্বর সীমানা পিলার সংলগ্ন মাঠে ঠিক কী ঘটেছিল, সে বিষয়ে তাকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ওই এলাকা থেকে একটি নম্বরপ্লেটবিহীন কালো রঙের সুজুকি জিক্সার ১৫০ সিসির মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারকৃত ওই মোটরসাইকেলটি আসলেই তাহসিফের কি না, তা নিশ্চিত করতে গাড়ির কাগজপত্র ও অন্যান্য দালিলিক প্রমাণাদি যাচাই করা হচ্ছে।

পিবিআইকে দীপ দাবি করেন, ঘটনার রাতে তিনি ও তাহসিফ দুজনে মিলে টঙ্গীর তুরাগ নদসংলগ্ন মাজার বস্তি এলাকায় গিয়েছিলেন। সেখানে কথা বলার সময় হঠাৎ করে অচেনা কয়েকজন লোক তাদের ধাওয়া করেন। দীপের ভাষ্য অনুযায়ী, ধাওয়াকারীদের মধ্যে অন্তত দুজনের গায়ে পুলিশের পোশাক বা ইউনিফর্ম ছিল। তাদের দেখেই তাহসিফ ভয় পেয়ে দৌড়াতে শুরু করেন এবং একপর্যায়ে নদীতে ঝাঁপ দেন। অন্যদিকে, দীপ নিজে বিআইডব্লিউটিএর ২৯ নম্বর সীমানা পিলারের আড়ালে আত্মগোপন করে পরে সেখান থেকে চলে আসেন।

তবে ধাওয়া করা ব্যক্তিরা আদৌ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ছিলেন কি না, সে বিষয়ে এখনও নিশ্চিত হতে পারেনি পিবিআই। পিবিআই ঢাকা মেট্রো উত্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. এনায়েত হোসেন মান্নান শুক্রবার গণমাধ্যমকে জানান, দীপের দেওয়া তথ্যগুলো অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। সেখানে আদৌ পুলিশের কেউ বা ইউনিফর্ম পরা কোনো ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন কি না কিংবা তাদের কোনো সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, দীপের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বেশ কিছু অসংগতি ধরা পড়েছে। তারা কেন ওই রাতে ওই মাঠে গিয়েছিলেন, সে বিষয়ে দীপ বিভিন্ন সময়ে একেক রকমের তথ্য দিয়েছেন। এমনকি একপর্যায়ে তিনি সেখানে যাওয়ার কথা অস্বীকারও করেন। পরবর্তীতে মোটরসাইকেলের অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি জানান, তাহসিফ নিজেই তাকে মোটরসাইকেলে করে সেখানে নিয়ে গিয়েছিলেন এবং ওই এলাকাটি আগে থেকে তার কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত ছিল।

পাশাপাশি, ঘটনার রাতে তাদের সঙ্গে অন্য কোনো তৃতীয় ব্যক্তি বা কোনো নারী উপস্থিত ছিলেন কি না, সে বিষয়েও কোনো স্পষ্ট তথ্য মেলেনি। নিহত তাহসিফের মোবাইল ফোন এবং হোয়াটসঅ্যাপের কললিস্ট ও মেসেজগুলো আধুনিক ফরেনসিক প্রযুক্তির সহায়তায় বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। পিবিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৭ অক্টোবর রাত সাড়ে ১২টা পর্যন্ত দ্বীপের সঙ্গে তাহসিফের মোবাইল ও হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে প্রায় ১০ থেকে ১২ বার যোগাযোগ হয়েছিল।

নম্বরপ্লেটবিহীন মোটরসাইকেল উদ্ধার ও তদন্তের অগ্রগতি

শুক্রবার সকালে টঙ্গী পশ্চিম থানার মাজার বস্তি সংলগ্ন তুরাগ নদীর তীরবর্তী একটি মাঠ থেকে নম্বরপ্লেটবিহীন কালো রঙের সুজুকি জিক্সার ১৫০ মোটরসাইকেলটি জব্দ করে পিবিআই। যেখান থেকে মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল, তার চেয়ে প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার দূরে এই মোটরসাইকেলটির সন্ধান মেলে। দীপের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই এটি উদ্ধার করা হয়েছে বলে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তবে এর আসল মালিকানা নিশ্চিত করতে গাড়ির কাগজপত্রের পাশাপাশি ইঞ্জিন ও চেসিস নম্বর যাচাই করা হচ্ছে।

