জাতিসংঘে বাংলাদেশের নতুন গণতান্ত্রিক যাত্রা ও রোহিঙ্গা সংকট তুলে ধরবেন প্রধানমন্ত্রী
নিউজ ডেস্ক, এবিসিনিউজবিডি, ঢাকা (২০ সেপ্টেম্বর): জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে নিজের প্রথম ভাষণে বাংলাদেশের নতুন গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা এবং বর্তমান বিশ্বের নানা গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ তুলে ধরবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিশেষ করে এই ভাষণে দীর্ঘায়িত রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের বিষয়টি অত্যন্ত জোরালোভাবে স্থান পাবে।
আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে বাংলায় ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী। ওই ভাষণে দেশের ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের ক্ষেত্রে সরকারের চিন্তাভাবনা, দৃষ্টিভঙ্গি এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নানা ইস্যুতে দেশের সুনির্দিষ্ট অবস্থান তিনি বিশ্বনেতাদের সামনে স্পষ্ট করবেন।
প্রধানমন্ত্রীর এই সফর উপলক্ষে আজ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ভাষণের মূল বিষয়গুলো তুলে ধরেন পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম।
পররাষ্ট্র সচিব জানান, নিজের প্রথম জাতিসংঘ ভাষণে প্রধানমন্ত্রী দেশের নতুন রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক ধারা, সুশাসন, আইনের শাসন, জবাবদিহি, বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং টেকসই উন্নয়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেবেন। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা, তরুণ প্রজন্ম ও নারী ক্ষমতায়ন, আধুনিক প্রযুক্তির সমতাভিত্তিক ব্যবহার এবং বৈশ্বিক বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার সংস্কারের মতো জরুরি বিষয়গুলোও তাঁর বক্তব্যে উঠে আসবে।
সচিব বলেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাতিসংঘে তারেক রহমানের এটিই প্রথম আন্তর্জাতিক অভিষেক। একই সঙ্গে বিশ্বের এই সর্বোচ্চ মঞ্চে নতুন সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও আগামী দিনের পথচলার রূপরেখা তুলে ধরার এটি একটি দারুণ সুযোগ।
সাধারণ পরিষদের ভাষণের পাশাপাশি দীর্ঘস্থায়ী রোহিঙ্গা সংকটের দিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি নতুন করে আকর্ষণ করার উদ্যোগ নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এই সংকট চিরতরে নিরসনে বিশ্ববাসীর আরও জোরালো ও কার্যকর সহযোগিতা কামনা করবেন তিনি।
এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে আগামী ২৩ সেপ্টেম্বর রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের আয়োজনে একটি বিশেষ সাইড ইভেন্ট অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং উপস্থিত থাকবেন। সেখানে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের যত দ্রুত সম্ভব মিয়ানমারে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে জোরালো আন্তর্জাতিক সমর্থনের দাবি জানাবেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে রোহিঙ্গা সংকটকে একটি ‘চলমান জটিল সমস্যা’ হিসেবে উল্লেখ করেন পররাষ্ট্র সচিব। তিনি জানান, বিশ্বনেতাদের এই মহা সমাবেশে এই সংকটের তীব্রতা ও বহুমুখী চ্যালেঞ্জগুলো পুনরায় তুলে ধরবে বাংলাদেশ।
সিয়াম আরও বলেন, ‘রোহিঙ্গা সংকটের বিশাল পরিধি, এর কারণে সৃষ্ট নানা চাপ এবং সংকট উত্তরণে বাংলাদেশের ঠিক কী ধরনের আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রয়োজন, তা আমরা বিশ্ব দরবারে আবারও উপস্থাপন করব।’
বাংলাদেশ সবসময় দৃঢ়তার সঙ্গে বলে আসছে যে, স্বেচ্ছায়, নিরাপদ, সম্মানজনক ও টেকসই উপায়ে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশ মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোই এই সংকটের একমাত্র স্থায়ী ও গ্রহণযোগ্য সমাধান।
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর এই কূটনৈতিক সফরে সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকারগুলোর একটি হলো জলবায়ু পরিবর্তন। এই সংকট মোকাবিলায় বিশ্বজুড়ে আরও বেশি কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ প্রত্যাশা করে বাংলাদেশ।
