রূপপুরে প্রথম ইউনিটে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু

পাবনা প্রতিনিধি, এবিসিনিউজবিডি, (৩০ অক্টোবর): ঈশ্বরদীর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে পরীক্ষামূলকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হয়েছে। শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) বিকেলে পারমাণবিক চুল্লিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ নিউক্লিয়ার চেইন রিঅ্যাকশন এবং চূড়ান্ত পর্যায়ের পরীক্ষণের মাধ্যমে এই কার্যক্রমের সূচনা হয়, যা দেশের বিদ্যুৎ খাতের ইতিহাসে এক নতুন মাইলফলক স্থাপন করল।

বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (বায়েরা) চেয়ারম্যান ড. মাহমুদুল হাসান পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, প্রথম ধাপে ১৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পর আরেকটি পরীক্ষা সম্পন্ন করা হবে। পরবর্তীতে উৎপাদন বাড়িয়ে ৩০০ মেগাওয়াটে উন্নীত করা হবে এবং এই পর্যায়ে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হবে।

এর আগে বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) ভৌত পরীক্ষার ফলাফল পর্যালোচনা শেষে রূপপুরের প্রথম ইউনিটে পাওয়ার স্টার্টআপ বা সি-স্টেজের কার্যক্রম পরিচালনার অনুমোদন দেয় বায়েরা।

নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. জাহেদুল হাছান জানান, বৃহস্পতিবার বিকেলে বায়েরার কাছ থেকে অনুমতি পাওয়ার পর শূন্য থেকে উৎপাদন শুরু করে তা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি করা হচ্ছে। উৎপাদন সক্ষমতা ৩০ শতাংশে পৌঁছালে জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হবে। সি-স্টেজে পারমাণবিক চুল্লি, শীতলীকরণ ব্যবস্থা, টারবাইন, জেনারেটর এবং নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার কার্যকারিতা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করা হচ্ছে। ধাপে ধাপে চুল্লির ক্ষমতা বাড়িয়ে এসব যন্ত্রপাতির নিরাপদ ও স্থিতিশীল কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা হবে।

পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের এ প্রক্রিয়ায় প্রথমবারের মতো স্বয়ংসম্পূর্ণ চেইন রিঅ্যাকশন বা পরমাণুর বিভাজন সৃষ্টি করা হয়েছে, যার মাধ্যমে চুল্লিতে নিয়ন্ত্রিত ও স্থিতিশীলভাবে তাপশক্তি উৎপাদন করা সম্ভব। আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) নির্দেশনা অনুসরণ করে রাশিয়ার সহায়তায় নির্মিত প্রকল্পটির প্রথম ইউনিটের ‘বি-১’ পর্যায়ের পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এর আগে স্বয়ংক্রিয় চাপ প্রশমন ভালভের পরীক্ষায় কিছু জটিলতা দেখা দিলেও ত্রুটি সংশোধন ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা সম্পন্ন করে বায়েরার চূড়ান্ত অনুমোদন নেওয়া হয়। গত ১১ অক্টোবর প্রথম ইউনিটে পারমাণবিক বিক্রিয়া বা ক্রিটিক্যালিটি শুরু হয়েছিল।

এদিকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউনিটের ভিভিইআর-১২০০ রিঅ্যাক্টরের প্রাথমিক জ্বালানি লোডিংয়ের জন্য পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহ শুরু করেছে রাশিয়া। দেশটির রাষ্ট্রীয় পরমাণু শক্তি সংস্থা রোসাটম বৃহস্পতিবার এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানায়, যার মাধ্যমে প্রকল্পটির দ্বিতীয় ইউনিট চালুর প্রস্তুতিও দ্রুত এগিয়ে চলেছে।

দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় একক এই মেগা প্রকল্পটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন বাস্তবায়ন করছে এবং কেন্দ্রটি পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে এনপিসিবিএল। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান রোসাটমের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অ্যাটমস্ট্রয়এক্সপোর্টের মাধ্যমে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন দুটি ইউনিট নির্মাণ করা হচ্ছে, ফলে দুটি ইউনিট পুরোপুরি চালু হলে কেন্দ্রটির মোট উৎপাদনক্ষমতা দাঁড়াবে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট।

জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরুর আগে নির্ধারিত সব পরীক্ষা ও নিরাপত্তা যাচাই সম্পন্ন করা হবে। দেশের সবচেয়ে আলোচিত এই মেগা প্রকল্প নির্মাণে প্রায় ১ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে, যার একটি বড় অংশ রাশিয়া থেকে ঋণ সহায়তা হিসেবে প্রাপ্ত।

সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, চলতি বছরেই দেশের প্রথম পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পুরোপুরি বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করবে এবং আগামী বছর এটি পুরোদমে চালুর লক্ষ্য রয়েছে।

মনোয়ারুল হক/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
ব্রেকিং নিউজ