স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ-উন্নয়ন ধরে রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ

নিজস্ব প্রতিবেদক, এবিসিনিউজবিডি, ঢাকা (১ নভেম্বর): স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের প্রক্রিয়ায় সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগের গতি এবং উন্নয়নের ধারা বজায় রাখাই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. নাজনীন আহমেদ।

তিনি উল্লেখ করেন, এলডিসি উত্তরণের লক্ষ্য সামনে রেখে এই তিনটি বিষয়কে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার কোনো সুযোগ নেই; কারণ এগুলোর মধ্যে গভীর পারস্পরিক আন্তঃসংযোগ রয়েছে। সরকারের চলমান সংস্কার উদ্যোগগুলো যদি যথাসময়ে ও যথাযথ প্রক্রিয়ায় বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়, তবে উত্তরণের এই প্রস্তুতিও মসৃণভাবে এগিয়ে নেওয়া যাবে। অবশ্য এজন্য প্রয়োজন একটি নির্দিষ্ট রূপরেখা, সব স্টেকহোল্ডারের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং নিয়মিত অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ।

রাজধানীর ধানমন্ডিতে অবস্থিত সিপিডি কার্যালয়ে রোববার আয়োজিত ‘বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ: জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত ও আমাদের পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তিনি।

ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, এলডিসি উত্তরণের সার্বিক প্রস্তুতির ক্ষেত্রে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা রক্ষা করা, পাশাপাশি বিনিয়োগ ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। বিষয়গুলো একে অপরের পরিপূরক হওয়ায় এদের আলাদা করে বিবেচনার সুযোগ নেই। আগামী তিন বছর এই ত্রিবিধ ক্ষেত্রে নিবিড়ভাবে কাজ চালিয়ে যেতে হবে। তবে এর জন্য শূন্য থেকে সব কিছু নতুন করে শুরু করার প্রয়োজন নেই। বর্তমান প্রশাসনের ঘোষিত সংস্কার এজেন্ডাগুলো যদি ঠিক সময়ে ও সঠিক উপায়ে বাস্তবায়ন করা যায়, তবে এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিতে স্পষ্ট অগ্রগতি অর্জন করা সম্ভব হবে।

তিনি আরও বলেন, এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হলো উত্তরণের এই যাত্রার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ প্রণয়ন করা এবং তা সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে কি না তা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। শুধু পরিকল্পনা বা নীতিমালা প্রণয়ন করলেই চলবে না, কোন কাজ কখন এবং কীভাবে সম্পন্ন হচ্ছে, তার নিয়মিত মনিটরিং বা পর্যবেক্ষণও জরুরি।

এলডিসি থেকে উত্তরণ না ঘটলে বা না হলে কী ধরনের সমস্যা হতে পারে—সাধারণ মানুষের মনে এমন প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশ বিভিন্ন আর্থসামাজিক সূচকে অগ্রগতি অর্জন করলেও সেই উন্নয়নের সুফল সমাজজুড়ে সমভাবে বণ্টিত হচ্ছে না। এর মূল কারণ দেশের অভ্যন্তরে বিদ্যমান উচ্চমাত্রার বৈষম্য। তাই এলডিসি উত্তরণের মূল অভীষ্ট হওয়া উচিত এমন একটি প্রতিযোগিতামূলক রাষ্ট্রকাঠামো তৈরি করা, যেখানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং সাধারণ মানুষও উন্নয়নের সুফল সরাসরি ভোগ করতে পারবে।

তিনি জানান, একটি প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতি গড়ে তুলতে হলে পণ্যের বহুমুখীকরণের পাশাপাশি বিভিন্ন উৎপাদনমুখী খাতে শিল্পায়নের পরিধি বাড়াতে হবে। অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ খাতগুলোকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা আবশ্যক। তবেই উত্তরণ-পরবর্তী সময়েও দেশের অর্থনীতি পূর্ণ সক্ষমতা নিয়ে এগিয়ে যেতে পারবে।

ড. নাজনীন আহমেদ আরও উল্লেখ করেন, জাতিসংঘের নিয়মকানুন অনুযায়ী এলডিসি থেকে চূড়ান্ত উত্তরণের আগে প্রতিটি দেশকে একটি মসৃণ উত্তরণ কৌশল বা ‘স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজি’র মধ্য দিয়ে যেতে হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও অতীতে এই ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে কিছু কাজ হয়েছে। বিশেষ করে ২০২২ ও ২০২৪ সালে এ সংক্রান্ত বিভিন্ন উদ্যোগ ও আলোচনা পরিচালিত হয়েছিল, যার ফলে কিছু ভিত্তিমূলক কাজ ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। জাতিসংঘের পক্ষ থেকেও এলডিসিভুক্ত দেশগুলোকে উত্তরণ-পরবর্তী বৈশ্বিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় সহায়তার বিশেষ প্রোগ্রাম রয়েছে। এর আওতায় স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজি এবং বিশ্ববাজারে বর্তমানের বিশেষ সুবিধা হারানোর পর করণীয় নির্ধারণে বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতার ব্যবস্থা রয়েছে।

তিনি বলেন, সরকারের প্রস্তাবিত সংস্কারের এজেন্ডার সঙ্গে এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতির বহু বিষয়ের মিল রয়েছে। তবে শর্ত হলো—কাজগুলো সঠিক সময়ে এবং সঠিক পদ্ধতিতে বাস্তবায়ন করতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে সম্পৃক্ত রাখতে হবে। পাশাপাশি, কোন খাতে কী পরিমাণ অগ্রগতি অর্জিত হচ্ছে, তার নিয়মিত মূল্যায়ন ও পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।

এলডিসি উত্তরণের সামগ্রিক প্রস্তুতির অগ্রগতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণে সিপিডির ভবিষ্যৎ ভূমিকার কথা তুলে ধরে ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, এ ক্ষেত্রে সিপিডি তাদের নিজস্ব প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার পরিধিতে এলডিসি উত্তরণ প্রস্তুতির অগ্রগতি ট্র্যাকিংয়ের কাজ করে যাবে। এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট কোন খাতে কী ধরনের অতিরিক্ত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন এবং কীভাবে তা আরও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব, সেই বিষয়ে গবেষণা ও পর্যালোচনা পরিচালিত হবে।

মনোয়ারুল হক/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
ব্রেকিং নিউজ