আইফোন ছিনিয়ে নিতেই অপ্রতীমকে হত্যা: পুলিশের সংবাদ সম্মেলন

কুমিল্লা প্রতিনিধি, এবিসিনিউজবিডি, (২০ সেপ্টেম্বর): কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতীম (১৩) হত্যাকাণ্ডের চাঞ্চল্যকর রহস্য উন্মোচন করার দাবি করেছে জেলা পুলিশ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভাষ্যমতে, অপ্রতীমের সঙ্গে থাকা দামি আইফোনটি ছিনতাইয়ের লক্ষ্যেই তাকে লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার একটি নির্জন বনে ডেকে নেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে ফোনটি দিতে অস্বীকৃতি জানালে বাঁশের লাঠি দিয়ে তার মাথায় উপর্যুপরি আঘাত করে হত্যা নিশ্চিত করা হয়।

আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত থাকার অভিযোগে ইতোমধ্যে তিনজনকে আটক বা গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এর মধ্যে আইনি দিক থেকে ১৮ বছরের কম বয়সী অপ্রাপ্তবয়স্ক দুজন এবং সাবালক একজন রয়েছেন। প্রাপ্তবয়স্ক অভিযুক্তের নাম সাইফুল ইসলাম তুহিন (১৯)। পাশাপাশি, মো. সিয়াম (১৯) নামের আরও এক যুবককে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদ চালানো হচ্ছে। তার বিরুদ্ধে প্রাপ্ত বিভিন্ন তথ্য ও আলামত বর্তমানে যাচাই-বাছাই করছে পুলিশ।

আজ রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) দুপুরে কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত এক বিশেষ সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য গণমাধ্যমকে জানান পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান।

পুলিশ সুপার জানান, অপ্রতীম নিখোঁজ হওয়ার পর তার পরিবারের পক্ষ থেকে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হলে পুলিশ ছায়া তদন্ত শুরু করে। তদন্তের অংশ হিসেবে ঘটনাস্থলসহ পার্শ্ববর্তী এলাকার বিভিন্ন সিসিটিভি ক্যামেরা ভাঙিয়ে ফুটেজ বিশ্লেষণ করা হয়। ফুটেজে দেখা যায়, গত ১৮ সেপ্টেম্বর বেলা আনুমানিক ৩টা ১৫ মিনিটের দিকে প্রধান অভিযুক্ত তুহিন অপ্রতীমকে সঙ্গে নিয়ে লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার পাহাড়ঘেরা নির্জন জঙ্গলের দিকে হেঁটে যাচ্ছে।

অপ্রতীমের মরদেহ উদ্ধারের পর সিসিটিভি ফুটেজে শনাক্ত হওয়া তুহিনকে পুলিশি হেফাজতে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। একপর্যায়ে সে অপ্রতীমের মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার পূর্বপরিকল্পনা এবং তাকে ওই নির্জন স্থানে নিয়ে যাওয়ার কথা স্বীকার করে। পুলিশ সুপার আরও জানান, তুহিনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এই ঘটনায় আরও দুই কিশোরের সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়। পরবর্তীতে পৃথক অভিযানে তাদেরও হেফাজতে নেওয়া হয়। এ সময় তুহিনের দেওয়া তথ্য ও তার দেখানো মতে নিজ বাড়ি থেকে নিহতের ব্যবহৃত সেই আইফোনটি উদ্ধার করে পুলিশ।

পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, ঘটনার দিন বিকেল ৫টা থেকে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে সানন্দা এলাকার ওই নির্জন বনে অপ্রতীমের আইফোনটি হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চালায় অভিযুক্তরা। এ সময় অপ্রতীম তীব্র বাধা দিলে তাদের মধ্যে ধস্তাধস্তি শুরু হয়। একপর্যায়ে প্রথমে তুহিন এবং পরে অপর দুই অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোর বাঁশের লাঠি দিয়ে অপ্রতীমের মাথায় মারাত্মক আঘাত করে।

অপ্রতীমের মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পরেই মোবাইল ফোনটি নিয়ে ঘাতকরা ঘটনাস্থল থেকে দ্রুত চম্পট দেয়।

সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার উল্লেখ করেন, এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে অন্য কোনো চক্র বা ব্যক্তি জড়িত আছে কি না, তা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে মামলার তদন্ত সম্পন্ন করে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) জমা দেওয়া হবে।

পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তারকৃত সাইফুল ইসলাম তুহিনের বয়স ১৯ বছর। সে সদর দক্ষিণ থানার কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের সানন্দা (মৈশানবাড়ি) এলাকার নুরে আলম ও শিরিনা আক্তারের সন্তান। পুলিশ জানায়, গত ২০২৫ সালে কুমিল্লা সিটি কলেজে একাদশ শ্রেণিতে অকৃতকার্য হওয়ার পর সে পড়াশোনা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেয়। বাকি দুই অভিযুক্তের বয়স ১৮ বছরের নিচে হওয়ায় তাদের নাম প্রকাশ করা হয়নি।

অন্যদিকে, আটক হওয়া অপর তরুণ সিয়ামের বয়সও ১৯ বছর। সে সদর দক্ষিণ থানার এলাহীপুর এলাকার সেলিম মিয়া ও শিরিনা আক্তারের ছেলে। সিয়াম কুমিল্লা কোতোয়ালি থানার দৌলতপুর এলাকার আফজাল খান ডিগ্রি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র।

কুমিল্লা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এই সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইশতিয়াক হাসান আমীন, মো. জিয়াউর রহমান এবং জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ শামসুল আলম শাহসহ পুলিশের পদস্থ অন্যান্য কর্মকর্তারা।

মনোয়ারুল হক/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
ব্রেকিং নিউজ