রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র: বদলে যাবে অর্থনীতির রূপরেখা
নিউজ ডেস্ক, এবিসিনিউজবিডি, ঢাকা (১১ অক্টোবর): দেশের বিদ্যুৎ খাতে একটি নতুন অধ্যায় সূচিত হতে চলেছে। পাবনার ঈশ্বরদীতে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুরের প্রথম ইউনিটে পারমাণবিক বিক্রিয়া চালুর প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। নিরাপত্তা ভালভের পরীক্ষার ফলাফল অনুমোদন পাওয়ায় পরবর্তী ধাপের কার্যক্রমের পথ সুগম হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী সবকিছু চললে আগামী মাসেই এ কেন্দ্র থেকে পরীক্ষামূলকভাবে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হতে পারে।
প্রথম ইউনিটের পরীক্ষামূলক উৎপাদন থেকে শুরু করে দুটি ইউনিটের পূর্ণাঙ্গ সক্ষমতা অর্জন—প্রতিটি পদক্ষেপই দেশের জ্বালানি খাতের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। দুটি ইউনিট পুরোপুরি চালু হলে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে মোট ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। এর ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উৎস বহুমাত্রিক হবে, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমবে এবং শিল্পায়ন, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন গতির সঞ্চার হবে।
বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রথম ইউনিটে গত সেপ্টেম্বর মাসে পারমাণবিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে তাপশক্তি উৎপাদনের পরিকল্পনা থাকলেও নিরাপত্তা ভালভের পরীক্ষায় ত্রুটি দেখা দেওয়ায় তা কিছুটা পেছায়। পরবর্তীতে উচ্চ চাপে দুই দফা পরীক্ষা সম্পন্ন করে তার প্রতিবেদন নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া হয় এবং গত বৃহস্পতিবার তা আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদিত হয়। এই পরীক্ষার সময় নিয়ন্ত্রণ ভালভগুলোর কার্যকারিতা, অগ্নিনিরাপত্তা এবং তেজস্ক্রিয়তা সংক্রান্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিবিড়ভাবে যাচাই করা হয়।
এই সাফল্যের ফলে চুল্লির পরবর্তী পর্যায়ের কমিশনিং কাজ এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরু, চুল্লির ক্ষমতা ধাপে ধাপে বৃদ্ধি, টারবাইন চালু এবং গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রতিটি ধাপ আলাদা এবং স্বতন্ত্র। তাই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সব ধরনের নিরাপত্তা ও কারিগরি পরীক্ষা সম্পন্ন করাই এখন সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার।
রূপপুরের পরবর্তী বড় মাইলফলক হলো ‘ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি’, যেখানে চুল্লিতে নিয়ন্ত্রিত ও স্বনির্ভর পারমাণবিক শৃঙ্খল বিক্রিয়া প্রতিষ্ঠিত হবে। এই ধাপের নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করতে প্রায় এক মাস সময় লাগতে পারে। এরপর ক্রমান্বয়ে চুল্লির তাপ উৎপাদনক্ষমতা বাড়ানো হবে। শুরুর দিকে জাতীয় গ্রিডে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের সম্ভাবনা রয়েছে। এরপর বিভিন্ন কারিগরি পরীক্ষা ও পরীক্ষামূলক উৎপাদন শেষে বাণিজ্যিক উৎপাদনে পৌঁছাতে আরও কিছু সময় লাগবে।
রাশিয়ার কারিগরি সহায়তায় নির্মিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রতিটি ইউনিটের উৎপাদন ক্ষমতা ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। এখানে ব্যবহার করা হচ্ছে তৃতীয় প্রজন্মের সর্বাধুনিক ভিভিইআর-১২০০ প্রযুক্তি। দুটি ইউনিট পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে মোট উৎপাদন ক্ষমতা দাঁড়াবে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট, যা দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ১০ শতাংশ পূরণ করতে সক্ষম হবে। তবে এর প্রকৃত অবদান নির্ভর করবে তৎকালীন বিদ্যুৎ চাহিদা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং জাতীয় গ্রিডের সার্বিক সরবরাহ পরিস্থিতির ওপর।
চিরাচরিত কয়লা, তেল বা গ্যাসের মতো জ্বালানি পুড়িয়ে তাপ উৎপাদনের পরিবর্তে এ কেন্দ্রে ইউরেনিয়াম পরমাণুর বিভাজন বা নিউক্লিয়ার ফিশন প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন তাপ দিয়ে পানি থেকে বাষ্প তৈরি করা হয়। সেই বাষ্পের সাহায্যে টারবাইন ও জেনারেটর ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। ৬০ বছর পরিকল্পিত আয়ুষ্কালের এ কেন্দ্রটি কারিগরি সংস্কার ও নিরাপত্তা মূল্যায়ন সাপেক্ষে আরও ২০ থেকে ৩০ বছর পর্যন্ত এর মেয়াদ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের চিন্তা স্বাধীনতার পর থেকেই বিভিন্ন সরকারের আমলে আলোচনায় ছিল। ১৯৭৭ সালে ফরাসি প্রতিষ্ঠান সফরাটমের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা থেকে শুরু করে ১৯৯৬ সালের জাতীয় জ্বালানি নীতি, ২০০৫ সালের চীন চুক্তি এবং পরবর্তীতে রাশিয়ার সঙ্গে বর্তমান প্রকল্পের কাঠামো নির্ধারিত হয়। ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে প্রকল্প এলাকায় পারমাণবিক জ্বালানি পৌঁছানোর মধ্য দিয়ে কেন্দ্রটি কমিশনিংয়ের চূড়ান্ত পর্বে প্রবেশ করে। বর্তমান সরকারের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের দূরদর্শী পরিকল্পনা, স্মার্ট গ্রিড সম্প্রসারণ এবং সর্বনিম্ন ব্যয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যের সঙ্গে রূপপুর প্রকল্পটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের মতে, রূপপুর শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রকল্প নয়; এটি দেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির একটি অনন্য সুযোগ। দ্বিতীয় ইউনিটের ইউরেনিয়াম ইতোমধ্যে প্রকল্প এলাকায় পৌঁছেছে এবং নির্ধারিত সময়ের আগেই কাজ শেষ করার ব্যাপারে সংশ্লিষ্টরা আশাবাদী। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পরমাণু শক্তি কর্পোরেশন রোসাটমের কারিগরি সহায়তায় এবং বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে বাস্তবায়িত এই প্রকল্প দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।
সূত্র: বাসস
মনোয়ারুল হক/