পিবিআই জানিয়েছে, এই হত্যাকাণ্ডের মূল তদন্তের দায়িত্ব পালন করছে নৌ পুলিশ। তবে ঘটনাটির গুরুত্ব বিবেচনা করে পিবিআই ছায়া তদন্তের মাধ্যমে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও তা যাচাই করেছে। পরবর্তীতে তদন্তে প্রাপ্ত সব তথ্য নৌ পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

যেভাবে নিখোঁজ হন সাবেক এই কর্মকর্তা

গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যার দিকে রাজধানীর উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টরের নিজস্ব বাসা থেকে বের হন সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরি। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্যমতে, দীপের অনুরোধ বা ডাকে সাড়া দিয়েই তিনি বাসা থেকে বের হয়েছিলেন। এর আগে সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে রাজউক উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের একটি গ্যারেজের সামনে সিসিটিভি ফুটেজে তাহসিফ ও দীপকে একসঙ্গে দেখা যায়। সেখানে তারা কুশল বিনিময় বা হাত মেলানোর পর দুটি ভিন্ন মোটরসাইকেলে করে আলাদাভাবে চলে যান।

পরিবারের কাছে দীপ দাবি করেছিলেন, তাহসিফের মোটরসাইকেলে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেওয়ায় তারা দুজনে মিলে একটি ওয়ার্কশপে গিয়েছিলেন। গাড়ি ঠিক করার পর একসঙ্গে খাবার খেয়ে তিনি সেখান থেকে চলে আসেন। তবে পিবিআইয়ের নিবিড় তদন্তে তাদের রাতের গতিবিধি এবং যোগাযোগের আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসে। দীপের তথ্য অনুসারেই রাতের একপর্যায়ে তারা দুজনে টঙ্গীর তুরাগ নদসংলগ্ন এলাকায় পৌঁছান।

পরদিন অর্থাৎ ২৮ অক্টোবর বিকেল সাড়ে চারটার দিকে তুরাগ নদে একটি মরদেহ ভেসে থাকার খবর পেয়ে টঙ্গী নদী ফাঁড়ির পুলিশ রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে তাহসিফের মরদেহ উদ্ধার করে। পরে তার হাতের ঘড়ি ও পকেটে থাকা আইফোনের সূত্র ধরে তার পরিচয় শনাক্ত করা হয়। এরপর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন শেষে উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টরের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে জানাজা অনুষ্ঠিত হয় এবং পরবর্তীতে ১২ নম্বর সেক্টরের কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

নিহত তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম ছেলের এই মৃত্যুকে কোনোভাবেই স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে রাজি নন। দীপের সেই দাবিও তিনি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন, যেখানে বলা হয়েছিল ধাওয়ার মুখে তাহসিফ নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিলেন। তার দাবি, তার ছেলে সাঁতারে অত্যন্ত পটু ছিলেন এবং ফাইটার পাইলট হিসেবে প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে তাকে বাধ্যতামূলক সাঁতারের কোর্সও সম্পন্ন করতে হয়েছিল। ছেলের এই মৃত্যুর পেছনে গভীর কোনো রহস্য বা হত্যার আশঙ্কা প্রকাশ করে তিনি প্রকৃত ঘটনা উদ্‌ঘাটন এবং বিচার দাবি করেছেন।

বর্তমানে তাহসিফের মৃত্যুর সঠিক কারণ এখনো নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। ময়নাতদন্তের সময় সংগৃহীত রক্ত, পাকস্থলী, কিডনিসহ ভিসেরার বিভিন্ন নমুনা পরীক্ষার জন্য পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে। মৃত্যুর আসল কারণ কী ছিল, ওই রাতে তাহসিফের সঙ্গে ঠিক কী ঘটেছিল এবং এর সঙ্গে অন্য কারও প্রত্যক্ষ বা পরক্ষ সম্পৃক্ততা আছে কি না, তা সম্পূর্ণ তদন্ত শেষেই নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

মনোয়ারুল হক/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
ব্রেকিং নিউজ