সংসদীয় কমিটির বিকল্প সংস্কার মানবে না ১১ দল
নিজস্ব প্রতিবেদক, এবিসিনিউজবিডি, ঢাকা (২০ সেপ্টেম্বর): জুলাই জাতীয় সনদের আওতায় আসা সাংবিধানিক সংস্কার এবং গণভোটে অর্জিত জনগণের চূড়ান্ত রায়কে পাশ কাটিয়ে জাতীয় সংসদে বিশেষ কমিটি গঠনের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে ১১ দলীয় ঐক্য।
রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাব মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ১১ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে এই জোরালো অবস্থান তুলে ধরা হয়। সংবাদ সম্মেলনে মূল লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন জোটের অন্যতম শীর্ষনেতা, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার। পুরো অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক এবং জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ।
উক্ত সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন এলডিপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বিল্লাল হোসেন মিয়াজী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদ, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মুফতি মুসা বিন ইযহার, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, জাগপার সহ-সভাপতি ও মুখপাত্র ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান, খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমীর মাওলানা মাহবুবুল হক, এবি পার্টির যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট আব্দুল্লাহ আল মামুন রানা এবং বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব মুফতি ফখরুল ইসলাম।
লিখিত বক্তব্যে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ১১ দলীয় ঐক্য পুরোপুরিভাবে জুলাই জাতীয় সনদের ভিত্তিতে সাংবিধানিক সংস্কার এবং গণভোটে জনগণের দেওয়া রায় বাস্তবায়নের পক্ষে রয়েছে। কিন্তু বিশেষ সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে গণভোটে অনুমোদিত সংস্কার প্রক্রিয়ার বিকল্প খোঁজার কোনো সুযোগ নেই এবং এই উদ্যোগকে তারা কোনোভাবেই মেনে নেবে না।
তিনি উল্লেখ করেন, একই তফসিলে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট একসাথে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ওই সময় গণভোটে জনগণের কাছে জুলাই জাতীয় সনদে উল্লেখিত সাংবিধানিক সংস্কারগুলো বাস্তবায়নের নির্দিষ্ট পদ্ধতি ও কাঠামো নিয়ে সুনির্দিষ্ট মতামত চাওয়া হয়েছিল। তার মতে, দেশের জনগণ কেবল নির্দিষ্ট কিছু সংস্কারের পক্ষেই মত দেয়নি, বরং সেই সংস্কারগুলো বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট একটি প্রক্রিয়া এবং প্রাতিষ্ঠানিক রূপকেও অনুমোদন দিয়েছে।
জোটের এই শীর্ষনেতা আরও বলেন, জনগণের ভোটে অর্জিত সাংবিধানিক ম্যান্ডেটকে পাশ কাটিয়ে অন্য কোনো বিকল্প পথকে জনগণের রায়ের সমপর্যায়ে ফেলা যায় না। জনগণের এই রায় কোনো রাজনৈতিক দলের সুবিধা-অসুবিধা কিংবা সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা-সংখ্যালঘিষ্ঠতার মানদণ্ডে মূল্যায়ন বা বাতিলের বিষয় হতে পারে না।
সংবিধান ও সংসদীয় ক্ষমতার পার্থক্য তুলে ধরে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, জাতীয় সংসদ হলো মূলত একটি সংবিধানসৃষ্ট প্রতিষ্ঠান। পক্ষান্তরে, জনগণের সরাসরি অনুমোদনের ভিত্তিতে নির্ধারিত সংবিধান সংস্কার প্রক্রিয়ার মূল ক্ষমতার উৎস হচ্ছে সরাসরি জনগণের ভোট। সুতরাং, সাধারণ সংসদ সদস্য হিসেবে পাওয়া ক্ষমতা এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে গণভোটের মাধ্যমে অর্জিত ক্ষমতা এক ও অভিন্ন নয়।
তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, একই ব্যক্তি যুগপৎভাবে সংসদ সদস্য এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হতে পারেন, তবে এই দুটি প্রতিষ্ঠানের আইনি পরিচয়, ক্ষমতার মূল উৎস এবং অর্পিত দায়িত্ব সম্পূর্ণ আলাদা। একজন প্রতিনিধি সংসদ সদস্য হিসেবে সংসদের অর্পিত ক্ষমতা প্রয়োগ করেন; অন্যদিকে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে তিনি জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছার প্রতিফলনে নির্ধারিত সংস্কার ম্যান্ডেট বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করে থাকেন।
মিয়া গোলাম পরওয়ারের স্পষ্ট দাবি, সংবিধানের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সংসদের সংশোধনী ক্ষমতা সবসময় সীমাহীন নয়। দেশের সর্বোচ্চ আদালতের বিভিন্ন ঐতিহাসিক রায়ে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো সংরক্ষণের নীতিমালা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সংসদে প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে বলেই সংবিধানের মৌলিক কাঠামো ইচ্ছামতো বদলে ফেলার ক্ষমতা কারো তৈরি হয় না।
তার মতে, আসল প্রশ্ন শুধু সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে কি না, তা নয়; বরং যে ক্ষমতা প্রয়োগ করা হচ্ছে তার উৎস কী এবং জনগণ কোন প্রক্রিয়ায় সেই ম্যান্ডেট দিয়েছেন—এটাই হচ্ছে সবচেয়ে মৌলিক প্রশ্ন।