আগামী ২৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ মহাসচিবের আহ্বানে আয়োজিত ‘ক্লাইমেট অ্যাকশন অ্যান্ড দ্য জাস্ট ট্রানজিশন’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী।
এর পরদিন সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর অস্তিত্বের সংকট নিয়ে আয়োজিত আরেকটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে উদ্বোধনী বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে তাঁর।
জলবায়ুসংক্রান্ত এসব গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে জলবায়ুর নেতিবাচক প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর উদ্বেগ ও দাবি তুলে ধরবেন প্রধানমন্ত্রী। বিশেষ করে পর্যাপ্ত জলবায়ু অর্থায়ন নিশ্চিত করা, সঠিক অভিযোজন কৌশল গ্রহণ, প্রযুক্তি হস্তান্তর, ক্ষয়ক্ষতি পূরণ এবং বিশ্বব্যাপী জলবায়ু ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ওপর তিনি জোর তাগিদ দেবেন।
সাধারণ পরিষদের ভাষণে বৈশ্বিক শান্তি বজায় রাখা, টেকসই উন্নয়ন এবং পারস্পরিক অর্থনৈতিক সহযোগিতার মতো বিষয়গুলোতে বাংলাদেশের অগ্রাধিকারের কথা পরিষ্কার করবেন প্রধানমন্ত্রী। এছাড়াও তরুণ ও নারী সমাজের ক্ষমতায়ন এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির সমান সুযোগ নিশ্চিত করার জোরালো আহ্বান জানাবেন তিনি।
বর্তমান বৈশ্বিক সংকটগুলোর কার্যকর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাধানের স্বার্থে বহুপক্ষীয় কাঠামোগুলোর প্রয়োজনীয় সংস্কারের ওপরও গুরুত্ব দেবেন তিনি।
আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর মাতৃ ও নবজাতকের স্বাস্থ্য এবং মিডওয়াইফারি বিষয়ক একটি সাইড ইভেন্টে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখবেন প্রধানমন্ত্রী। এই অনুষ্ঠানে মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় নতুন সরকারের নেওয়া নানা উদ্যোগ ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরবেন তিনি। পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবার মান বাড়াতে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত ধাত্রী বা মিডওয়াইফারি সেবার অপরিহার্যতার কথা স্মরণ করিয়ে দেবেন।
পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম জানান, প্রধানমন্ত্রীর এই সফরের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে জাতিসংঘের নির্ধারিত প্রধান কর্মসূচিগুলো। এর পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের সূচিও চূড়ান্ত করা হয়েছে।
তিনি জানান, সাধারণ অধিবেশনের ফাঁকে কুয়েতের ক্রাউন প্রিন্স এবং ক্রোয়েশিয়া, ভুটান, থাইল্যান্ড, পাকিস্তান ও হাইতির প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করার কথা রয়েছে তারেক রহমানের।
এসব বৈঠকে দুই দেশের রাজনৈতিক ও সুদৃঢ় অর্থনৈতিক সম্পর্ক, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি, উন্নয়ন অংশীদারত্ব এবং রোহিঙ্গা সংকটের মতো পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
এছাড়াও জাতিসংঘের মহাসচিব, ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট, বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট, জাতিসংঘের মিয়ানমারবিষয়ক বিশেষ দূত, জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার (UNHCR), মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার এবং ইন্টারন্যাশনাল পিস ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্টের সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রীর গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের কথা রয়েছে।
সরকারের ধারাবাহিক অর্থনৈতিক কূটনীতির অংশ হিসেবে মেটা ও ওয়াল স্ট্রিটের মতো আন্তর্জাতিক খ্যাতনামা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নির্বাহীদের সঙ্গেও বৈঠকে অংশ নেবেন তিনি।
উল্লেখ্য, সব কর্মসূচি সফলভাবে সম্পন্ন করে আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর দেশের মাটিতে ফিরে আসার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর।
সূত্র: বাসস
মনোয়ারুল হক/
