রিয়াদে বিমানবন্দরে হামলায় বাংলাদেশিসহ নিহত ১২, আহত ৩০৯
আন্তর্জাতিক ডেস্ক, এবিসিনিউজবিডি, (১১ অক্টোবর): সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুতি বিদ্রোহীদের হামলায় কমপক্ষে ১২ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন তিনশর বেশি মানুষ। সৌদি কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল শনিবারের এ হামলা চলতি সপ্তাহে রিয়াদের কিং খালিদ বিমানবন্দরে তৃতীয় দফা হামলা। মর্মান্তিক এই হতাহতের ঘটনায় নিহতদের মধ্যে দুই বাংলাদেশি নাগরিকও রয়েছেন।
সৌদি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে চারজন সৌদি নাগরিক। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, জর্ডান, ফিলিস্তিন, সিরিয়া, সুদান ও মিসরের একজন করে নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন। আহতদের সংখ্যা ৩০৯ জনে দাঁড়িয়েছে এবং এদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে।
এর আগে চলতি সপ্তাহে একই বিমানবন্দরে আরও দুই দফায় হামলা চালানো হয়। ওই পূর্বের হামলাগুলোতে চারজন নিহত হওয়ার পাশাপাশি রানওয়েতে থাকা সৌদি আরবের একটি বাণিজ্যিক বিমান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
এই ধারাবাহিক ও প্রাণঘাতী হামলাগুলো সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। তবে সৌদির নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট এই হামলার কঠোর জবাব দেওয়ার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। সৌদি আরব ও ইয়েমেনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ইতোমধ্যে হুতি নিয়ন্ত্রিত এলাকায় শত শত বিমান হামলা চালানো হয়েছে। হুতিদের দাবি, এসব পালটা হামলায় নারী ও শিশুসহ বহু বেসামরিক নাগরিক হতাহত হয়েছেন; তবে স্বাধীনভাবে এই দাবির সত্যতা নিশ্চিত করতে পারেনি বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় গত শনিবার হামলার পরপরই রিয়াদগামী সব ফ্লাইট অন্যান্য গন্তব্যে সরিয়ে নেওয়া হয়। বিমানবন্দরটির স্বাভাবিক কার্যক্রমও সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
হামলার পর হুতি মিডিয়া অফিসের প্রধান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে দাবি করেন, তারা ‘রিয়াদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিতে সক্ষম হয়েছেন’। এর আগে হুতিরা বিভিন্ন বিমান সংস্থাকে সৌদি আকাশসীমা পরিহার করার এবং পুরো আকাশসীমাকে সামরিক অভিযানের এলাকা হিসেবে ঘোষণা করার হুশিয়ারি দিয়েছিল।
এদিকে হামলার ঘটনায় তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। হোয়াইট হাউসের বাইরে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ওয়াশিংটন হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদির সামরিক পদক্ষেপে অংশ নেবে কি না, তা তারা বিবেচনা করে দেখছেন। দ্রুতই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার বিবরণ
ঘটনার দিন বিমানবন্দরে উপস্থিত এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, বিস্ফোরণের বিকট শব্দের সময় তিনি সেখানে ছিলেন। বিস্ফোরণ পরবর্তী সময়ে তিনি বিমানবন্দরের ভেতরে বেশ কয়েকজন আহত মানুষকে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে থাকতে দেখেন। মুহূর্তের মধ্যেই ঘটনাস্থলের দিকে এক ডজনের বেশি অ্যাম্বুলেন্স ছুটে যেতে দেখা যায়। রয়টার্সের যাচাই করা একটি ভিডিওতেও অ্যাম্বুলেন্সের এই তৎপরতা স্পষ্ট ছিল।
আহত এক বিমানযাত্রী রয়টার্সকে জানান, বিমানবন্দরের বাইরে আকাশে তিনি সন্দেহজনক কোনো বস্তুকে উড়ে যেতে দেখেন। এর ঠিক পরেই প্রস্থান গেটের কাছাকাছি ছাদের একটি অংশ ধসে পড়ে।
অপরদিকে, রিয়াদের মার্কিন দূতাবাস এক সতর্কবার্তায় জানিয়েছে যে তারা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং সব মার্কিন নাগরিককে বিমানবন্দর ও সংলগ্ন এলাকা এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
দশ বছরের পুরোনো ইয়েমেন সংকটের নতুন মোড়
২০১৫ সালে ইয়েমেনের রাজধানী সানা থেকে হুতিদের হটিয়ে সরকারি ক্ষমতা পুনর্বহালের উদ্দেশ্যে সৌদি আরব আরব জোটের নেতৃত্ব দিয়ে এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছিল। এর আগের বছর হুতি বিদ্রোহীরা সানা দখল করে সরকারি বাহিনীকে উৎখাত করেছিল।
দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী লড়াই ও চরম দুর্ভিক্ষের পর একপর্যায়ে সংঘাতটি স্থবির হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে ২০২২ সালে সৌদি আরব হুতিদের সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করলে পরিস্থিতির অনেকটাই উন্নতি ও শান্তি বজায় থাকে।
তবে চলতি বছরে এসে সেই যুদ্ধবিরতি কার্যত ভেঙে পড়ে। সুযোগ বুঝে হুতিরা দ্রুত এগিয়ে গিয়ে সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর কাছ থেকে লোহিত সাগরের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দাব প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিজেদের দখলে নিয়ে নেয়।
বর্তমানে হুতিদের কাছ থেকে ওই অঞ্চল পুনরুদ্ধারে সৌদি সমর্থিত ইয়েমেন সরকার নতুন সামরিক অভিযান শুরু করেছে। যদিও সরকারি বাহিনীর অগ্রগতির গতি এখন পর্যন্ত বেশ ধীর। এরমধ্যেই হুতিরা ইয়েমেনের তৃতীয় বৃহত্তম শহর তাইজকে সম্পূর্ণ অবরোধ করে রেখেছে।
মনোয়ারুল হক/