জুলাই জাতীয় সনদে প্রস্তাবিত বিভিন্ন সংস্কারের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, এর মধ্যে রয়েছে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা ও ১০০ সদস্যের উচ্চকক্ষ গঠন, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার যথাযথ ভারসাম্য আনা, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিত করা, একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদে একই ব্যক্তির থাকার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ, নির্বাচনসহ অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার, বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা এবং প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, এই সংস্কারগুলোর একটি বড় অংশ রাষ্ট্রের মূল ক্ষমতা কাঠামো, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং সাংবিধানিক শাসনব্যবস্থার মূল ভিত্তির সাথে গভীরভাবে জড়িত। ফলে সাধারণ কোনো সংসদীয় সংশোধনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যদি এগুলো বাস্তবায়ন করা হয়, তবে তা ভবিষ্যতে বড় ধরনের সাংবিধানিক ও আইনি জটিলতা তৈরি করতে পারে।
১১ দলীয় ঐক্যের ছয় দফা দাবি
সংবাদ সম্মেলনে ১১ দলীয় ঐক্যের পক্ষ থেকে জোরালোভাবে ছয়টি সুনির্দিষ্ট দাবি পেশ করা হয়:
১. গণভোটে জনগণের দেওয়া রায়কে যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।
২. জুলাই জাতীয় সনদে অন্তর্ভুক্ত এবং গণভোটে অনুমোদিত সাংবিধানিক সংস্কারগুলো অবিলম্ব বাস্তবায়ন করতে হবে।
৩. গণভোটে অনুমোদিত প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে সংসদীয় বিশেষ কমিটির মাধ্যমে মৌলিক সাংবিধানিক সংস্কার বাস্তবায়নের বর্তমান উদ্যোগ অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে।
৪. নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে নির্ধারিত যথাযথ প্রক্রিয়ায় শপথ গ্রহণ করিয়ে এই পরিষদকে কার্যকর করতে হবে।
৫. জনগণের সম্মতি ও গণভোটের ম্যান্ডেটকে পাশ কাটিয়ে সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সাথে সংঘাতপূর্ণ পরিবর্তন আনার সকল উদ্যোগ থেকে বিরত থাকতে হবে।
৬. রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক সংস্কারের এই পুরো প্রক্রিয়াকে জনগণের সর্বোচ্চ প্রত্যাশা, গণভোটের রায় এবং জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে এগিয়ে নিতে হবে।
জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের মূল আকাঙ্ক্ষা, জুলাই জাতীয় সনদ এবং গণভোটে প্রকাশিত জনগণের রায়ের প্রতি যথাযথ সম্মান দেখানোই বর্তমান সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক মতপার্থক্য নিরসনের একমাত্র গণতান্ত্রিক পথ বলে মন্তব্য করেন মিয়া গোলাম পরওয়ার।
এ সময় সরকারের পক্ষ থেকে সংবিধান সংস্কার পরিষদের আইনগত ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলার প্রসঙ্গও টানেন তিনি। সংবিধানের ১৫২ অনুচ্ছেদে ‘আইন’-এর যে সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, তা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, অধ্যাদেশ, আদেশ, বিধি, প্রবিধান, প্রজ্ঞাপন এবং অন্যান্য যেসব আইনগত দলিলের বাংলাদেশের আইনে কার্যকারিতা রয়েছে, সেসবেও আইনের আওতাভুক্ত হিসেবে গণ্য হয়।
তার দাবি, সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের জন্য গত ২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর মহামান্য রাষ্ট্রপতির পক্ষ থেকে যে আদেশ দেওয়া হয়েছিল, তাকে আইনগত ভিত্তিহীন বলার সুযোগ নেই। সংবিধানের ১৫২ অনুচ্ছেদে উল্লেখিত আইনগত দলিলের সংজ্ঞার আলোকেই ওই আদেশ পূর্ণ আইনগত মর্যাদা সংরক্ষণ করে। এটিকে তিনি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের শক্ত আইনি ভিত্তি হিসেবে অভিহিত করেন।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, গণভোটের রায় যথাযথভাবে বাস্তবায়নের জন্য সংবিধান সংস্কার পরিষদকে এখনো কার্যকর করার বাস্তব সুযোগ রয়েছে। বর্তমান সংসদ সদস্যদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ দেওয়া, পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করা এবং গণভোটের রায় অনুযায়ী পুরো প্রক্রিয়াটি কার্যকর করা সম্পূর্ণ সম্ভব।
পরিশেষে, বিশেষ কমিটির মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের ভুল পথ থেকে সরকার ও সরকারি দল দ্রুত ফিরে আসবে বলে তিনি জোরালো আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
সংবাদ সম্মেলনের শেষ পর্যায়ে সাম্প্রতিক লংমার্চ সফল করতে গণমাধ্যমকর্মী, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী সমাজ এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে যে সহযোগিতা পাওয়া গেছে, তার জন্য সবার প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন মিয়া গোলাম পরওয়ার। এছাড়া দীর্ঘ এই লংমার্চের কারণে সাধারণ মানুষের কোনো ধরনের ভোগান্তি হয়ে থাকলে তার জন্য ১১ দলীয় ঐক্যের পক্ষ থেকে আন্তরিক দুঃখ প্রকাশ করা হয়।
সবশেষে জনগণের পবিত্র রায়কে সম্মান জানানো, জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতার মর্যাদা রক্ষা করা এবং জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের মূল ম্যান্ডেট অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানানো হয়।
মনোয়ারুল হক/
